kalerkantho


প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিক

অনিয়মের মূলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর!

♦ ১৪টি হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশের পর টনক নড়ছে
♦ হাসপাতাল শাখার ভূমিকা খতিয়ে দেখবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়

তৌফিক মারুফ   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অনিয়মের মূলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর!

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ১৪টি হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। গত মঙ্গলবার উচ্চ আদালতের এমন নির্দেশ আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে একের পর এক প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বহু রকম অনিয়ম ধরা পড়লেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখা আগে কেন এসব হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি—এমন প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ অবস্থায় নড়েচড়ে বসেছে। এবার মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার কার্যক্রম।

বড় ধরনের ব্যর্থতার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তাদের অনেকেই। এমনকি প্রাইভেট হাসপাতালে এসব অনিয়ম টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখাতেই বড় রকমের গলদ বা অনিয়ম রয়েছে বলেও মনে করছেন কোনো কোনো কর্মকর্তা।

জাতীয় স্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা যদি তাদের দায়দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারত তবে উচ্চ আদালতের এমন নির্দেশনা দিতে হতো না। এই নির্দেশনা সরকারের জন্য যেমন লজ্জাজনক তেমনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার ব্যর্থতাকেই প্রমাণ করেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রভিসি অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহম্মেদও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করে বলেন, ওই শাখা থেকে যদি যথাযথ মনিটরিং ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতো তবে এ ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়াত না। ওই শাখার কর্মকর্তারা কেন তাঁদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে সব প্রক্রিয়া মানা হয় কি না সেটাও দেখা প্রয়োজন।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসচিব (স্বাস্থ্যসেবা) সিরাজুল হক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখাটি সঠিকভাবে চলছে কি না, ওই শাখাকে আরো কতটা কিভাবে কার্যকর করা যায় তা খতিয়ে দেখা হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি তাদের বলেছি অনেক সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে, তা সত্ত্বেও লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে যাতে সব শর্ত কঠিনভাবে অনুসরণ করা হয়, যাতে কোনো অনিয়ম না থাকে।’ একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসচিব বলেন, ‘যে ১৪টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত সেগুলোর কোনোটিরই লাইসেন্স নেই। তাই সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায় এখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। আমাদের ওপর এখন আর সেগুলোর দায় বর্তায় না।’

স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে যুক্ত এমন একটি সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকা মহানগরী লাগোয়া শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় তিনটি প্রাইভেট ক্লিনিকে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ধরা পড়ে নানা রকম অনিয়ম। ফলে দুটি ক্লিনিককে সিলগালাসহ তিনটিতে ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তিনটি মামলাও হয়। সেখানে এক হাসপাতালে অনুমোদন ছাড়াই চলছিল ব্লাড ব্যাংকের ব্যবসা। আরেক হাসপাতালের পরমাণু শক্তি কমিশনের অনুমতি ছাড়াই এক্স-রে মেশিন বসিয়ে চলছিল এক্স-রের কাজ। মেয়াদোত্তীর্ণ সার্জিক্যাল উপকরণে চলছিল অপারেশন। সেই সঙ্গে অপারেশন থিয়েটারে বর্জ্য রাখা ছিল অপরিচ্ছন্নভাবে। অন্য এক হাসপাতালের নিজস্ব ফার্মেসিতে বেচাকেনা চলছিল অনুমোদনহীন ওষুধ। প্রায় একই সময়ে অবৈধভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনায় নরসিংদীতে তিনটি বেসরকারি হাসপাতালকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর কয়েক দিন আগে দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনায় আসে চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে একটি শিশুর চিকিৎসা অবহেলায় মৃত্যুর ঘটনা। ঘটনার পরপরই সেখানেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়ম শনাক্ত করেন এবং জরিমানা করেন। কাছাকাছি সময়ে ঢাকার পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ আরো কয়েকটি প্রাইভেট চিকিৎসা কেন্দ্রে অভিযানে উদ্ধার করা হয় মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল উপাদান। এরও কয়েক দিন আগে মোহাম্মদপুরের ক্রিসেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের মোবাইল টিম অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে ধরে ফেলে ভুয়া ডাক্তার। এসব ঘটনায় সহজেই প্রমাণ মেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার ব্যর্থতার বিষয়টি। কারণ ওই শাখা থেকেই এসব প্রাইভেট হাসপাতালের অনুমোদন দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে নিয়মিত এসব প্রতিষ্ঠানে মনিটরিংয়ের দায়িত্বও তাদের।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ( হাসপাতাল ও ক্লিনিক) অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আদালত আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে আমাদের কি করা উচিত ছিল। অবশ্য সব কাজ করতে না পারার ক্ষেত্রে আমার অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। আমার শাখায় আমার সঙ্গে আছেন মাত্র দুজন উপপরিচালক, তিনজন সহকারী পরিচালক ও দুজন মেডিক্যাল অফিসার, যা দিয়ে সারা দেশের এই বিপুল প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক যথাযথভাবে মনিটরিং কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ ছাড়া আমার কাছে কোনো ম্যাজিস্ট্রেটও নেই। ম্যাজিস্ট্রেট পেলে নিজেরাই যখন তখন অভিযান চালানো যেত। অনেক দিন ধরেই ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে চিঠি চালাচালি চলছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে এখন দেশে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ১৫ হাজার। ২০১০ সালে ছিল দুই হাজার ৫০১টি। অর্থাৎ গত আট বছরে বেড়েছে প্রায় ১৩ হাজার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অসুস্থ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে দেশের এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এখন স্বাস্থ্য খাতের ব্যবসায় নেমেছে। আর এই চক্রকে সুযোগ করে দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখা।

ডা. রশিদ ই মাহবুব বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখা থেকে যদি যথাযথ প্রক্রিয়ায় সব নিয়ম ও শর্ত দেখে অনুমোদন দেওয়া হয় তবে মানুষের জীবন নিয়ে এমন অসাধু তৎপরতা চলতে পারে না। অবশ্য তিনি একই সঙ্গে মনিটরিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জনবলের ঘাটতিকেও দায়ী করেন। পাশাপাশি সময়োপযোগী ও উপযুক্ত আইন না থাকার ফলে অসাধুরা এমন সুযোগ পাচ্ছে বলেও মনে করেন।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) বলেন, ‘আগে কী হয়েছে সেটা আমি বলব না। তবে গত ২২ জুলাই থেকে সব অনলাইন সিস্টেমে ঢুকে গেছে। এখন কেউ চাইলেও কোনো অনিয়ম করতে পারবে না। এ ছাড়া আমরা সব প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিককে নোটিশ করেছি ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সবার লাইসেন্স নবায়ন করার জন্য।’



মন্তব্য