kalerkantho


প্রকাশ্য প্রচারে নির্ভার আ. লীগ কৌশলে চাপে থাকা বিএনপি

হায়দার আলী বাবু, লালমনিরহাট    

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



প্রকাশ্য প্রচারে নির্ভার আ. লীগ কৌশলে চাপে থাকা বিএনপি

আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো দলীয় মনোনয়ন ঘোষণা কিংবা জোট বা মহাজোটের হিসাব-নিকাশ শেষ হয়নি। নির্বাচনী তফসিলও ঘোষণা করা হয়নি। তবে এসবের অপেক্ষায় বসে নেই রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এরই মধ্যে প্রচার-প্রচারণায় মাঠে নেমে পড়েছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজেদের পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। লালমনিরহাট জেলার তিনটি আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এরই মধ্যে ভোট চাইতে শুরু করলেও অনেকটা পিছিয়ে বিএনপি। কারণ দলীয় কোন্দলের পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের চাপে প্রকাশ্যে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছে না তারা। তবে কৌশলে ভোট চাইছে তারা। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ নির্বাচনী মাঠে বেশ সরব। মোটামুটি এই তিন দলের সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা আগামী নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের নজর কাড়ার চেষ্টা করছেন। এর বাইরে জামায়াতকে নির্বাচনী প্রচারণায় এখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

আওয়ামী লীগ : বর্তমানে প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জমজমাট থাকে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়। নেতাকর্মী ছাড়াও সেখানে ভিড় জমায় সাধারণ মানুষ। নিয়মিত বসেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান। দলটির নতুন সদস্য সংগ্রহ অভিযানও শেষ হয়েছে কয়েক মাস আগে। সব কিছু মিলিয়ে ক্ষমতাসীন দলটির জেলা কার্যালয় নির্বাচনী আবহে বর্তমানে বেশ সরগরম। তবে জেলা কার্যালয় সরগরম হলেও জেলা আওয়ামী লীগ বর্তমানে দুটি ধারায় বিভক্ত। জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলাগুলোর কোথাও কোথাও দ্বন্দ্ব-বিরোধে আক্রান্ত দলটি। অবশ্য এই বিভক্তি প্রকাশ্য রূপ নিতে পারেনি। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে দলটির দায়িত্বশীল নেতাদের একসঙ্গে দেখা গেলেও কারো কারো মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বিরাজমান। তার পরও  জেলার তিনটি আসনেই চলছে নির্বাচনী গণসংযোগ।

পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা উপজেলা নিয়ে লালমনিরহাট-১ আসন। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মোতাহার হোসেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতি। এই আসনের আরেক উপজেলা পাটগ্রাম আওয়ামী লীগ দুইভাবে বিভক্ত। এর এক অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুসারী হিসেবে পরিচিত উপজেলা সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম নাজু, অন্য অংশের নেতৃত্ব দেন সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বাবুল। বর্তমান সংসদ সদস্য মোতাহার হোসেনের পাশাপাশি এই আসন থেকে এবার মনোনয়ন চাচ্ছেন রুহুল আমিন বাবুল।

তবে দীর্ঘদিন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব থাকা মোতাহার হোসেন সংসদ সদস্য হওয়ায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাবুলের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। ফলে নিজের উপজেলা হাতীবান্ধা সামলে আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাটগ্রামেও নিয়মিত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তাঁর গণসংযোগ দিনে দিনে বাড়ছে।

মোতাহার হোসেন বলেন, ‘দলীয় মনোনয়ন নিয়ে আমার আলাদা করে বলার কিছু নেই। কারণ আমি দীর্ঘ সময় ধরে এলাকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনাই আমার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।’

মনোনয়নপ্রত্যাশী রুহুল আমিন বাবুল বলেন,  ‘এখন প্রয়োজন আধুনিক ও তরুণ নেতৃত্ব। সে হিসেবে আমি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করে যাচ্ছি। তাই এই আসন থেকে আমি এবার মনোনয়নপ্রত্যাশী।’

কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-২ আসনের কালীগঞ্জে আওয়ামী লীগে কোনো দ্বন্দ্ব-বিরোধ নেই। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সবাই চলে নুরুজ্জামান আহমেদের নেতৃত্বে। তিনি গত নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে প্রথমে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী ও পরে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। নুরুজ্জামান প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর পাল্টে যেতে থাকে কালীগঞ্জের পাশাপাশি আদিতমারীর চিত্র। গত প্রায় পাঁচ বছরে নতুন নতুন রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্টসহ নির্মাণ হচ্ছে নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান। একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি মাসে অন্তত দুইবার এলাকায় এসে সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির বাইরেও দলীয় একাধিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন, চালাচ্ছেন গণসংযোগ। লালমনিরহাট-২ আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবে এরই মধ্যে বিভিন্নভাবে উঠে এসেছে বর্তমান সংসদ  সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের নাম। দলীয় লোকজনের অনেকেই মনে করে, আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনিই হবেন জোটপ্রার্থী।

এই আসনে তাঁর পাশাপাশি মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে শোনা যাচ্ছে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও ব্যবসায়ী সিরাজুল হকের নাম। যিনি গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে হেরে তৃতীয় হয়েছিলেন। তবে তিনি এবার লালমনিরহাট-২-এর পরিবর্তে লালমনিরহাট-৩ থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন। সেটা হলে শেষ পর্যন্ত একক প্রার্থীই হবেন নুরুজ্জামান।

গত নির্বাচনে লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবু সালেহ মো. সাঈদ দুলাল। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের নির্বাচনী এলাকায় তাঁকে খুব কমই পাওয়া গেছে। এ কারণে আসনটির মানুষ উন্নয়ন বা সুবিধাবঞ্চিত। মূলত শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি বেশির ভাগ সময় ঢাকাতে থাকেন। তার পরও একাদশ নির্বাচনে তিনি দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। তবে নির্বাচনী গণসংযোগে তাঁকে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

ইঞ্জিনিয়ার আবু সালেহ মো. সাঈদ দুলাল মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমি এলাকায় যাওয়া শুরু করেছি। আর সাধারণ মানুষের পাশেও আছি।’

এ আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় আরো উঠে এসেছে জেলা আওয়ামী লীগের কাণ্ডারি হিসেবে পরিচিত অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমানের নাম। যিনি একাধারে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও লালমনিরহাট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে তিনিও নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান বলেন, ‘গত নির্বাচনের জন্যও আমি মনোনয়ন চেয়েছিলাম। এবারও চাইব। বিষয়টি নিয়ে সীদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’

ওই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আরো শোনা যাচ্ছে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সফুরা বেগম রুমি, সদর উপজেলার গোকুণ্ডা ইউনিয়ন পরিষদের পর পর দুইবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মোস্তফা স্বপন এবং আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও আদিতমারী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজুল হকের নাম।

বিএনপি : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয় সরগরম থাকলেও তার উল্টো চিত্র জেলা বিএনপি কার্যালয়ের। কোনো কর্মসূচি ছাড়া সেখানে খুব একটা উপস্থিত হয় না নেতাকর্মীরা। পুলিশি বাধা ও মামলার ভয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালিত হয় সীমিত আকারে।

লালমনিরহাট-১ আসনে নানা প্রতিকূলতার পরও বেশ গোছানো বিএনপি। দলীয় নেতাকর্মীরা জানায়, বর্তমান সরকারের আমলে হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম উপজেলায় সব মিলিয়ে ৫০টিরও বেশি মামলা হয়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে নানা প্রতিকূলতার মাঝে একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে এখন পর্যন্ত খুব একটা প্রকাশ্যে নির্বাচনকেন্দ্রিক সভা-সমাবেশ করতে দেখা যাচ্ছে না তাদের। তবে মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক নেতা হাতীবান্ধা-পাটগ্রামে ‘কৌশলী’ প্রচারণা চালাতে শুরু করেছেন ।

ওই আসনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় আছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক এম এ শাহীন আকন্দ এবং হাতীবান্ধা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সেলিম। 

লালমনিরহাট-২ (কালীগঞ্জ-আদিতমারী) আসনে বর্তমানে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে শোনা যাচ্ছে সালেহ উদ্দিন আহমেদ হেলালের নাম। তিনি দীর্ঘদিন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে তিনিও এরই মধ্যে নেমে পড়েছেন নির্বাচনী মাঠে।

লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আসাদুল হাবিব দুলুর নাম শোনা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকি বা না থাকি বরাবরই আমি মানুষের জন্যই কাজ করি। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে তাই মানুষের সঙ্গেই আছি। তবে নিরপেক্ষ নির্বাচন ছাড়া আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়া নির্ভর করছে দলীয় সীদ্ধান্তের ওপর।’

জাতীয় পার্টি : একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একসময় জাপার দুর্গ হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাটের তিনটি আসনের মধ্যে বর্তমানে শুধু একটিতে দেখা যাচ্ছে সভা-সমাবেশ, গণসংযোগের মতো কর্মসূচি। অন্য দুটি আসনে রয়েছে নানা দ্বন্দ্ব-মতবিরোধ। এখন পর্যন্ত সেগুলো কাটিয়ে উঠতেই পারছে না দলটি। 

লালমনিরহাট-৩ আসন থেকে জিএম কাদের দুইবার এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। গত সরকারের আমলে এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রথমে বাণিজ্য ও পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আর সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও শেষ পর্যন্ত দলীয় সীদ্ধান্তের কারণে নির্বাচনের মাঠে না থাকায় সামান্য কিছু ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে হেরে যান। একাদশ সংসদ সংসদ নির্বাচনে এই আসনে শুধু তাঁরই নাম শোনা যাচ্ছে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে।

জি এম কাদের বলেন, ‘দলীয় চেয়ারম্যান এরই মধ্যে আমাকে লালমনিরহাট-৩ আসনের জন্য দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। আর আমিও সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।’ অন্যদিকে জেলার বাকি আসন দুটির এরশাদ ঘোষিত প্রার্থীরাও কাজ করে যাচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম) আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মেজর (অব.) খালেদ হোসেনের নাম এরশাদ ঘোষণা করলেও নির্বাচনী কোনো কর্মকাণ্ডে ওই দুই উপজেলায় এখন পর্যকন্ত দেখা যাচ্ছে না তাঁকে। অন্যদিকে হাতীবান্ধা উপজেলা জাপার আহ্বায়ক এম জি মোস্তফাকে ‘কোনো কারণ ছাড়াই’ অব্যাহতি দেওয়ার প্রতিবাদে উপজেলা জাপার সদস্যসচিব মিজানুর রহমান মিলনসহ প্রায় পাঁচ শ নেতাকর্মী গত ১০ মে ‘পদত্যাগ অনুষ্ঠান’ করে আনুষ্ঠানিকভাবে গণপদত্যাগ করায় সেখানে দলীয় কার্যক্রমও নেই দলটির।



মন্তব্য