kalerkantho


উত্তরে নির্বাচনী ট্রেন যাত্রায় ওবায়দুল কাদের

বিদ্রোহীদের ক্ষমা নেই, আছে শাস্তি

পার্থ সারথি দাস, নীলফামারী থেকে    

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিদ্রোহীদের ক্ষমা নেই, আছে শাস্তি

উৎফুল্ল কর্মীর স্রোত যেন আছড়ে পড়ছিল ট্রেনের ওপরে। মুখে মুখে নৌকা ধ্বনি, বুকে শেখ হাসিনার ছবি। স্টেশনে ট্রেন থামতেই স্লোগানে মাতছে কর্মীরা। কর্মীদের এমন উন্মাদনায় আবেগে আপ্লুত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও। আন্ত নগর নীলসাগর ট্রেনে নিজের কামরায় আলাপকালে ওবায়দুল কাদের কালের কণ্ঠকে বললেন, ‘নাটোরে এত মানুষ হয়েছে, আমি অবাক হয়েছি।’ গতকাল শনিবার থেকে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অভিযান শুরু হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে নীলসাগর ট্রেনে উত্তরের জেলাগুলোতে একের পর এক পথসভা করে নৌকা নৌকা জয়ধ্বনি তুলেছেন ওবায়দুল কাদের। সকাল ৮টায় ১৩ বগি নিয়ে উত্তরের দিকে ছোটে নীলসাগর। অন্যান্য সময়ে এই ট্রেনের সময়সূচি ঠিক থাকে না। গতকাল ঠিক সময়েই ছাড়ে ট্রেনটি। ট্রেনের চালক ছিলেন রাম রঞ্জন মোহন্ত। কমলাপুর থেকে ছাড়ার পর ট্রেনের গতি ছিল কম।

জয়দেবপুর ছাড়ার কিছু সময় পর মৌচাক এলাকায় হঠাৎ গতি বাড়ে ট্রেনের। তখন সকাল ১০টা। ২৫ মিনিট পর ট্রেন থামে টাঙ্গাইল রেলস্টেশনে। আগে থেকেই রোদ মাথায় উপচে পড়া হাজার হাজার মানুষ ঘিরে ধরে ওবায়দুল কাদেরকে। সঙ্গে আওয়ামী লীগের আরো ৯ নেতা। রেলস্টেশনের কাছে মঞ্চে উঠে ওবায়দুল কাদের তখন সমবেত নেতাকর্মীদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। নৌকায় আপনারা ভোট দেবেন। বিদ্রোহীদের ক্ষমা হবে না। মনোনয়নের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ ও বিশ্বাসঘাতকতা করবে, তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। দলে অসুস্থ প্রতিযোগিতার কোনো সুযোগ নেই।’ নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বিশৃঙ্খলা করবেন না। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে ক্ষমা নেই, শাস্তি আছে। অ্যাকশন নেওয়া হবে।’ বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বিএনপি গুজব সন্ত্রাস করছে। এ জন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’ ওবায়দুল কাদেরের কাছে চলন্ত ট্রেনে এ অ্যাকশনের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, চারটি জায়গায় অ্যাকশন নেওয়া হবে। রাজশাহী, সিলেটও এর মধ্যে আছে। ট্রেন দুলতে দুলতে চলে। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় মেতে ওঠেন কাদের। কখনো সাংবাদিকদের কাছে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব, চাটমোহর পার হয়ে দুপুর ১টায় ঈশ্বরদীর মুলাডুলি রেলস্টেশনে ট্রেন ঢুকতেই দেখা গেল, নানা রঙের ব্যানার, ফেস্টুন হাতে হাজার হাজার নেতাকর্মী। সেখানে ওবায়দুল কাদের নিজ দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি ফুলের মালা নিতে এখানে আসিনি। বিলবোর্ড দেখতে আসেনি। কারণ ফুল শুকিয়ে যাবে। ব্যানারে নাম লিখলে মুছে যাবে। পাথরে নাম লিখলে ক্ষয়ে যাবে। শেখ হাসিনার নাম হৃদয়ে লিখতে হবে।’

পরে ট্রেন ছোটে নাটোরের দিকে। রেলপথ লাগোয়া মঞ্চে উঠে ব্যাপক জনসমাগম দেখে অভিভূত হন কাদের। তিনি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটোরের জনগণকে নৌকা মার্কায় ভোট দিতে ভুল না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বিএনপিকে ভোট দেওয়ার মতো কোনো কারণ কি তারা দেখাতে পারবে? দেশে উন্নয়ন-অগ্রগতির এমন কী আছে, যা দেখে বিএনপিকে মানুষ ভোট দেবে। তাদের (বিএনপির) নেতিবাচক রাজনীতিতে তাদের জনপ্রিয়তা আস্তে আস্তে কমে গেছে। আমাদের উন্নয়ন আর অগ্রগতির দিকে আপনারা তাকান। আমি আপনাদের বলতে চাই, জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনাদের পাশে আছে, থাকবে। আমি আশা করি নাটোরের বনলতা সেন নৌকা মার্কায় ভোট দিতে ভুল করবে না।’

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের সমালোচনা করে কাদের বলেন, ‘মির্জা ফখরুল সাহেব বলেছেন আমাদের নাকি ভোট কমেছে। আপনাদের নেতিবাচক রাজনীতিতে ভোট আপনাদের কমেছে।’

কাদের বলেন, ‘যার পক্ষে নাটোরের জনগণ আছে, যাকে নাটোরের জনগণ ভালোবাসে, যাকে পছন্দ করে মনোনয়ন, সে-ই পাবে। ছয় মাস অন্তর অন্তর পাঁচটি করে প্রতিবেদন জমা পড়েছে। জনমত যার পক্ষে, আমরা তাকেই মনোনয়ন দেব।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির আন্দোলনের মরা গাঙে জোয়ার আর আসে না, আসবেও না।’

নাটোরের পর বগুড়ার সান্তাহার, জয়পুরহাটের আক্কেলপুর, দিনাজপুরের বিরামপুর, ফুলবাড়ী ও পার্বতীপুরে পথসভায় বক্তব্য দেন ওবায়দুল কাদের। এসব স্থানে ওবায়দুল কাদের নৌকার জন্য সমর্থন চান। উত্সুক জনতাকে গাছে উঠেও কাদেরের বক্তব্য শুনতে দেখা যায়।

জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের পথসভায় ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমাদের ছোটখাটো ভুলত্রুটি হতে পারে। কখনো কখনো কেউ আপনাদের সঙ্গে আচরণ খারাপ করতে পারে। আমি শেখ হাসিনার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আপনাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। যাঁরা অপকর্ম করেছেন তাঁদের বলছি, সংশোধন হয়ে যান। সংশোধন না হলে মনোনয়ন পেতে কষ্ট হবে। আমলনামা কিংবা এসিআর শেখ হাসিনার হাতে জমা। কাজেই মাস্তানি করে, জনগণকে অখুশি করে কেউই নমিনেশন পাবেন না। নমিনেশন পেতে হলে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য যিনি বেশি হবেন মনোনয়ন তিনিই পাবেন।’

নির্বাচনী ট্রেন পরে সৈয়দপুরের দিকে ছোটে। কেন এই ট্রেনে অভিযাত্রা জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শেখ হাসিনার এই যে উন্নয়ন, অর্জন তা সাধারণ মানুষ কিভাবে দেখছে সেটা মাঠে এসে দেখতে চাওয়ার কারণেই এই যাত্রা। ট্রেনে এক দিনে আজ ১২ থেকে ১৩টি জায়গায় বক্তব্য দিতে পেরেছি। ট্রেনে না এলে এটা সম্ভব হতো না। আমাদের পরবর্তী কর্মসূচি ১৩ সেপ্টেম্বর। লঞ্চে পটুয়াখালী ও বরিশাল যাব। পরে সড়কপথে যাব চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ। আপাতত এ মাসে এসব কর্মসূচি করব।’ সড়কমন্ত্রী ট্রেনে যাচ্ছেন বলে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেন পরিচালক ছিলেন তিনজন। ট্রেন কখন কোথায় থামবে, যাত্রীদের সেবার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না, সেই খোঁজ নিয়েছেন তাঁরা। বাথরুম, কামরা সর্বত্র ছিল পরিচ্ছন্নতার চিহ্ন। ট্রেনে এসি কেবিন দুটি, এসি সিট বগি ছিল একটি। যাত্রী ছিল প্রায় ৬০০ জন। পথে সভার জন্য কয়েক মিনিট করে বাড়তি সময় গেলেও তাতে অখুশি ছিল না যাত্রীরা। কারণ ট্রেনচালক তা পুষিয়ে নিয়েছেন ভালোভাবে চালিয়ে। সৈয়দপুরের যাত্রী রুবানা হামিদ বললেন, ‘মন্ত্রীর সঙ্গেই তো যাচ্ছি। আলাদা অনুভূতি, তাঁকে টিভিতে দেখি, আজ সরাসরি দেখলাম।’

এদিকে ট্রেন যাত্রার শুরুতে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সরকারের যেসব উন্নয়ন কাজ হয়েছে, তা তৃণমূলে পৌঁছে দিতে এবং দলকে শক্তিশালী করতেই উত্তরাঞ্চলে আওয়ামী লীগের ট্রেন যাত্রার মাধ্যমে প্রচার অভিযান। দেশজুড়ে দলকে শক্তিশালী করতে ভবিষ্যতে নৌ ও সড়ক পথেও সফর করা হবে। তৃণমূলের মানুষ যাতে বিএনপি-জামায়াতের গুজবের রাজনীতির বিষয়ে সচেতন হয় সে জন্য দলের এই সাংগঠনিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী এই ট্রেন যাত্রায় অন্য নেতাদের মধ্যে আছেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বি এম মোজাম্মেল হক, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, উপদপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া প্রমুখ। [সংবাদটিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন টাঙ্গাইল, নাটোর, জয়পুরহাট ও ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি]



মন্তব্য

saad commented 14 days ago
Dear Respectable Kadir sab they are not opponent they are hypocrite (munafik and nimok haram).