kalerkantho


পুঁজিবাজারের হিস্যা কমেছে অর্থনীতিতে

বহির্বিশ্বে জিডিপির সঙ্গে পুঁজিবাজার এগোয়

রফিকুল ইসলাম   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



পুঁজিবাজারের হিস্যা কমেছে অর্থনীতিতে

দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা ঊর্ধ্বমুখী। অন্য সব সূচকে উন্নতির সঙ্গে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) দ্বিগুণ হয়েছে। বাড়ছে মোট জাতীয় আয়ও (জিএনআই)। তবে জিডিপির উন্নয়নের সঙ্গে সমানতালে এগোয়নি পুঁজিবাজার। অর্থনীতির আকার বাড়লেও অনেকটা পেছন পানে হাঁটছে ২৬ লাখের বেশি বিনিয়োগকারীর পুঁজিবাজার। অনেকে পুঁজিবাজার থেকে মুখও ফিরিয়ে নিচ্ছে। অনেক সময় শেয়ারবাজার ইতিবাচক ধারায় ফেরার চেষ্টা করলে এই বিনিয়োগকারীরা ফিরে এসে কয়েক দিনের মধ্যে আবার হতাশ হয়ে ফিরে যায়। এই আস্থার অভাবেই পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা আসছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জানা যায়, গত বছরের জুন পর্যন্ত দেড় লাখের বেশি বেনিফিশিয়ারি ওনার্স হিসাব (বিও) নবায়ন না করায় বন্ধ হয়েছে। এ বছরও অনেক বিও হিসাব বন্ধ হয়েছে নবায়ন না করায়। যদিও বন্ধের পরও নতুন করে কিছু বিও হিসাব খুলেছে বিনিয়োগকারীরা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কার্যত প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মার্কেটে ভালো করতে না পারায় হিসাবগুলো বন্ধ করেছে ইলেকট্রনিক শেয়ার সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)। এদিকে বাজার গতিশীল করতে আইনকানুন ও নিয়মে পরিবর্তন এলেও কমছে কম্পানির তালিকাভুক্তির হার। ফলে পুরনো কম্পানি কিংবা বছর বছর লভ্যাংশ না দেওয়া দুর্বল ভিত্তির কম্পানিতে ভরসা করতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীকে। আর এটি কাজে লাগিয়ে মিথ্যা তথ্য কিংবা গুজব ছড়িয়ে শেয়ার দামে হ্রাস-বৃদ্ধি করে ফয়দা লুটছে কারসাজিচক্র। মুনাফার জন্য বিনিয়োগ করলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র ও সাধারণ বিনিয়োগকারী।

পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জিডিপির আকারের সঙ্গে বাজার মূলধনের তুলনা করে পুঁজিবাজারের শক্তি নির্ণয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীনের মতো উন্নত দেশের পুঁজিবাজার জিডিপির আকারের চেয়ে বহুগুণ বেশি হলেও বাংলাদেশের বাজার অনেক নিচুতে। ২০১০ সাল থেকে জিডিপি ও বাজার মূলধনের অনুপাত ধারাবাহিকভাবেই কমছে। বছর বছর জিডিপির আকার বাড়লেও বাড়ছে না পুঁজিবাজারের মূলধন। বাজার বড় না হওয়ার পেছনে ভালো কম্পানির তালিকাভুক্তি না হওয়াকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে দেশের পুঁজিবাজারের মূলধন জিডিপির আকারের মাত্র ১৭.১৯ শতাংশ। ২০১৭ সালেও এই হার ছিল ১৮.৪৬ শতাংশ। ২০১০ সালের পর থেকে গত ছয় বছরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত।

স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্র জানায়, দেশের প্রধান পুঁজিবাজারের মূলধন তিন লাখ ৮৪ হাজার ৭৩৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। আর মোট জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি) ২১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা (মে মাস পর্যন্ত)। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাব মতে দেশের জিডিপি ২২ লাখ ৩৮৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের মে মাসের হিসাব মতে পুঁজিবাজারের মূলধনের সঙ্গে জিডিপির অনুপাত ১৪.৩৮ শতাংশ।

চলতি বছরের মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (বিএসই) বাজার মূলধন দুই লাখ ২০ হাজার ৪৭৪ কোটি ডলার। আর জিডিপি দুই লাখ ৮৪ হাজার ৮২৩ কোটি ডলার। সেই হিসাবে জিডিপি ও মূলধনের অনুপাত ৭৭.৪১ শতাংশ। হংকংয়ের জিডিপি ৩৬ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার এবং হংকং স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন চার লাখ ৪৬ হাজার ২০০ কোটি ডলার। দুইয়ের অনুপাত ১২২৩ শতাংশ। পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত ২৫.৪১ শতাংশ। সিঙ্গাপুর স্টক এক্সচেঞ্জের মূলধন ও জিডিপির অনুপাত ২১৯.২২ শতাংশ। একইভাবে ইন্দোনেশিয়া, কলম্বো, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, টোকিও ও মালয়েশিয়া স্টক এক্সচেঞ্জের অনেক নিচেই অবস্থান করছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক উসমান ইমাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাইরের কোনো কোনো দেশের পুঁজিবাজার জিডিপির চেয়েও বহুগুণ বেশি। আমাদের পশ্চাদ্গতির কারণ হচ্ছে সরকারি ও বহুজাতিক কম্পানিকে বাজারে নিয়ে আসতে না পারা। বহুজাতিক কম্পানিকে বুঝিয়ে কিংবা ব্যবসা পরিচালনায় শর্ত দিয়েই বাজারে আনতে হবে। কোনো দেশেই বহুজাতিক কম্পানি সহজে তালিকাভুক্ত হয় না। নিয়মনীতির মাধ্যমে কিংবা প্রণোদনা দিয়ে আনতে হয়।’ নিজেদের স্বার্থে প্রণোদনা দিয়ে বহুজাতিক কম্পানিকে বাজারে আনতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ইকুয়িটিনির্ভর না হয়ে বন্ড কিংবা অন্যান্য পণ্যও আনতে হবে। জনগণকে বিনিয়োগমুখী করতে হলে বিভিন্নতা আনতে হবে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, পুঁজিবাজারকে কার্যকর করতে কিংবা যথাযথভাবে গড়তে নতুন নতুন কম্পানি তালিকাভুক্ত করতে হবে। মৌল ভিত্তির কম্পানি বাজারে এলে বিনিয়োগকারীও আকৃষ্ট হবে। গতিশীল ও কার্যকর বাজার গড়ে তুলতে কম্পানির সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। যদিও একটি তালিকাভুক্তিতে অনেক সময় ও জটিলতা রয়েছে। বাজারে বহুজাতিক ও সরকারি কম্পানি আনা খুব জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক রকিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শেয়ার না থাকলে বিনিয়োগ আসবে না। যদি জোগান না বাড়িয়ে চাহিদা সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে সেটি হবে না। বিনিয়োগকারীকে বাজারে ডাকার আগে শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে নতুন নতুন কম্পানির তালিকাভুক্তি খুবই জরুরি। বাজারকে গতিশীল করতে গভীরতা বাড়াতে হবে। বহুজাতিক ও সরকারি কম্পানিকেও বাজারে আনতে হবে।’

জানা যায়, ২০১৩ সালে আইপিও পায় ১২ কম্পানি, ২০১৪ সালে ২০টি, ২০১৫ সালে ১২টি এবং ২০১৬ সালে ১১টি কম্পানি। চলতি বছর এই সংখ্যা আরো কম হবে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পুঁজিবাজারে তিনটি মিউচুয়াল ফান্ড ও ছয়টি কম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে ৩৯০ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করে। ৯০৫ পরিশোধিত মূলধনের ৯টি কম্পানি তালিকাভুক্ত হয়। আগের বছর এই তালিকাভুক্তি ছিল ১১টি।



মন্তব্য