kalerkantho


সর্বোচ্চ আদালতের রায়

সমকামিতা ভারতে আর অপরাধ না

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সমকামিতা ভারতে আর অপরাধ না

ভারতে সমকামের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে সমকামী, উভকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষজন (এলজিবিটি)। ছবিটি গতকাল পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে তোলা। ছবি : এএফপি

ভারতে সমকামিতা এখন আর অপরাধ নয়। সমকামিতাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করা ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অবৈধ ঘোষণা করে সমকামিতার অধিকারকে বৈধতা দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঐতিহাসিক এই রায়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারকের বেঞ্চ বলেছেন, ‘সমকামিতাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করার ওই আইন এখন অযৌক্তিক। পুরনো ধ্যানধারণাকে বিদায় জানিয়ে রাষ্ট্রের সব নাগরিককেই সমান অধিকার দিতে হবে।’

এ রায়ের ফলে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর মধ্যে সম্মতির ভিত্তিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপন ভারতে আর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, রায় ঘোষণার পর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এলজিবিটি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা রাস্তায় নেমে এসে উল্লাস প্রকাশ করেন ও সুপ্রিম কোর্টকে ধন্যবাদ দেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয় উদারপন্থী অধিকারকর্মীরাও। আদালতের বাইরে অনেককে আনন্দে কাঁদতে দেখা যায়।

৫৪৭ পৃষ্ঠার এই রায়ে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র বলেছেন, কেউ তাঁর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে এড়িয়ে যেতে পারে না। এখনকার সমাজ ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্নে অনেক বেশি অনুকূল। ভারতের সংবিধান একজন সাধারণ নাগরিককে যেসব অধিকার দেয়, তার সবই এলজিবিটি কমিউনিটির প্রাপ্য। বিশিষ্ট সমকামী গীতিকার জেরি হারম্যানের লেখা বিখ্যাত গানের পঙিক্ত উল্লেখ করে দীপক মিশ্র বলেন, ‘আই অ্যাম হোয়াট আই অ্যাম’ অর্থাৎ ‘আমি যা আমি ঠিক তা-ই’।

প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একমত পোষণ করে একইভাবে নিজেদের রায় আলাদা পড়ে শোনান বিচারপতি রোহিনটন নরিম্যান, এ এম খানবিলকর, ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় ও ইন্দু মালহোত্র।

ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশে ফৌজদারি আইন হিসেবে ১৮৬১ সালে ব্রিটিশ সরকারের তৈরি করা দণ্ডবিধিই প্রয়োজনমতো বদলে নিয়ে চালু রাখা হয়েছে। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘অপ্রাকৃতিক যৌনতা’র অপরাধে অর্থাৎ স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ পুরুষ, নারী বা জন্তুর সঙ্গে যৌনসঙ্গম করলে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। সেই সঙ্গে হতে পারে জরিমানাও।

বাংলাদেশের ফৌজদারি দণ্ডবিধিতেও একই ধারায় মোটামুটি একই ভাষায় একই শাস্তির কথা বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশেও সমকামিতাকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়।

ওই আইন বাতিলের দাবি জানিয়ে ভারতের এলজিবিটি (লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডার) অধিকার সংগঠনগুলো বলে আসছিল, বিশ্বের ৭৪টি দেশ যেখানে সমকামিতাকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে, সেখানে জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে ৩৭৭ ধারায় তাদের হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে।

২০০৯ সালে দিল্লি হাইকোর্ট এক রায়ে ৩৭৭ ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। সেখানে বলা হয়, কেবল অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন সংসর্গের ক্ষেত্রে ওই আইন প্রয়োগ করা যাবে।

কিন্তু কয়েকটি ধর্মীয় সংগঠনের আপিলের ভিত্তিতে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট  হাইকোর্টের সেই রায় খারিজ করে দেন। সে সময় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল, সরকার চাইলে আইন বাতিল বা নতুন আইন তৈরি করতে পারে।

এর তিন বছরের মাথায় ২০১৬ সালে শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী নভতেজ সিং জোহর, ম্যাক্সিম ম্যাগাজিনের ভারতীয় সংস্করণের সম্পাদক সুনীল মেহরা, বিখ্যাত শেফ রীতু ডালমিয়া, ব্যবসায়ী আমন নাথ এবং অভিনেত্রী আয়েশা কাপুর নতুন একটি পিটিশন নিয়ে যান ভারতের সুপ্রিম কোর্টে। সেখানে বলা হয়, দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার কারণে এলজিবিটি জনগোষ্ঠী স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গত জুলাইয়ে শুরু হওয়া শুনানির একপর্যায়ে একজন বিচারপতি মন্তব্য করেন, ‘যৌনতার কারণে কাউকে ভীতির মধ্যে জীবন যাপন করা উচিত নয়।’

ভারতীয় পত্রিকাগুলো বলছে, নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার সুপ্রিম কোর্টে ৩৭৭ ধারা নিয়ে এই মামলায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চায়নি। সরকারের অবস্থান জানাতে আদালতে বারবার সময় চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু পার্লামেন্টে ৩৭৭ ধারা বাতিলের বিল আনতে চাইলে বিজেপি সে বিষয়ে আলোচনাই করতে দেয়নি।



মন্তব্য