kalerkantho


রোহিঙ্গা ইস্যুতে আইসিসিকে প্রসিকিউটর

বিচারিক এখতিয়ার প্রশ্নে মিয়ানমারের ব্যাখ্যা ভুল

মেহেদী হাসান   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিচারিক এখতিয়ার প্রশ্নে মিয়ানমারের ব্যাখ্যা ভুল

প্রসিকিউটর ফেতু বেনসুদা

আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) বিচারিক এখতিয়ার প্রশ্নে মিয়ানমারের ব্যাখ্যা ভুল—আইসিসিকে এ কথা জানিয়েছেন আদালতের প্রসিকিউটর ফেতু বেনসুদা। গত মাসে আইসিসিতে দাখিল করা লিখিত আবেদনে তিনি আরো জানান, আইসিসির বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে মিয়ানমার যে আইনি পরিসমাপ্তি টানতে চেয়েছে, তা সঠিক নয়।

কোন প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়েছে এবং আইসিসির সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও মিয়ানমারের ওপর বিচারিক এখতিয়ার আছে কি না সে বিষয়ে ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে জানাতে ওই দেশটিকে অনুরোধ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক এই আদালত। আইসিসি অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠালেও মিয়ানমার তা গ্রহণ করেনি এবং আদালতকে কোনো জবাবও দেয়নি। এরপর ৯ আগস্ট মিয়ানমার সরকার পাঁচ পৃষ্ঠার এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মিয়ানমারের ওপর আইসিসির কোনো এখতিয়ার নেই। তাই আইসিসির অনুরোধের জবাব দেওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে বলেও মিয়ানমার মনে করে না।

জানা গেছে, মিয়ানমারের ওই গণবিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ আগস্ট আইসিসির ‘প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১’-এ প্রসিকিউটর ফেতু বেনসুদা একটি লিখিত আবেদন উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি জানান, গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘আইসিসির সঙ্গে সম্পৃক্ত না হতে মিয়ানমার আনুষ্ঠানিকভাবে জবাব দেয়নি।’ প্রসিকিউশন মনে করে, আইসিসি অনুসৃত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংগতি, স্পষ্টতা ও স্বচ্ছতার স্বার্থে মিয়ানমারের গণবিজ্ঞপ্তি আদালতের আমলে নেওয়া ঠিক হবে না। বিচারিক উদ্যোগ সম্পর্কে মিয়ানমার অবগত হয়েছে এবং দেশটি জ্ঞাতসারেই এ প্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইসিসির ‘প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১’ এর আগে তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, আদালতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে মিয়ানমার যদি তার মনোভাব জানাতে চায়, তবে তাদের কিছু না কিছু উপস্থাপন করতে হবে। কিন্তু আদালতের অনুরোধ সত্ত্বেও মিয়ানমার তা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রসিকিউটর আইসিসিকে আরো জানান, আদালতে দাখিল করা আবেদন বা জবাব এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে উদ্দেশ করে তা দাখিল করার নীতি অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার অবশ্যই আদালতের কাছে থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আদালতে উপস্থিত না হলে আদালত এ এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারেন না। এ ছাড়া আইসিসির ৭১তম অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো রাষ্ট্রকে তার পর্যবেক্ষণ আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে হলে তা ওই আদালতের রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে করতে হবে। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কিত অন্য পক্ষগুলোর জানার স্বার্থে আনুষ্ঠানিকভাবেই পর্যবেক্ষণ বা জবাব উপস্থাপন করতে হয়।

প্রসিকিউটর ফেতু বেনসুদা আইসিসিকে জানান, যথাযথ প্রক্রিয়ায় আদালতের সামনে কোনো বিশেষ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ জানানোর অর্থ এই নয় যে মিয়ানমার আইসিসির এখতিয়ার মেনে নিয়েছে। বরং মিয়ানমারকে তার বক্তব্য বা পর্যবেক্ষণ আদালতের কাছে তুলে ধরতেই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল।

আইসিসিতে পর্যবেক্ষণ বা জবাব উপস্থাপন করলেই ওই আদালতের এখতিয়ার মেনে নেওয়া হবে এবং জবাব না দিলেই বিচারিক এখতিয়ার থাকবে না—মিয়ানমারের এমন ভাবনা সঠিক নয় বলে মত দিয়েছেন প্রসিকিউটর ফেতু বেনসুদা। আদালত যদি এর পরও মিয়ানমারের গণবিজ্ঞপ্তি আমলে নিতে চান, তবে তিনি আবারও যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ চাইতে পারেন।

উল্লেখ্য, আইসিসির সদস্য হওয়ায় বাংলাদেশে ওই আদালতের বিচারিক এখতিয়ার আছে। মিয়ানমারে নিরাপত্তা বাহিনীর নির্মূল অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে গত এক বছরে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নতুন করে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নির্মূলসহ অনেক আন্তর্জাতিক অপরাধ চালানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

আইসিসির সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও মিয়ানমারের ওপর ওই আদালত বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে কি না সে বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত চেয়ে এ বছরের প্রথমার্ধে আবেদন করেছিলেন প্রসিকিউটর ফেতু বেনসুদা। আদালত তাঁর আবেদন আমলে নিয়ে প্রথমে বাংলাদেশের মতামত জানতে চান। বাংলাদেশ বলেছে, এ দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আইসিসির পূর্ণ এখতিয়ার আছে।

আদালতের অনুমতি নিয়ে বেশ কটি অ্যামিকাস কিউরিও যে অভিমত দিয়েছেন সেখানেও বিচারিক এখতিয়ার প্রশ্নে ইতিবাচক মনোভাব স্থান পেয়েছে। এরপর আদালত তাঁর প্রসিকিউটরকে নিয়ে ‘স্ট্যাটাস কনফারেন্স’ করে এ বিষয়ে মিয়ানমারের মনোভাব জানার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ওপর বিচারিক এখতিয়ার আছে বলে ঢাকা আইসিসিকে যে অভিমত জানিয়েছে তা অত্যন্ত যৌক্তিক ও আইনসম্মত। আইসিসি যদি এখন এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেন, তবে তা বিশ্বে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে। তবে আইসিসিকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।



মন্তব্য