kalerkantho


চলে গেলেন রমা চৌধুরী

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



চলে গেলেন রমা চৌধুরী

একাত্তরের জননী হিসেবে পরিচিত বীরাঙ্গনা ও বিশিষ্ট লেখিকা রমা চৌধুরী আর নেই। গতকাল সোমবার ভোর ৪টা ২৫ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তিনি এক ছেলে জহর চৌধুরীসহ অনেক গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

রমা চৌধুরীর মৃত্যুর খবরে বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রমা চৌধুরীকে এক নজর দেখতে গতকাল সকালে হাসপাতালে ছুটে যান অনেকে। এরপর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সকাল ১১টার দিকে তাঁর মরদেহ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হয়। সেখানে তাঁকে একনজর দেখতে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিড় জমে। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় তাঁর মরদেহ।

স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ নানা সংগঠনের হাজারো মানুষ রমা চৌধুরীর মরদেহে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করে। সেখানে এবং চেরাগীর পাহাড় এলাকায় শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বিকেলে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পোপাদিয়া গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মরদেহ দাহ না করে তৃতীয় ছেলে দীপংকর চৌধুরী টুনুর সমাধীর পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিকেল ৫টার দিকে সমাহিত করা হয় বলে জানিয়েছেন তাঁর ভাইপো সমীর চৌধুরী।

রমা চৌধুরীর দীর্ঘদিনের সহচর ও তাঁর বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন বলেন, ‘তিনি দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত রবিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে দিদিকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। কিন্তু সোমবার ভোরের দিকে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল। দিদি আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন।’

সকালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে রমা চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পক্ষে দলীয় নেতারা। এ ছাড়া শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত সিটি মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন ও সহসভাপতি আবু সুফিয়ান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম নগর কমান্ডার মোজাফফর আহমদ, সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম, সিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন, শহীদজায়া ও লেখিকা মুশতারি শফী, মুক্তিযোদ্ধা অমল মিত্র, অধ্যক্ষ রীতা দত্ত, বিএফইউজে সহসভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, সিইউজে সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু, কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী ও শৈবাল দাশ সুমন, কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন, নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু, জেলা শিল্পকলা একাডেমি পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি রনজিৎ রক্ষিত, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বাবু, উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সহসভাপতি ডা. চন্দন দাশ, সিপিবি চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা, ওয়ার্কার্স পার্টি চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক শরীফ  চৌহান প্রমুখ। শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও যায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা রমা চৌধুরীকে হারিয়ে আজ পুরো দেশ  শোকাহত। চট্টগ্রামবাসীর পক্ষে ওনাকে শ্রদ্ধা জানাতে পেরে আমি গর্বিত।’

শহীদ জায়া ও লেখিকা মুশতারী শফি বলেন, ‘উনার (রমা চৌধুরী) পুরো জীবনজুড়েই শুধু আত্মত্যাগ আর সংগ্রাম। জননী সাহসিকা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি অনেক বই রচনা করেছেন। অনেক লিখেছেন। সেসব লেখা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয়নি। আমাদের উচিত তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখা।’

সংস্কৃতিকর্মী আহমেদ ইকবাল হায়দার বলেন, ‘জীবনজুড়েই তিনি আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কখনো কারো কাছে মাথা নত করেননি। মাথা উঁচু করেই তিনি চলে গেলেন।’

শহীদ মিনারের পর রমা চৌধুরীর মরদেহ নেওয়া হয় তাঁর দীর্ঘদিনের আবাসস্থল নগরের চেরাগী পাহাড়ের লুসাই ভবন চত্বরে। কালো কাপড়ে ঢাকা মঞ্চে রাখা হয় তাঁর মরদেহ। সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে এসে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘উনি চট্টগ্রামের গর্ব। ওনাকে হারিয়ে আমরা শোকাহত। মেয়র মহোদয় দেশে ফিরলে ওনার সঙ্গে আলাপ করে রমা চৌধুরী স্মৃতি সংরক্ষণে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

এ ছাড়া চেরাগী পাহাড় মোড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে রমা চৌধুরীকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। দুপুর সোয়া ১টার দিকে রমা চৌধুরীর মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্সটি বোয়ালখালীর গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে জন্মগ্রহণ করেন রমা চৌধুরী। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশা হিসেবে তিনি শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১৩ মে তিন শিশু সন্তান নিয়ে বোয়ালখালীর পোপাদিয়ার গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন রমা চৌধুরী। এ সময় তাঁর স্বামী ছিলেন ভারতে। এলাকার রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রমা চৌধুরীর বাড়ি আক্রমণ করেন। নিজের মা আর পাঁচ বছর ৯ মাস বয়সী ছেলে সাগর ও তিন বছর বয়সী টগরের সামনেই তার সভ্রমহানির পর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় পাকিস্তানি বাহিনী। পাক হানাদারদের হাতে নির্যাতিত হয়ে সমাজের লাঞ্ছনায় এবং ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন রমা চৌধুরী। দিনান্তে ভাত জোটেনি। অনাহারে, অর্ধাহারে অসুস্থ হয়ে ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর মারা যায় বড় ছেলে সাগর। ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মারা যায় দ্বিতীয় ছেলে টগর। ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তৃতীয় ছেলে দীপংকর চৌধুরী টুনু।

তিন ছেলে সন্তান মাটির নিচে, জুতা পরে মাটির ওপরে হাঁটলে তারা ব্যথা পাবে—এমন এক আবেগ থেকে গত দুই দশক ধরে জুতা পরেননি রমা চৌধুরী। রমা চৌধুরী ‘৭১-এর জননী’, ‘এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য’, ‘ভাব বৈচিত্র্যের রবীন্দ্রনাথ’সহ ১৯টি বই লিখে গেছেন। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নিজের লেখা বই ফেরি করে বিক্রি শুরু করেন রমা চৌধুরী। ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত তিনি নিজের নিয়মে খালি পায়ে রাস্তায় হেঁটে হেঁটে বই বিক্রি করে গেছেন। এসব বই বিক্রি করেই চলত তাঁর সংসার। এরপর শারীরিক শক্তি হারাতে শুরু করেন। ধুঁকে ধুঁকে জীবন পার করা এই নারী কখনো কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। বই বিক্রি করে একটি অনাথ আশ্রম গড়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর।

২০১৩ সালের ২৭ জুলাই গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী। গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর বাসায় পড়ে গিয়ে কোমরে গুরুতর আঘাত পান তিনি। ওই দিন তাঁকে চট্টগ্রাম নগরের বেসরকারি মেডিক্যাল সেন্টারে ভর্তি করা হয়। তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও পেশাজীবী নেতারা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ওই সময়ে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি আজীবন সংগ্রামী এই নারী।



মন্তব্য