kalerkantho


সিইসি বললেন

আইন পাস হলেই কিছু আসনে ইভিএমে ভোট

বিশেষ প্রতিনিধি   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



আইন পাস হলেই কিছু আসনে ইভিএমে ভোট

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘তাড়াহুড়া করে ইভিএম চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না’ বলার পরের দিনই নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানাল, আইনগত ভিত্তি এবং রাজনৈতিক মহলসহ অংশীজনের সমর্থন যদি পাওয়া যায়, তার পরই আসন্ন সংসদ নির্বাচনে কিছু আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার শুরু করা হবে। এ ক্ষেত্রে দৈবচয়ন ভিত্তিতে কিছু আসন বা কেন্দ্র বাছাই করে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা যেতে পারে।

নির্বাচন কমিশন সংসদ নির্বাচনে প্রচলিত ব্যালট পেপারের পাশাপাশি ইভিএম ব্যবহার করার লক্ষ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এর সংশোধনের প্রস্তাব ভেটিংয়ের জন্য গতকাল সোমবার দুপুরেই আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এ ছাড়া ইভিএম ব্যবহারের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ জন নির্বাচন কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে।

গতকাল সকালে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (ইটিআই) ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারসংক্রান্ত দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বলেন, ‘জাতীয় সংসদে যদি আইন পাস হয়, তখন আমাদের প্রশিক্ষিত লোক আছেন; তাঁদের সক্ষমতা যদি অর্জন হয়, মেশিনগুলো (ইভিএম) যদি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়, কেবল তখনই যতখানি পারব ততখানি করা হবে। স্থানীয় সরকারে শুরু হয়ে গেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর ব্যবহার নির্ভর করবে আইন-কানুনের ওপর, নির্ভর করবে আপনাদের প্রশিক্ষণের ওপর, নির্ভর করবে মূল অংশীজন, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের তাঁদের সমর্থনের ওপর।’

গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, ইটিআই মহাপরিচালক মোস্তফা ফারুকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সিইসি আরো বলেন, ‘ইভিএম ত্রুটিযুক্ত থাকলে তা ব্যবহার করা হবে না। সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার, এটা তো অনেক দূরের কথা। এখন তো প্রস্তুতিমূলক অবস্থানে আমরা রয়েছি। সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে কি হবে না এ সিদ্ধান্ত আরো পরে। আমরা এখনো অনেক পেছনের পর্যায়ে রয়েছি। আইন কেবলমাত্র যাবে সরকারের কাছে। কতগুলো ধাপ রয়েছে—অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাবে আর্থিক সংস্থানের জন্য, তারপর ক্যাবিনেটে যাবে, সংসদে যাবে। সরকার যদি চায়, সংসদ যদি চায় তখন আইনে পরিণত হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে।’

লটারিতে আসন নির্ধারণ : অনুষ্ঠানে সিইসি বলেন, ‘যদি সরকার আইন প্রণয়ন করে, যদি সেটা ব্যবহার করার মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি আমাদের থাকে, তখন আমরা এটা র‌্যানডম ভিত্তিতে (দৈবচয়ন ভিত্তিতে) সারা দেশে ব্যবহার করার চেষ্টা করব। ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে কিছু আসন বেছে নিয়ে সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। এ বিষয়ে যাতে স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় না আসে, সেটা দেখা হবে। আমাদের ইচ্ছার ওপর নয়, ৩০০ আসনের মধ্যে র‌্যানডমলি এটা ব্যবহার করব। আমরা যদি মনে করি ২৫টা আসনে ইভিএমে ভোট করব; সেই ২৫টা আমাদের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করব না।’

২০১০ সালে বাংলাদেশে ইভিএমের শুরুর পর্যায় থেকে এখন প্রযুক্তিগত দিক থেকে এ যন্ত্রের অনেক উন্নতি হয়েছে দাবি করে সিইসি বলেন, আগামী দিনে চার হাজার ৫৭১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৩৩২টি পৌরসভা এবং ৪৯১টি উপজেলায় পর্যায়ক্রমে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।

সমালোচনার প্রশংসা : ইভিএম নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাকে ইতিবাচক উল্লেখ করে সিইসি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলসহ অংশীজনরা যেসব কথা বলছেন, তা সঠিক। বিষয়টি নিয়ে তাঁদের নানা উৎকণ্ঠা থাকার কথা। এটা করতে গিয়ে অনেক প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে, অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। তাঁরা অনেক কিছু জানতে চেয়েছেন। সেগুলো প্রাসঙ্গিক। প্রযুক্তি নিয়ে প্রথমে এর বাধা-বিপত্তি আসবে। এ নিয়ে উৎকণ্ঠা থাকবে। বিষয়টি সবাই জানতে চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। সঠিক বিষয়টি জানার ওপরই সিদ্ধান্ত  হবে।’ তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা প্রচার নিয়ে ব্যাপক অবস্থানে পৌঁছতে পারিনি। এখন আমরা মানুষের মধ্যে এটা কী, কিভাবে ব্যবহার করা যায়, এর উপকারিতা কী—এসব নিয়ে কাজ করব।’

সিইসি বলেন, ‘প্রযুক্তি এখন আর বাক্সের মধ্যে বন্দি নেই। প্রযুক্তি এখন মানুষের হাতে হাতে, মানুষের মনে মনে। চিন্তার জগতে প্রবেশ করেছে। দুর্ভাগ্যজনক এই—আমরা নির্বাচন কমিশন এখনো সেই ধানি ব্যাগ, সেই ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা ভ্যান দিয়ে নির্বাচনসামগ্রী বহন করি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ে এসব যেতে হয়। রাতে পাহারা দিতে হয়। কখন এসে বাক্সের মধ্যে ছিনতাইকারী ব্যালট পেপার ঢুকিয়ে দেবে—এসব চিন্তা করতে হয়।’

আর্থিক স্বচ্ছতা দরকার : সিইসি বলেন, ‘দেশের নাগরিক, ভোটার, রাজনীতিক, সমর্থকরা, ট্যাক্সপেয়াররা জানতে চাইবে ইভিএমের টাকা অপচয় হচ্ছে কি না। তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে কি না, তা জানতে চাওয়া অপরাধের কিছু না। ইভিএমের টাকার দায়িত্বটা ইসির কাছে আসবে না—এটা নিশ্চিত করেই আমরা এগিয়েছি। এর অর্থনৈতিক দিকটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের। কোথাও কোথাও অপচয়, মিস ইউজ হয়—এসব থেকে আমরা দূরে থাকব। আলাদাভাবে চিঠি দিয়ে এ দায়িত্ব সরকারের কাছে রাখা হয়েছে।’

সিইসির মতে, প্রযুক্তি ধরে রাখার জন্য নয়। হাজার রকমের জিনিসপত্র, সুই-সুতা থেকে মালামালেরও প্রয়োজন হবে না। বিশেষ করে ভোট পরিচালনার জন্য ৭০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় আইন-শৃঙ্খলায়। হাজার হাজার, লক্ষাধিক সদস্য নিয়োগ করতে হয়। ইভিএমে এর সাশ্রয় হবে। প্রাথমিকভাবে এর ব্যয় বেশি হবে। মেশিনগুলোর দাম বেশি সে কারণে। ধীরে ধীরে এর দামও কমে যাবে। একদিন আরো কত প্রযুক্তি আসবে। এ মেশিন বারবার ব্যবহার করা যাবে।



মন্তব্য