kalerkantho


চামড়া রপ্তানিতে তবু ধস

এম সায়েম টিপু   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



চামড়া রপ্তানিতে তবু ধস

দেশি চামড়ার মান ও জোগান ভালো এবং শ্রমব্যয় কম হওয়া সত্ত্বেও সম্ভাবনাময় চামড়া খাত দিন দিন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন এ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি আয়ের এই খাতে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েও রপ্তানিতে ধস ঠেকানো যাচ্ছে না। সংগ্রহ ব্যবস্থাপনায় অরাজকতা আর পরিবেশবান্ধব উপায়ে প্রক্রিয়াজাত না হওয়ায় খাতটিতে এমন সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের চাপে দেশি বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশ থেকে চামড়া এনে পণ্য রপ্তানি করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, দেশের চামড়াশিল্পকে টেকসই করতে পরিবেশবান্ধব উপায়ে পণ্য উৎপাদন তথা চামড়া শিল্প নগরীর বর্জ্য দূষণ প্রক্রিয়া কার্যকর করাসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে সরকার। তা না হলে সরকার ২০২১ সালে এ খাত থেকে ৫০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অধরাই থেকে যাবে বলে আশঙ্কা তাঁদের। তাঁরা মনে করেন, এবার কোরবানি পশুর চামড়া সংগ্রহ ও দরপতন এ আশঙ্কাকে আরো গভীর করেছে।

রপ্তানি আয় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে দেশের আয় হয়েছে ১০৮ কোটি ডলার। এই আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১ শতাংশ কম। এর আগের বছরের চেয়েও এ আয় ১২ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩৮ কোটি ডলার। কিন্তু নেতিবচাক প্রবৃদ্ধির ফলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চলতি অর্থবছরের (২০১৮-১৯) লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১১২ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের চেয়ে ২৬ কোটি ডলার কম।  

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেও (জুলাই) রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ও প্রবৃদ্ধি দুটিই কম হয়েছে। এ সময়ে আয় হয়েছে ৯ কোটি ১১ লাখ ডলার (৮১০ কোটি ৬০ লাখ টাকা), যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫.৫৫ শতাংশ কম। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়েও এ আয় ২১.৭৩ শতাংশ কম। গত অর্থবছরের জুলাই মাসে এই খাত থেকে আয় হয়েছিল ১১ কোটি ৬৪ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার।

চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন এলএফএমইএবির সভাপতি সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের চামড়াশিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করতে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সাভারে নেওয়া হয়। কিন্তু চামড়া নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধানাগার (সিইটিপি) কার্যকর না হওয়ায় এই খাতে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তিনি বলেন, ‘দেশি কিছু প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ইটিপি থাকার ফলে রপ্তানি আয় এখনো কিছুটা সচল থাকলেও এই শিল্পকে রক্ষা করতে এখনই চামড়া নগরীর সিইটিপি কার্যকর করা জরুরি। এ জন্য চীনা প্রতিষ্ঠানের কাজ বাতিল করে তৃতীয় কোনো দেশের কারিগরি সহায়তা নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।’

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রতিবেদন তথ্য মতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরে এই খাতে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১২ কোটি ৪০ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে এই খাতের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ কোটি ৬৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। এই মাসে কাঁচা চামড়া রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি ৫৮ লাখ ডলার। অথচ রপ্তানি আয় হয়েছে এক কোটি ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৬.২০ শতাংশ কম। গত অর্থবছরের জুলাই মাসে কাঁচা চামড়া রপ্তানি করে আয় হয়েছিল এক কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের প্রথম মাসের তুলনায়ও চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে কাঁচা চামড়ার রপ্তানি আয় ২৪.৩২ শতাংশ কম। ওই সময়ে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছিল এক কোটি ৪৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে এ খাতের পণ্য রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই কোটি ৯২ লাখ ডলার। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় কম হয়েছে ৪৯.১৮ শতাংশ। এ আয় আগের অর্থবছরের জুলাই মাসের চেয়ে ৬১.৪৯ শতাংশ কম। তবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই মাসে চামড়ার জুতা রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রা ও প্রবৃদ্ধি দুই ভালো হয়েছে। এ সময়ে আয় হয়েছে ছয় কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৮.৫৭ শতাংশ বেশি।

রপ্তানিকারদের সংগঠন ইএবির সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী কালের কণ্ঠকে বলেন, পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্প তৈরি করা না গেলে দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া খাতের ঠিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশে চামড়ার মান ভালো, শ্রমব্যয় কম হওয়ার পরও এর সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দিন দিন মুখ থুবড়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘এদিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের পর বাংলাদেশ থেকে চামড়া কেনা কমিয়েছে বিদেশি ক্রেতারা। অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব উপায়ে চামড়া প্রক্রিয়াজাত না হওয়ায় বিদেশি ক্রেতারা দেশি বড় ব্র্যান্ড কম্পানিগুলোকে বিদেশ থেকে চামড়া আমদানি করে পণ্য রপ্তানি করার পরামর্শ দেন। ফলে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীকে পরিবেশবান্ধব করা না গেলে সম্ভাবনাময় খাতটিকে দেশের সোনালি আঁশ পাটের পরিণতি ভোগ করতে হবে।’



মন্তব্য