kalerkantho


রোহিঙ্গা গণহত্যা আমলে নিচ্ছে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ

তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিচারের প্রস্তাব উঠছে আসন্ন অধিবেশনে

মেহেদী হাসান   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা গণহত্যা আমলে নিচ্ছে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত প্রতিবেদন জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে উঠছে। জেনেভায় মানবাধিকার পরিষদের ৩৯তম অধিবেশন শুরু হবে আগামী ১০ সেপ্টেম্বর। চলবে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ওই অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের বক্তব্যে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে গুরুতর সংকট হিসেবে রোহিঙ্গা ইস্যু থাকবে। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দল মানবাধিকার পরিষদে রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে তাদের পুরো প্রতিবেদন উপস্থাপনের পাশাপাশি তা বিশ্লেষণ করবে এবং মিয়ানমারের বিচারের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ তুলে ধরবে।

জানা গেছে, মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি ইতিমধ্যে মিয়ানমারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য অবিলম্বে উদ্যোগ নিতে মানবাধিকার পরিষদসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলের মিয়ানমারবিষয়ক প্রতিবেদন ও সুপারিশগুলো গ্রহণের জন্য মানবাধিকার পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে প্রস্তাব আকারে উঠবে। মানবাধিকার পরিষদই গত বছরের মার্চ মাসে ওই সত্যানুসন্ধানী দল গঠন করেছিল। মানবাধিকার পরিষদে সদস্য হিসেবে চীন থাকলেও এ ফোরামে কারো ‘ভেটো’ ক্ষমতা নেই। তাই সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন ও সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের প্রস্তাব মানবাধিকার পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে গৃহীত হওয়ার কথা রয়েছে।

এ ছাড়া গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি প্রদানবিষয়ক সনদের ৭০তম বার্ষিকী উপলক্ষে মানবাধিকার পরিষদে একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে গণহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ উপদেষ্টা আদামা দিয়েংয়েরও বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা, ওই আলোচনায়ও রোহিঙ্গা গণহত্যা প্রসঙ্গ আসবে। আদামা দিয়েং গত মার্চ ও জুন মাসে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি ইতিমধ্যে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর যে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি যেসব অভিযোগ পেয়েছেন সেগুলো উপযুক্ত আদালতে প্রমাণ করতে পারলে তা ‘গণহত্যা’ হিসেবেই স্বীকৃতি পাবে।

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের উদ্যোগ নিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের প্রতি আহ্বান জানাতে পারে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা গণহত্যার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিচারপ্রক্রিয়ায় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য নিজেও আরেকটি কাঠামো সৃষ্টি করতে পারে। তবে বর্তমান ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) মিয়ানমারে গণহত্যার অভিযোগ তদন্ত ও বিচারের জন্য নিরাপত্তা পরিষদকে উদ্যোগ নিতে হবে। চীন ও রাশিয়া এ বিষয়ে এখনো আগ্রহী না হওয়ায় এ প্রক্রিয়ায় এগোনো কঠিন হবে।

আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-১-এ ওই আদালতের প্রসিকিউটরের একটি আবেদন বিবেচনায় আছে। ওই  আদালত যদি মনে করেন, মিয়ানমার থেকে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ওপর আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার আছে, তবে তা তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আইসিসিকে দেওয়া পর্যবেক্ষণে বলেছে যে এ দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ওপর আইসিসির পূর্ণ বিচারিক এখতিয়ার আছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেওয়ার প্রেক্ষাপট তদন্ত করতে গেলেই মিয়ানমারে তাদের ওপর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর সব আন্তর্জাতিক অপরাধের প্রসঙ্গ চলে আসবে।

কূটনীতিকরা বলছেন, আইসিসি যদি বিচারিক এখতিয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে অপরাগতা জানান তার পরও মিয়ানমারের বিচারের সুযোগ বন্ধ হচ্ছে না। জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদন ও সুপারিশ এবং মানবাধিকার পরিষদের প্রস্তাব আমলে নিয়ে সাধারণ পরিষদেও তদন্ত ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাঠামো সৃষ্টি করার সুযোগ রয়েছে। সিরিয়ার ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদে জটিলতার বিষয়টি মাথায় রেখে এ বিষয়ে কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা জানান, মিয়ানমারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তাদের ভয়াবহ অপরাধগুলোর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ ওই দেশটি তার অপরাধ অস্বীকার করার পাশাপাশি তথ্য-প্রমাণ ধ্বংসের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি গত সপ্তাহে সিএনএনকে বলেছেন, ‘আমি আশা করছি, মিয়ানমারের জবাবদিহি কাঠামো সৃষ্টির জন্য মানবাধিকার পরিষদে প্রস্তাব এই সেপ্টেম্বর মাসেই সদস্য দেশগুলো সমর্থন করবে। কারণ আমাদের তথ্য-উপাত্ত, প্রমাণগুলো সংগ্রহ করা অব্যাহত রাখা উচিত।’ অন্য রাষ্ট্রগুলোকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মিয়ানমার পরিস্থিতি তদন্ত করা জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলও তার সুপারিশে দেশটির ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং জবাবদিহি করতে বাধ্য করার জন্য আঞ্চলিক বিভিন্ন জোট যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), আসিয়ানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ইইউ ইতিমধ্যে ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বলেছে, তারা মিয়ানমারের জবাবদিহির উদ্যোগ নেবে।



মন্তব্য