kalerkantho


ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টা

সেই ইশরাক এখন সুইডেনে

সাব্বির খান   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সেই ইশরাক এখন সুইডেনে

ইশরাক আহমেদ

সরকারবিরোধী সেনা অভ্যুত্থানের যে চেষ্টা হয়েছিল ২০১১ সালের শেষ দিকে, সে ঘটনার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী প্রবাসী ব্যবসায়ী ইশরাক আহমেদ বর্তমানে সুইডেনে অবস্থান করছেন। তিন বছর ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে কালের কণ্ঠ’র এই প্রতিনিধি এ তথ্য নিশ্চিত হয়েছেন।

ওই অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ষড়যন্ত্রকারীদের কয়েকজন গ্রেপ্তার হয় এবং কয়েকজন আত্মগোপনে বা বিদেশ পালিয়ে যায়। পলাতকদের মধ্যে সেনাবাহিনীর মেজর (পরে বরখাস্ত) সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হকও রয়েছেন; যিনি ইশরাকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক শাখার নেতৃত্বে আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইশরাক আহমেদ সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের পাশে অবস্থিত আকেশবেরিয়া এলাকায় নিবন্ধিত হিসেবে বসবাস করছেন। সুইডিশ নথি অনুযায়ী, তাঁর জন্ম তারিখ ২১ ডিসেম্বর ১৯৫১। একই ঠিকানায় ‘নরডিক আইমেক্স এবি’ নামে নিবন্ধিত একটি কম্পানি (সুইডিশ নিবন্ধন নম্বর : ৫৫৬৮৯৭-৬৯৫৪) রয়েছে। সুইডিশ আয়কর বিভাগের প্রদান করা বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইশরাক এই কম্পানির একজন বোর্ড মেম্বার হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছেন। কম্পানিটি ২০১২ সালে সুইডেনে নিবন্ধিত হয়। ইশরাক ২০১৪ সালে কম্পানিটির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ২০১৫ সালে বোর্ড মেম্বার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ২০১৬ সালে সুইডিশ ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টের কাছে দেওয়া সর্বশেষ আয়কর নথিতেও ওই কম্পানির একজন দায়িত্বশীল হিসেবে সই করেন ইশরাক।

সুইডেনে বসবাসকারী একাধিক বাংলাদেশি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন, ২০১৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তাঁরা ইশরাক আহমেদকে স্টকহোমের বিভিন্ন স্থানে চলাফেরা করতে দেখেছেন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে ইশরাক আহমেদ বিদেশে বিভিন্ন দেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে তাঁকে দেখা যাওয়ার তথ্য থাকলেও সুনির্দিষ্ট অবস্থানের ব্যাপারে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত হতে পারেনি।

২০১৩ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইশরাক আহমেদ ও মেজর জিয়াকে গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনা সদরে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে বলা হয়, কয়েকজন ধর্মান্ধ সেনা কর্মকর্তার একটি অভ্যুত্থান পরিকল্পনা নস্যাৎ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টার বিষয়টি গত ১৩ ডিসেম্বর (২০১১ সাল) কর্মকর্তারা জানতে পারেন। এরপর ১৫ ডিসেম্বর রাতে সেনানিবাসের পাশে মাটিকাটা এলাকার বাসভবন থেকে লে. কর্নেল (অব.) এহসান ইউসুফকে এবং ৩১ ডিসেম্বর ইন্দিরা রোডে এক আত্মীয়র বাসা থেকে মেজর (অব.) কে এম জাকির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে ব্যবসায়ী ইশরাক আহমেদ ও মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হকের নাম আসে।

গ্রেপ্তার দুই কর্মকর্তা সামরিক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চাইলে তাঁদের ঢাকা মহানগর আদালতে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁরা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তাঁরা জানান, ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত করে ইশরাক সরকারপ্রধান হতে চেয়েছিলেন। ওই সময়ের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ও বেসামরিক ব্যক্তির সমন্বয়ে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার ছক তৈরি হয়েছিল। কিভাবে সেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে এর রূপরেখাও তাঁরা প্রস্তুত করেছিলেন।

পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য মতে, ইশরাক আহমেদের পৈতৃক বাড়ি নওগাঁয়। তিনি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে পাস করার পর ১৯৮১ সালে ঢাকায় আসেন। তাঁর বাবা এম এ রাকিব ১৯৭৭ সালে নওগাঁ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন; ন্যাপের (জাতীয় আওয়ামী পার্টি) নওগাঁ জেলা সভাপতি হিসেবেও বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মা উম্মে কুলসুম জান্নাতুন ফেরদৌস নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ১৯৮০ ও ৮৮ সালে তাঁর দুই বোন স্বামীসহ পাকিস্তানে প্রবাসী হন।

সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে ইশরাক আহমেদ, মেজর জিয়াসহ অন্য সহযোগীদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনি শরিফুল হক ডালিমও একজন সমন্বয়কের ভূমিকায় ছিলেন বলে গ্রেপ্তারকৃতদের জবানবন্দি থেকে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল ডেস্ক ও মিডিয়া শাখায় যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ইশরাক আহমেদের অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের হাতে কোনো তথ্য নেই। এ ব্যাপারে তাঁরা খোঁজখবর নেবেন।



মন্তব্য