kalerkantho


ঢাকায় চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তাকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকায় চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তাকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ

র‌্যাবের একটি ব্যাটালিয়নের সাবেক পরিচালক ও সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (চাকরিচ্যুত) হাসিনুর রহমানকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্য পরিচয় দিয়ে একদল লোক তুলে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার। এ ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর পল্লবী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ (জিডি) দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী শামীমা আক্তার।

জানতে চাইলে পল্লবী থানার ওসি নজরুল ইসলাম গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, হাসিনুর রহমানকে তুলে নেওয়া হয়েছে দাবি করে তাঁর স্ত্রী শামীমা আক্তার একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। হাসিনুরের পরিবারের দেওয়া অভিযোগের তদন্ত চলছে। তবে এখনো তাঁর খোঁজ জানা যায়নি।

থানায় করা অভিযোগে বলা হয়েছে, গত বুধবার রাত আনুমানিক ১০টা ২০ মিনিটের দিকে রাজধানীর মিরপুরের ডিওএইচএস এলাকা থেকে হাসিনুর রহমানকে একটি মাইক্রোবাসে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে কে বা কারা তাঁকে তুলে নিয়ে যায় তা জিডিতে উল্লেখ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন পল্লবী থানার ওসি নজরুল ইসলাম। 

তবে স্ত্রী শামীমা আক্তার সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, হাসিনুরকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। বুধবার রাতে তিনি মিরপুর ডিওএইচএসে এক বন্ধুর বাসায় দাওয়াত খেতে যান। একপর্যায়ে সেখান থেকে নিচে নেমে দেখেন কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে। এ সময় ওই লোকগুলো তাঁকে একটি গাড়িতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় তিনি চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়। তখন ওই লোকগুলো নিজেদের ডিবি সদস্য বলে পরিচয় দেয়। এ সময় হাসিনুর ও তাঁর বাসার নিরাপত্তারক্ষীকে তুলে নিয়ে যায় তারা। যদিও কিছুদুর যাওয়ার পর ওই নিরাপত্তারক্ষীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে এর পর থেকে হাসিনুরের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

শামীমা আক্তার আরো দাবি করেন, হাসিনুরকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরপরই তিনি বুধবার রাতেই পল্লবী থানায় অভিযোগ দিতে যান। তবে পুলিশ রাতে জিডি গ্রহণ করেনি। গভীর রাত পর্যন্ত থানায় বসে থাকলেও পুলিশ রাতে হাসিনুরের খোঁজ দিতে পারেনি। এমনকি জিডিও নেয়নি। গতকাল সকালে আবার থানায় গেলে তাঁদের অভিযোগ নেওয়া হয়।

ডিবি সদস্যরা হাসিনুরকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছে—শামীমা আক্তারের এমন দাবি অস্বীকার করেছেন ডিবির উপকমিশনার (পশ্চিম জোন) মোখলেছুর রহমান। তিনি গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডিবি তাঁকে (হাসিনুর) আটক বা তুলে নেয়নি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসিনুর রহমান কয়েক বছর আগে সামরিক বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হন। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে জড়িত থাকার দায়ে সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানকে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে চার বছর তিন মাসের কারাদণ্ড দিয়ে ২০১২ সালের ১৫ মার্চ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

জানা যায়, হাসিনুর রহমানকে ২০১১ সালের ৯ জুলাই আটক করা হয়েছিল। সে সময় তিনি ময়মনসিংহে আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডে কর্মরত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে (বিএমএ) ১০তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের (লংকোর্স) মাধ্যমে ১৯৮৪ সালের ১ জুন সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। হাসিনুর র‌্যাবের একটি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন দীর্ঘদিন।

হাসিনুর রহমানকে গ্রেপ্তার নিয়ে সে সময় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানকে শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে সেনা আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পরই ঘটনা তদন্তে ২০১১ সালের ১১ জুলাই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত আদালত গঠন করা হয়। তদন্ত আদালতের সুপারিশের ভিত্তিতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর একটি ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শাল গঠন করা হয়।

জানা যায়, সে সময় হাসিনুরের বিরুদ্ধে হরকাতুল জিহাদ, হিযবুত তাহ্রীর ও পাহাড়ে শান্তিচুক্তিবিরোধী একটি গ্রুপের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রক্ষা এবং সেনা অভিযানের খবর ফাঁস করার অভিযোগ ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরেও ইন্টারনেটে তাঁর মাধ্যমে নানা গুজব, অপপ্রচার চালানোর তথ্য রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কাছে।

হাসিনুরকে কারাগারে পাঠানোর আগে ২০১২ সালের ১০ মার্চ তাঁর মা হালিমা রহমান রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ছেলেকে মুক্তি দিয়ে চাকরিতে বহাল করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সবিনয় অনুরোধ জানান। হালিমা রহমান একই সঙ্গে তাঁর ছেলেক আটক করে তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এবং এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।

ওই সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে হালিমা রহমান জানান, ২০১১ সালের ৯ জুলাই রাত ১০টায় হঠাৎ করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুরকে অফিসের জরুরি কাজে ডেকে নিয়ে যান ঊর্ধ্বতন এক সেনা কর্মকর্তা। এরপর ওই বছরের ১৫ জুলাই পত্রিকা মারফতে জানা যায় তাঁকে আটক করে সেনা হেফাজতে রাখা হয়েছে। তিনি আরো জানান, হাসিনুর ২৮ বছরের চাকরিজীবনে পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশনে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীরপ্রতীক, বিডিআর পদক, জঙ্গি দমনে পুলিশ মেডেলপ্রাপ্ত একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন।



মন্তব্য