kalerkantho


ভর্তি পরীক্ষার গুচ্ছ পদ্ধতি চালুর বাধা বড় বিশ্ববিদ্যালয়

শরীফুল আলম সুমন   

২৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ভর্তি পরীক্ষার গুচ্ছ পদ্ধতি চালুর বাধা বড় বিশ্ববিদ্যালয়

রাষ্ট্রপতির অভিপ্রায় সত্ত্বেও বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনাগ্রহের কারণে আটকে আছে ভর্তি পরীক্ষার সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতি। এই পদ্ধতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে মূলত বাধা হয়ে আছে ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই। ফলে আগের বছরের মতো এবারও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সাড়ে আট লাখ শিক্ষার্থীকে। এমনকি শুধু ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য একই জেলায় দুবারও যেতে হয় একজন শিক্ষার্থীকে। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

জানা যায়, শিক্ষার্থীদের এখন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদাভাবে ফরম কিনতে হয়। এতে বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোটা অঙ্কের আয় হয়। যদিও ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে আয়ের ৪০ শতাংশ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা রেখে তা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করার নির্দেশনা রয়েছে ইউজিসির। কিন্তু বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় ওই নির্দেশনা মানে না। আর ভর্তি পরীক্ষার গুচ্ছ পদ্ধতি চালু হলে বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওই আয় কমে যাবে। ফলে ওই সব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ চায় না পদ্ধতিটি চালু হোক। এ ছাড়া ভর্তি বাণিজ্য আর কোচিং-গাইড বাণিজ্য বহাল রাখার স্বার্থেও কোনো কোনো মহল এ পদ্ধতির বিরোধিতা করে। গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা হলে এ ধরনের ব্যবসায় বড় ধস নামবে। এসব কারণে এবারও চালু হচ্ছে না ভর্তি পরীক্ষার গুচ্ছ পদ্ধতি। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গুচ্ছ পদ্ধতির ব্যাপারে ইউজিসি চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একটা কমিটি কাজ করছে। এবার হয়তো করা যাবে না। তবে আগামীতে হবে।’

২০১৬ সালের নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একেকবার ভর্তি পরীক্ষা দিতে শিক্ষার্থীদের দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার ভোগান্তি নিয়ে রাষ্ট্রপতি ব্যথিত হন বলেও জানান। এর কিছুদিন পর ইউজিসি চেয়ারম্যান রাষ্ট্রপতির কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন হস্তান্তর করতে গেলে তখনো ভর্তি পরীক্ষার সমন্বিত পদ্ধতির বিষয়ে খোঁজ নেন রাষ্ট্রপতি। এর পর থেকে আলোচনা চললেও এ বিষয়ে এখনো সম্মতই হতে পারেনি সবাই।

তবে গুচ্ছ পদ্ধতির বিষয়ে একটি কমিটি কাজ করছে বলে জানা গেছে। এর আহ্বায়ক হলেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। আর সদস্য হলেন ইউজিসির চারজন সদস্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক।

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গুচ্ছ পদ্ধতির ব্যাপারে উপাচার্যদের সঙ্গে মিটিং করেছি। তাঁরা নীতিগতভাবে সম্মত। তবে এ বছর কারো প্রস্তুতি নেই। আগামী বছর করবে বলে অনেকে জানিয়েছেন। তবে সবাই যে একসঙ্গে করবেন এটা আমরা আশা করি না। কিন্তু একবার শুরু হলে একসময় সবাই চলে আসবেন।’

কয়েক বছর ধরে মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে সমন্বিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানায়, এতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি লাঘব হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও এমনটি হওয়া উচিত। তাদের মতে, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তিন ভাগে ভাগ করে এ পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। যদিও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে যৌথভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা সফলতার মুখ দেখেনি।

ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রথম বর্ষ স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে এরই মধ্যে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের স্ট্যান্ডিং কমিটির ২৫৭তম সভায় ওই তারিখ ঠিক করা হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ৬ অক্টোবর, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ নভেম্বর, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২১ অক্টোবর, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৭ অক্টোবর এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ নভেম্বর ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে সম্ভাব্য তারিখ হলো—শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ ডিসেম্বর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ নভেম্বর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ নভেম্বর, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩ নভেম্বর এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪ নভেম্বর।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩ অক্টোবর, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬ থেকে ২৯ নভেম্বর, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ নভেম্বর ও ১ ডিসেম্বর, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২১ ও ২২ ডিসেম্বর, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬ থেকে ২৮ অক্টোবর, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২ থেকে ২৪ নভেম্বর, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬ নভেম্বর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ ও ৫ ডিসেম্বর ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪, ১৫, ২১, ২২, ২৮ সেপ্টেম্বর ও ১২ অক্টোবর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর (২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর বাদে), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২, ২৩ অক্টোবর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৭ থেকে ৩০ অক্টোবর, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ থেকে ৭ নভেম্বর, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭ নভেম্বর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬, ১৩ ও ২৭ অক্টোবর, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ ও ১০ নভেম্বর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ থেকে ১৫ নভেম্বর, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ থেকে ২৯ নভেম্বর, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে ২৬ ও ২৭ অক্টোবর, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩ ও ২৪ নভেম্বর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ থেকে ১০ নভেম্বর এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ১ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর ফরম বিতরণ শুরু এবং ১১ অক্টোবর থেকে ক্লাস শুরুর সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীরা বলছে, এভাবে মূলত অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসজুড়ে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আর শিক্ষার্থীদেরও ছুটতে হবে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। অথচ গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা হলে তিন দিনের মধ্যেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শেষ করা সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী ২৫ জুলাই আমাদের মিটিং রয়েছে। সেখানে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হবে।’ এর বাইরে কোনো কথা বলতে তিনি রাজি হননি।

এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছে আট লাখ ৫৮ হাজার ৮০১ জন। তাদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ২৯ হাজার ২৬২ জন। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৪২টি, যার মধ্যে ৩৮টির শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। তবে জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বাদে তাদের আসন সংখ্যা প্রায় ৪৮ হাজার। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে আসন রয়েছে তিন লাখ ৯৮ হাজার ৯৩০টি এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন ৭৭৭টি। সরকারি ৩০ মেডিক্যাল কলেজে আসন তিন হাজার ২১২টি, বেসরকারি ৬৪ মেডিক্যাল কলেজে আসন প্রায় ছয় হাজার। সরকারি ৯ ডেন্টাল কলেজে আসন ৫৬৭টি এবং বেসরকারি ১৪ ডেন্টাল কলেজে আসন ৮৯০টি। সরকারি ছয় টেক্সটাইল কলেজে আসন ৪৮০টি, সরকারি মেরিন একাডেমিতে আসন ৩০০টি, বেসরকারি ১৭ মেরিন একাডেমিতে আসন এক হাজার ৩৬০টি। দুটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫০ শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ৯৬ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সেমিস্টারে আসন সংখ্যার হিসাব ধরে চলতি শিক্ষাবর্ষে অনার্স কোর্সে মোট আসনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ। এর বাইরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পর্যায়ে প্রায় সাত লাখ আসন রয়েছে। তাই আসনের কোনো সংকট হবে না। তবে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেতে বেশ প্রতিযোগিতায় নামতে হবে শিক্ষার্থীদের।

 

 



মন্তব্য