kalerkantho


জব্দ সোনার আদ্যোপান্ত

১০ বছর পরও নিলাম স্থগিত

শেখ শাফায়াত হোসেন   

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



১০ বছর পরও নিলাম স্থগিত

দীর্ঘ ১০ বছর পর ১০ কেজি সোনা নিলামের আয়োজনও স্থগিত হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সর্বশেষ সোনার নিলাম করেছিল ২০০৮ সালে। ওই বছর চারটি লটে ৯১ কেজি সোনা নিলাম করা হয়। এর পর থেকে এ পর্যন্ত ৯৬৩ কেজির কিছু বেশি পরিমাণ জব্দ করা সোনা আদালতের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের অস্থায়ী খাতে জমা পড়েছে। সেখান থেকেই এই নিলামের আয়োজন করা হয়েছিল।

শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে সোনা আনার পথে জব্দ হওয়ার বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটে থাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আর জব্দ সোনার পুরোটাই জমা করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে। স্বাধীনতার পর থেকে জব্দ হওয়া সোনার মধ্যে রাষ্ট্রের অনুকূলে আদালত থেকে বাজেয়াপ্ত হওয়া দুই হাজার ৩০০ কেজি সোনা কিনে রিজার্ভে যোগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিগগিরই আরো ১৮ কেজি রিজার্ভে নেওয়া এবং ১০ কেজি নিলামে বিক্রির কথা থাকলেও আপাতত তা স্থগিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে সরকারের কোষাগারে ওই পরিমাণ সোনা বিক্রির অর্থ জমা হতে আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত শুল্ক গোয়েন্দারা বিভিন্ন জায়গা থেকে মোট চার হাজার ৬৪৫ কেজি বা ১১৬ মণের সামান্য বেশি সোনা জব্দ করেছে। এর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে না পারায় তা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সোনার মধ্যে দুই হাজার ২৯৯ কেজি বা ৫৭ মণ ১৯ কেজি সমসাময়িক আন্তর্জাতিক দরে কিনে সরকারকে টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বাইরে ২৪ মণ বা ৯৬৩ কেজি সোনার বিপরীতে এখন আদালতে মামলা চলছে। আর বিভিন্ন সময়ে নিলামের মাধ্যমে কিছু সোনা বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া আদালতের নির্দেশে শুল্ক পরিশোধ সাপেক্ষে কিছু সোনা ফেরত দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জব্দ করা সোনার কোনো দাবিদার না পাওয়া পর্যন্ত সেগুলো অস্থায়ী খাতে রাখা হয়। এ বিষয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের করা মামলা নিষ্পত্তির পর এর মালিকের অনুকূলে সোনা ফেরত দেওয়ার রায় না গেলে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে এর মালিক ঘোষণা করা হয়। পরে ওই সোনা স্থায়ী খাতে নিয়ে নিলামের আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সোনাগুলো যদি স্ট্যান্ডার্ড হলমার্ক স্টিকারযুক্ত বার আকারে থাকে, তবে সেগুলো আন্তর্জাতিক দরে কিনে নিয়ে রিজার্ভে রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মূল্যবান দ্রব্য গুদাম কর্তৃপক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অস্থায়ী খাতে ৯৬৩ কেজির কিছু বেশি সোনা জমা করা হয়েছে। ২০০৮ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত অস্থায়ী খাত থেকে স্থায়ী খাতে এসেছে ২৮ কেজির  কিছু বেশি সোনা। এর মধ্যে ১৫৫টি বারের ওজন ১৮ কেজির কিছু বেশি। এই বারগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক কিনে নেবে। বাকি ১০ কেজি সোনার অলংকার নিলামের জন্য সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের তিনজন কর্মকর্তাসহ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ মোট পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। তবে ওই সোনার পরিমাপ ও মান নিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে ওই ১০ কেজি সোনার বিক্রিপ্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের কারেন্সি অফিসার আওলাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘স্থায়ী খাতের সোনা আমরা নিলাম করে থাকি। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিলামপ্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে।’

কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে গতকাল বুধবার বলেন, ‘স্থায়ী খাতে নিলাম করার মতো সোনা জমা না হওয়ায় গত ১০ বছরে কোনো নিলাম হয়নি। বর্তমানে ১০ কেজির কিছু বেশি সোনা নিলাম করার সুযোগ রয়েছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যেহেতু এই সোনা জমা রেখেছিল, সেহেতু এই সোনার মালিক তারা। বাংলাদেশ ব্যাংক এই সোনা নিলাম করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে দেবে, যা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তাদের আয়ের খাতে দেখাবে। পরে ওই অর্থ তারা সরকারের হিসাবে জমা করবে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, জব্দ সোনার মধ্যে শুধু অলংকার এবং প্রথম শ্রেণির নয় এ রকম সোনার বার নিলামে বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ নিলামটি হয়েছে ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই। সে সময় ২১ কেজি ৮২২ গ্রাম সোনা বিক্রি করা হয়েছিল। একই বছরে আরো তিন ধাপে ২৫, ২৫ ও ২০ কেজি সোনা নিলামে বিক্রি করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, ট্যারিফ কমিশন ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ২০১১ সালে পরিচালিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈধ উপায়ে কোনো সোনা আমদানি হয় না। এ অবস্থায় দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশ থেকে এক শ্রেণির চোরাকারবারির সহায়তায় সোনা এনে তা এখানকার বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। দীর্ঘদিনের দাবির পর সোনা আমদানির জন্য সম্প্রতি একটি নীতিমালা করা হয়েছে।

দেশে সোনা আমদানির প্রক্রিয়া সহজতর না হওয়ায় বাজারে সোনার জোগান বাড়াতে জব্দ করা সোনা নিলামের দাবি জানিয়ে আসছিলেন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) নেতারা।

 



মন্তব্য