kalerkantho


পুরনো মামলা নিষ্পত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ পালনে ধীরগতি

‘ঘানি টানতে টানতে ক্লান্ত’

আশরাফ-উল-আলম   

১৯ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



পুরনো মামলা নিষ্পত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ পালনে ধীরগতি

পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেওয়ার পর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে, কিন্তু আশানুরূপ ফল মিলছে না। এখনো বিচারপ্রার্থীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। ব্যক্তি ও সরকারের অর্থের অপচয় হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে আদালতের সময়।

প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় গত ২০ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জেনারেল (বর্তমানে রেজিস্ট্রার জেনারেল) মো. জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বলা হয়, ‘দেশের অধস্তন আদালতসমূহে বর্তমানে ২৮ লক্ষাধিক মামলা বিচারাধীন এবং ক্রমান্বয়ে মামলাজট বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিচারাধীন মামলার মধ্যে পাঁচ বছরের অধিক পুরাতন মামলার সংখ্যাও কম নয়। কাঙ্ক্ষিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশা। ফলে মামলা নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধিসহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাঁচ বছরের অধিক পুরাতন মামলা নিষ্পত্তি করে ক্রমবর্ধমান মামলাজট নিরসনের বিকল্প নেই। এমতাবস্থায় দেশের সকল অধস্তন আদালত/ট্রাইব্যুনালকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাঁচ বছরের অধিক পুরাতন মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ প্রদান করা হলো।’

নির্দেশে বলা হয়, মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রত্যেক আদালত ও ট্রাইব্যুনালে পাঁচ বছরের অধিক পুরনো বিচারাধীন মামলা ও নিষ্পত্তির বিবরণী সুপ্রিম কোর্টে পাঠাতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রশাসন ও বিচার) মো. আক্তারুজ্জামান ভূঁইয়া চিঠি দিয়েও দেশের সব অধস্তন আদালতকে বিষয়টি অবহিত করেন।

দেখা গেছে, পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে বিচারাধীন মামলাই নয়, কয়েক দশক ধরে বিচারাধীন মামলাও এখন চলছে। দেশের নিম্ন আদালতে আদেশটি কার্যকর করার তেমন তৎপরতা চোখে পড়ছে না। এতে করে মামলাজট আরো বেড়ে যাবে বলে মনে করেন আইনজীবীরা।

বিশিষ্ট আইনজীবী ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান মানিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের আদেশ বাধ্যতামূলক না হলেও ওই আদেশের প্রতি বিচারক, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে শ্রদ্ধা দেখাতে হবে। এই শ্রদ্ধাবোধের অভাবেই বছরের পর বছর মামলা অনিষ্পন্ন থাকে।’ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. জাকারিয়া হায়দার বলেন, ‘বাদী হাজির না থাকলেও যে আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হয় না, সেখানে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটা তো বলা যাবে না।’ তিনি আরো বলেন, নিষ্পত্তি না করে ঝুলিয়ে রাখা ন্যায়বিচার নয়।  ঢাকার আদালতের ফৌজদারি আইনজীবী মাখন রায় বলেন, অনেক বছর ধরে চলা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা উচিত সেবামূলক মনোভাব থেকে। বিলম্বিত বিচারে সব সময় ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হয়।

ভোগান্তির কিছু নজির : ১৯৯১ সালের ১৬ মে তেজগাঁওয়ে বিএডিসির কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগারে তিন পাহারাদারের হাত-পা, চোখমুখ বেঁধে, তালা ভেঙে দুষ্কৃতকারীরা ১৫ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি পিকআপে করে নিয়ে যায়। ১৯ বছর তদন্ত শেষে চার্জশিট দেওয়া হয়। বর্তমানে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। মামলার কয়েকজন আসামি ও সাক্ষী মৃত্যুবরণ করেছেন বলে জানা গেছে।

২০০৭ সালের ২৫ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের ডিজিএফআই সদর দপ্তরের (পরিচয় উল্লেখ নেই) মির্জা মো. মাহবুব আলম মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের ঘটনায় দস্যুতার মামলা করেন শিমুল নামের একজনের বিরুদ্ধে। চার্জশিট দেওয়ার সময় শিমুল শিশু ছিলেন। বিচার যখন শুরু হয় শিমুল প্রাপ্তবয়স্ক। বিভিন্ন আদালত ঘুরে এখন বিচার চলছে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১-এ। শিমুলের আইনজীবী নজরুল ইসলাম হাওলাদার বলেন, ১০ বছর আগে বিচার শুরু হলেও মাত্র একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।

কুড়ি বছর আগের দায়ের করা একটি মামলায় এখনো হাজিরা দেন কুমিল্লার ধর্মপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জামাল হোসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আর কত? মিথ্যা মামলায় কুড়ি বছর আগে গ্রেপ্তার হয়েছিলাম। ঘানি টানতে টানতে এখন আমি ক্লান্ত। কিন্তু হাজির না থাকলে তো আবার ধরে আনবে পুলিশ।’

১৯৯৮ সালে রাজধানীর জয়কালী মন্দিরের হোটেল মিতালীর সামনে পুলিশ অটোরিকশার ভেতর থেকে ১৬ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার করে। আটক হয় যাত্রী জামাল হোসেন। ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১০-এ বিচার চলছে। ২০ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি।

আইনবিষয়ক জার্নাল ঢাকা ল রিপোর্টস-এর ৪৪তম সংখ্যায় হাইকোর্টের একটি সিদ্ধান্ত স্থান পেয়েছে। আইয়ুব আলী বাঙ্গালী বনাম মিয়া মনির আহমেদ গং মামলায় হাইকোর্ট বলেন, বাদী বা তাঁর আইনজীবী কেউ হাজির হয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিলে ম্যাজিস্ট্রেটের মামলার শুনানি স্থগিত করার কোনো কারণ নেই। প্রতিপক্ষকে অব্যাহিত দিতে তিনি বাধ্য। উচ্চ আদালতের এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়ার নজির সিএমএম আদালতের ৪২২/২০১২ নম্বর নালিশি মামলাটি। মো. দিদার হোসেন অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০১২ সালে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে একটি মামলা করেন। মামলার নথি থেকে দেখা যায়, বাদী গত তিন-চার বছর ধরে আদালতে হাজির হচ্ছেন না। বিভিন্ন আদালতে স্থানান্তরিত হচ্ছে মামলাটি। ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৭ ধারায় বলা হয়েছে, নালিশি মামলায় ফরিয়াদি বা বাদী শুনানির তারিখে হাজির না হলে যে বিধানই থাকুক না কেন ম্যাজিস্ট্রেট আসামিকে খালাস দেবেন, যদি না তিনি অন্য কোনো কারণে অন্য কোনো দিন পর্যন্ত শুনানি মুলতবি রাখতে যথাযথ বিবেচনা করেন। মামলাটির আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. হাবিবুর রহমান পিন্টু কালের কণ্ঠকে বলেন, বাদী বা তাঁর আইনজীবী বছরের পর বছর হাজির না হলেও বারবার এই মামলার শুনানি মুলতবি রাখা হচ্ছে। এই মুলতবি রাখার যথাযথ বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই।

১৯৯৮ সালের ৩ ডিসেম্বর হকার জুম্মন মিয়া হামলার শিকার হয়ে মারা যান। হকার সমিতির লেনদেন নিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে এজাহারে লেখা হয়। জুম্মনের স্ত্রী ফাতেমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কুড়ি বছরেও বিচার অইবো না, হেইডা জানতাম না। আমরা গরিব সেই কারণেই বিচার অইত্যাছে না। তবে বিচার অইবো হেইডা একটু জানতে চাই।’ মামলার নথি থেকে দেখা যায়, আনিস, আলেক, সামছুদ্দিন, জাবেদ ও মনির ওরফে মন্টু ওরফে মনিরুলের বিরুদ্ধে ১৯৯৯ সালের ১৮ এপ্রিল চার্জশিট দেয় পুলিশ। ২০০২ সালে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। মামলা আর নিষ্পত্তি হয়নি।

 



মন্তব্য