kalerkantho


অবজ্ঞার কথা মনে করিয়ে দিলেন মডরিচ

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



অবজ্ঞার কথা মনে করিয়ে দিলেন মডরিচ

কেইন-লিনগার্ডের চেয়েও বড় ভুল করেছে ইংলিশ মিডিয়া। যুদ্ধের ভেতর বেড়ে ওঠা একদল ফুটবলারকে ‘ক্লান্ত’ বলে তাতিয়ে দিয়ে বিপদ ডেকে আনে ইংল্যান্ডের। সেই ‘ক্লান্ত’ ক্রোয়েশিয়াই সেমিফাইনালে ২-১ গোলে হারিয়ে ইংলিশ ফুটবলের বিশ্বকাপ ফাইনালের স্বপ্ন মুছে দিয়েছে। এরপর সেই সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে ক্রোয়েশিয়ান অধিনায়ক লুকা মডরিচ বলছেন, “ইংলিশ সাংবাদিক বিশেষজ্ঞরা আমাদের অবজ্ঞা করে বড় ভুল করেছে। তাদের সব কথা শুনে আমরা নিজেদের বলেছিলাম, ‘ঠিক আছে, কারা ক্লান্ত সেটা আজ দেখা যাবে।’”

পরশু রাতের সেমিফাইনালে পুরো ফুটবলবিশ্ব দেখেছে কারা ক্লান্ত। ৫ মিনিটে লিড নিয়েও ইংল্যান্ড পারেনি। আবারও ৯০ মিনিটের ম্যাচকে ১২০ মিনিটে টেনে নিয়ে ক্রোয়েশিয়া দফারফা করে ছেড়ে দিয়েছে ইংলিশ ফুটবলের। ফুটবল জনকদের মুখে আবারও চুনকালি, চতুর্থবারের মতো বড় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে উঠে ফুটো হয়ে গেছে তাদের প্রত্যাশার বেলুন। প্রত্যাশা বেড়েছিল ক্রোয়েশিয়াকে দেখেই, যেন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় এই দলকে। ইংলিশ মিডিয়া তাই করেছিল, নিজেদের মতো করে বিশ্লেষণ করে তাদের উড়িয়ে দিয়েছিল ম্যাচের আগেই! ম্যাচে তার জবাব দিয়ে বেজায় খুশি মডরিচ, ‘তাদের দেখিয়েছি আমরা ক্লান্ত নই। পুরো ম্যাচে শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে, আসলে সব দিক দিয়েই আমরা কর্তৃত্ব করেছি।’ ইংলিশ মিডিয়া আসলে ভুলে গিয়েছিল এই ক্রোয়াট প্রজন্মের মানসিকতার ভিতটা। তারা অনেকেই যুদ্ধের ভেতর দিয়েই বেড়ে উঠেছে।

লুকা মডরিচ যেমন ‘গ্রেনেড-ফিল্ডে’ ফুটবল খেলেই বড় হয়েছেন। তাঁর জন্ম ১৯৮৫ সালে, জন্মের ছয় বছরের মাথায় শুরু হয় তাঁদের ‘মুক্তিযুদ্ধ’। যুগোস্লাভিয়া থেকে ক্রোয়েশিয়ার আলাদা হওয়ার যুদ্ধ, তাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন তাঁর বাবা। ’৯৫ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে মারা গেছে অন্তত ২০ হাজার মানুষ। তাঁর দাদাও খুন হয় যুগোস্লাভিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে। এই ভয়াবহ নৃশংসতার মধ্যে তাঁরা জাদার শহর চেড়ে চলে যায় অন্যত্র, শরণার্থী হয়ে বিভিন্ন হোটেলে কাটায় বেশ কয়েক বছর। এক মহা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই ক্রোয়েশিয়ান ফুটবল অধিনায়কের বড় হওয়া। টেলিস্পোর্টের ক্রোয়েশিয়ান সাংবাদিক ইভান ভ্রদোয়াক বলেছেন, ‘শুধু মডরিচ নয়, এই দলের অনেকের জন্ম হয়েছে যুদ্ধের অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাদের হয়তো যুদ্ধ করতে হয়নি, তবে তাদের পরিবারে সেই যুদ্ধের আঁচ লেগেছে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা বুঝেছে, সে এক কঠিন সময় পার করেছে ক্রোয়েশিয়া।’ ওই যুদ্ধ তাদের নতুন দেশ দিয়েছে, দিয়েছে আলাদা পরিচয়। আর এই পরিচয়েই তারা বিশ্বকাপ ফুটবল রাঙাচ্ছে ১৯৯৮ থেকে।

ফ্রান্সের সেই বিশ্বকাপ হয়েছিল তাদের অভিষেক। এসেই সেমিফাইনালে উঠে সবাইকে চমকে দেয় ছোট দেশটি। উত্তরাধিকার সূত্রে তারা যুগোস্লাভিয়া থেকে পেয়েছিল ফুটবল। সেটা যে অমনভাবে বিশ্ব ফুটবলকে রাঙিয়ে দেবে, কেউ কল্পনা করেনি। ডেভর সুকার-বোবনাদের প্রজন্মটাই ক্রোয়েশিয়াকে সেমিফাইনালে তুলে নিয়েছিল ফ্রান্স বিশ্বকাপে। স্বাগতিকদের কাছে হারলেও স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে বিশ্বকাপের অভিষেকেই তৃতীয়! সেই উজ্জ্বল সময়ের বিশ বছর পর মডরিচ-রাকিটিচ-পেরিসিচদের পায়ে আবার ক্রোয়াট বিস্ফোরণ হয়েছে রাশিয়া বিশ্বকাপে। পরিণতি—পূর্বসূরিদের চেয়ে অন্তত এক ধাপ এগিয়ে থাকবেন তাঁরা। ৩২ বছর বয়সী অধিনায়ক যে সেরা হয়েই শেষ করতে চান, ‘আমরা ফাইনালে পৌঁছে বড় স্বপ্ন দেখছি। তবে এটাও ক্রোয়েশিয়ান ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় সাফল্যগাথা।’

আগের মাইলস্টোন ছিল সেমিফাইনাল। ২০ বছর পর হয়েছে নতুন মাইলস্টোন ফাইনাল। এই ফাইনালে আবার প্রতিশোধের হিসাব-নিকাশও চলে এসেছে। ২০ বছর আগে সেমিতে ফ্রান্সের কাছে হারার প্রতিশোধ হবে ফাইনালে! ইতিউতি এমন গুঞ্জন শোনা গেলেও অধিনায়কের মুখে প্রতিশোধস্পৃহা দেখা যায়নি। তবে উল্টোদিক থেকে কিছু বলা হলে তার ফল মিটিয়ে দেবে তারা কড়ায়গণ্ডায়। যারা ১২০ মিনিটের ম্যাচ খেলতে পারে তাদের নিয়ে হটকারী মন্তব্য করে ফ্রান্সও বিপদ ডেকে আনবে না! গোল ডটকম

 



মন্তব্য