kalerkantho


প্রতিরোধের মুখে মাদক কারবারিরা

ওমর ফারুক   

২১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



প্রতিরোধের মুখে মাদক কারবারিরা

প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাদকের হাট বসত রাজধানীর হাজারীবাগের গণকটুলী সুইপার কলোনিতে। কলোনির বাসিন্দা ছাড়াও এই হাটে আসত আশপাশের এলাকা থেকে মাদকসেবী ও বিক্রেতারা। এদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস ছিল না কারো। প্রতিবাদ করলে উল্টো মার খেতে হতো।

গত ২৭ মের পর পাল্টে গেছে গণকটুলীর এই দৃশ্যপট। পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান মন্ত্রের মতো বদলে দিয়েছে পুরনো চিত্র। বর্তমানে এখানে মাদক বিক্রি করতে ভয় পাচ্ছে মাদক বিক্রেতারা। মাদকের অভাবে প্রতি সন্ধ্যায় অস্থির হয়ে ওঠে মাদকসেবীরা। কেউ মাদক বিক্রির চেষ্টা করলে গোপনে পুলিশকে খবর দিচ্ছে কলোনির বাসিন্দারা।

গতকাল বুধবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এলাকাটিতে সরেজমিনে ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে গণকটুলী সুইপার কলোনির প্রধান মাদক কারবারি সুমন চন্দ্র দাসকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তার স্ত্রী নতুন করে আস্তানাটি চালুর চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।

গত ২৭ মে রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মারুফ হোসেন সর্দারের নেতৃত্বে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত অভিযান চালায় পুলিশ। সে সময় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও বয়সের ১০৫ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় তারা, যার মধ্যে পাঁচজন নারী ছিল। পরে তাদের  মধ্যে ৫৫ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২৪ জনের বিরুদ্ধে করা হয় মাদক মামলা। ৩১ জনকে ডিএমপির অধ্যাদেশে

আদালতে চালান দেওয়া হয়। সেই ৩১ জন পরদিনই মুক্তি পেয়ে যায়। ২৪ জনের মধ্যে গতকাল বুধবার পর্যন্ত আটজন জামিনে বেরিয়ে এসেছে বলে পুলিশ সূত্র জানায়। তবে তাদের ওপর নজর রাখছে পুলিশ।

গতকাল এলাকাটিতে ঘুরে দেখা গেছে, কলোনিবাসী বেশ খুশি। কলোনির বাসিন্দা জিন্নাত আলী কালের কণ্ঠকে জানান, পুলিশের এই অভিযানকে তাঁরা আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন। পুলিশের অভিযানের পর তাঁরা ভালো আছেন। বর্তমানে কলোনি মাদকমুক্ত। সামনেও এমটাই চাইছেন তাঁরা। সরকারকেও ধন্যবাদ জানান এই বাসিন্দা।

সাংবাদিক পরিচয় জেনে কলোনির বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জড়ো হয়। তাদের প্রত্যেকে জানায়, মাদকবিরোধী অভিযানের আগে প্রতিদিন সন্ধ্যায় কলোনিতে এক থেকে দেড় শ মাদকসেবী একসঙ্গে বসে ইয়াবা, গাঁজাসহ নানা মাদক সেবন করত। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পেত না। মাদক কারবারিদের সঙ্গে ছিল পুলিশের সখ্য, যে কারণে পুলিশের কাছে অভিযোগ করলেও লাভ হতো না। কিছু মাদক কারবারি কলোনির। এ ছাড়া বাইরে থেকেও কেউ কেউ আসত। পুলিশ এখান থেকে মাসোয়ারা নিয়ে যেত।

বয়স্ক এক বাসিন্দা ওপরের দিকে দুই হাত তুলে মোনাজাত ধরে বলেন, ‘এমন দিন আসবে, কোনো দিন ভাবতে পারিনি।’ আরেক বাসিন্দা জানান, অভিযানের সময় ভালো মানুষকেও ধরে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। তাদের মধ্যে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীও ছিল। পরে তাদের থানা থেকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। ছাড়া পাওয়া এই শিক্ষার্থীরা সবাই একত্রিত হয়ে বর্তমানে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। মাদকসেবী কিংবা কারবারিকে দেখা গেলে মারধর করে কলোনি থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দুঃখ, এসব মাদকসেবী ও কারবারির কারণে এই কলোনিতে অভিযান চলেছে। বিনা দোষে পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে গেছে। তাদের মান-সম্মান নষ্ট হয়েছে এসব মাদকসেবী ও কারবারির কারণে। এ কারণে তারা এখন প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। আরেক বাসিন্দা জানান, তাঁদের কাছে পুলিশের মোবাইল ফোন নম্বর আছে। কোনো মাদক কারবারি নতুন করে মাদক বিক্রির চেষ্টা করলে তার তথ্য পুলিশকে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গত মঙ্গলবারও একজনকে ধরে পুলিশে দেওয়া হয়েছে।

আরেক বাসিন্দা অশোক কুমার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানের পর থেকে পুলিশ কলোনির খোঁজখবর রাখছে। যদি এভাবে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হয় তাহলে এই কলোনি মাদকমুক্ত থাকবে। জনগণ পুলিশকে সহযোগিতা করছে।’

আরেক বাসিন্দা জানান, এই কলোনিতে শতাধিক মাদকসেবী রয়েছে। অভিযানের পর বর্তমানে মাদক না পেয়ে তারা সন্ধ্যার দিকে কাঁপতে শুরু করে। এ সময় বেশি করে পানি পান করানো হয় তাদের। এ কথার সত্যতা পাওয়া গেছে কলোনি ঘুরে। দেখা গেছে, মধ্যবয়সী কয়েকজন টেবিলে, মাটিতে বসে ঝিমাচ্ছে। একজন বাসিন্দা জানান,  এরাই প্রতি সন্ধ্যায় মাদক সেবন করত। মাদক না পেয়ে বর্তমানে এমন অবস্থা হয়েছে এদের।

জানতে চাইলে হাজারীবাগ থানার ওসি ইকরাম আলী মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদক কারবারিদের বিষয়ে আমরা খোঁজখবর রাখছি। গত সোমবার কলোনিতে মাদক বিক্রির চেষ্টা করছিল হাফিজ ও মনির নামের দুজন। পরে এলাকাবাসী সূত্রে খবরটি জানতে পেরে তাৎক্ষণিক ওই দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৭৪ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা অভিযান চালিয়েই শেষ করিনি। কলোনিতে বর্তমানে কী হচ্ছে গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে তার খোঁজখবর রাখছি।’

নামাপাড়া বস্তিতে মাদক বিক্রির চেষ্টা : রাজধানীর অন্যান্য এলাকার মতো গত ৩১ মে পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া, শ্যামপুর, নামাপাড়া বস্তিতেও অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে ২৮ মাদক কারবারিকে আটক করে পুলিশ। তবে এদের মধ্যে তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক কারবারি লেলিন বাবুসহ তার সহযোগীদের আটক করতে পারেনি পুলিশ। আটকদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল কিশোর।

গতকাল বুধবার সকালে বস্তিটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান সড়কের পাশে বস্তি লাগোয়া ফুটপাতে বসে তিন কিশোর সিগারেট টানছে। কী করছে জানতে চাইলে তারা জানায়, একসময় মাদক সেবন করত। পুলিশের অভিযানের পর থেকে মাদক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তারা বর্তমানে সিগারেট টানছে। বস্তির বাসিন্দা রিকশাচালক সবুর মিয়া জানান, পুলিশের অভিযানের পর এই বস্তিতে মাদক বিক্রি ও সেবন নেই বললেই চলে। তবে কয়েক দিন ধরে ফের মাদক বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘুণ্টিঘর এলাকার দুজন মাদক কারবারি মাদক নিয়ে বস্তিতে আসছে দুই দিন ধরে। আগে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করলেও বর্তমানে গোপনে সারছে তারা কাজটি।

জানতে চাইলে গেণ্ডারিয়া থানার ওসি মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযানের পর থেকে নামাপাড়া বস্তিতে আমরা সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছি। কাউকে মাদক কারবার বা সেবন করতে দেওয়া হবে না। বস্তিবাসীকে বলে রেখেছি, তাদের কাছে কোনো তথ্য থাকলে যেন আমাদের জানায়। তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব।’



মন্তব্য