kalerkantho

যেন সেই এসকোবার

নোমান মোহাম্মদ, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে   

২১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



যেন সেই এসকোবার

ফেলিপ আন্তোনিও সানরু

ভূত দেখার মতো চমকে না উঠে উপায় নেই!

ওই রকমই লম্বাটে চেহারা। পেটানো শরীর, দীর্ঘদেহী। মাথার ওপর থেকে দুই কাঁধের ওপর ছড়িয়ে পড়া ঝাঁকড়া চুলও অবিকল। মুখের কাঁচা-পাকা দাড়িটাই যা একটু অন্য রকম। তবু মিডিয়া সেন্টারের ভেতরে ভদ্রলোককে দেখে চমকে না ওঠার কারণ নেই। এ যে আন্দ্রেস এসকোবার!

১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় আততায়ীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান যে কলম্বিয়ান ডিফেন্ডার!

এসকোবারের জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে দুই যুগ আগে। তিনি এত দিন পর আসবেন কোত্থেকে! বিস্ময়ের ঘোর সামলে ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচিতি হতে গিয়ে শুনি, তিনিও কলম্বিয়ান। নাম ফেলিপ আন্তোনিও সানরু। ভ্যানগুয়ারদিয়া লিবারেল পত্রিকার হয়ে বিশ্বকাপ কাভার করতে এসেছেন। ১৯৮৩ সাল থেকে ক্রীড়া সাংবাদিকতা করেন। এসকোবারের সঙ্গে ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ পরিচয়। ওই ট্র্যাজিক হিরোর ছোট দুই ভাই হোসেয়ারি ও সান্টিয়াগোর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এখনো। ফুটবলের ওই করুণগাথার বর্ণনা তাঁর চেয়ে ভালো আর কে দিতে পারবেন!

১৯৯৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়া ছিল ‘ডার্ক হর্স’। কার্লোস ভালদেরামা, ফাউস্তিনো আসপ্রিয়া, ফ্রেদি রিংকনেদের দল বাছাই পর্বে আর্জেন্টিনার মতো দলকে হারায় ৫-০ গোলে। কিংবদন্তি পেলে তো তাঁদের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন পর্যন্ত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আসরে সেই দলটিই চরম ব্যর্থ। প্রথম দুই ম্যাচে রোমানিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হেরে বিদায় নেয় প্রথম রাউন্ডেই। স্বাগতিকদের বিপক্ষে পরাজয়ে আত্মঘাতী গোল করেছিলেন এসকোবার। এর মূল্য যে জীবন দিয়ে তাঁকে চুকাতে হবে, কে ভেবেছিলেন!

১৯৯৪ সালের ২ জুলাইয়ের সেই রাতটি সানরুর কাছে এখনো বেদনার বালুচর। স্মৃতিচারণার সময় বিষণ্নতা খেলে যায় এই সাংবাদিকের কণ্ঠে, ‘খবরটা আমি পেয়েছি মায়ের টেলিফোনে। আন্দ্রেস আর নেই। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না কিভাবে কী হলো। পরে শুনি মেদিলিনের এক ডিসকো বারে ও গিয়েছিল। সেখানে কয়েকজনের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। আন্দ্রেস তা পাশ কাটিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য চলে আসে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায়। কিন্তু ওই দলটি ওকে খুঁজে বের করে আবার কথা-কাটাকাটি করে; ছয়টি বুলেট ঢুকিয়ে দেয় শরীরে।’ বলতে বলতে নিজের শরীরটাই দেখাচ্ছিলেন তিনি। যেন গুলিগুলো তাঁর বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে গেছে।

কিন্তু এসকোবারের এই মৃত্যুর সঙ্গে বিশ্বকাপের আত্মঘাতী গোলের যোগসূত্র রয়েছে বলে সানরু বিশ্বাস করেন না। কলম্বিয়ান মাফিয়া গ্যাং জাতীয় দলের পক্ষে বাজি ধরে অনেক অর্থ খোয়ানোর শোধ তুলেছে এভাবে, সে প্রচারণাও উড়িয়ে দেন, ‘দুটি ঘটনা আলাদা। একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক নেই। আসলে ওই সময় কলম্বিয়ান সমাজ অনেক অস্থির ছিল। আর ফুটবল নিয়ে উন্মাদনাও বাড়াবাড়ি পর্যায়ের। কথা-কাটাকাটি থেকেই মাতালরা ওই কাণ্ড ঘটিয়েছে বলে আমি মনে করি।’ আততায়ীরা ছয়টি গুলির প্রতিটির পর ‘গোল’, ‘গোল’ বলে চিৎকার করছিলেন যে প্রচারণা, তাতেও আস্থা নেই তাঁর, ‘আমরা কেউ কখনো জানব না, সে রাতে ডিসকো বারে আসলে কী হয়েছিল। এটিই সত্যি; বাকি সব মিথ্যা।’

কিছুটা থামেন তিনি। দুই হাতের দুই ঘড়িতে সময় দেখেন। চোখ থেকে চিকন ফ্রেমের চশমা নামিয়ে কাচে মোছেন সানরু। এ বিষণ্ন বিলাপ বুঝি ভালো লাগে না সানরুর। কথা ঘুরিয়ে তাঁর সঙ্গে এসকোবারের চেহারার মিলের কথায় কিছুটা আলো খেলে ওই চেহারায়, ‘আন্দ্রেসের যখন ফুটবলার হিসেবে পরিচিত হলো, তখন লোকজন আমাকে রাস্তায়-পাবে দেখলে একই কথা বলত। এখনো বলে। আর জানেন, ওরও কিন্তু আমার মতো দাড়ি ছিল। সুইজারল্যান্ডের ইয়াং বয়েজে যেবার খেলতে গেল, তখন শেভ করে ফেলেছে।’

এসকোবার ছিলেন ডিফেন্ডার। কিন্তু মাঠের খেলায় ডাকাবুকো ব্যাপার ছিল না একেবারেই। খুব পরিচ্ছন্ন খেলা খেলতেন। যে কারণে কলম্বিয়ায় পরিচিত ছিলেন, ‘জেন্টলম্যান অব ফুটবল’ নামে। মাঠে ও মাঠের বাইরের সেই এসকোবারকে এখনো খুব মিস করেন সানরু, ‘এই এতগুলো বছর চলে গেল, আন্দ্রেসের মতো আরেক ভদ্রলোক কলম্বিয়ান ফুটবলে দেখলাম না। ওর দুই ভাই হোসিয়ারি ও সান্টিয়াগোর সঙ্গেও এ নিয়ে আমার কত কথা হয় এখনো! আর মাঠের খেলায়? আমি মনে করি, আমাদের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার আন্দ্রেস। ওর মতো আরেকজনকে এখনো পাইনি; কখনো পাব কিনা, তা-ও জানি না।’

দুঃস্বপ্নের ওই বিশ্বকাপ শেষে কলম্বিয়ার সব ফুটবলাররা ছিলেন একরকম আত্মগোপনে। ঘরের বাইরে বেরোতেন না, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতেন না। কিন্তু এভাবে পালিয়ে থাকতে চাননি এসকোবার। যুক্তরাষ্ট্রে আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাবেও সাড়া দেননি। ফিরে আসেন কলম্বিয়ায়। বোগোতার ‘এল তিয়েমপে’ সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছি বলে জীবন তো এখানেই শেষ নয়। এখন আমাদের সামনে দুটি উপায়। হয় এই ক্রোধ আমাদের পঙ্গু করে দেবে আর সহিসংতা চলতে থাকবে—সেটি মেনে নেওয়া। নয়তো এই দুঃস্বপ্ন পেছনে ফেলে সবাইকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করা। কী করব—সে সিদ্ধান্ত আমাদের। আমি চাই, আমরা যেন সবাই মিলে এ পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াই। কেননা জীবন এখানেই শেষ নয়।’

অথচ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় সত্যি সত্যিই ‘জীবন শেষ’ হয়ে গেল এসকোবারের! সে কথা মনে করে তাঁর দেশের এক সাংবাদিক বড় ক্যানভাসের ছবিটাও আঁকেন, ‘এখন আমরা আন্দ্রেসের কথার গুরুত্ব বুঝি। বুঝি যে, জীবনটা শুধু ফুটবল নয়; আরো বেশি কিছু। জীবন দিয়েই আন্দ্রেস সেটি আমাদের বুঝিয়ে গেছে।’

সানরুর কথার সঙ্গেই কিনা মেঘ সরিয়ে ঝিকমিকিয়ে হেসে উঠল সূর্য! ওই দূর আকাশের ওপার থেকে বোধকরি স্বদেশির কথায় সায় দিয়ে যান আন্দ্রেস এসকোবার!

 



মন্তব্য