kalerkantho


ইয়াবার আগ্রাসন রোধে আইনেই ফসকা গেরো

আশরাফ-উল-আলম   

২০ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ইয়াবার আগ্রাসন রোধে আইনেই ফসকা গেরো

মাদকদ্রব্য দখলে রাখার বিচার হয় ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে। সেই সময়ে মাদকের এত ভয়াবহ আগ্রাসন ছিল না। আশি ও নব্বইয়ের দশকে যেসব মাদকদ্রব্য উদ্ধার করত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেসব মাদকদ্রব্যের মধ্যে গাঁজা, আফিম, স্থানীয়ভাবে তৈরি বাংলা মদ ছিল বেশি। মাঝেমধ্যে কিছু বিয়ার ও বিদেশি মদ উদ্ধার হতো। হেরোইন, কোকেন, কোকা জাতীয় মাদক কালেভদ্রে উদ্ধার হতো। সেই সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনটি প্রণয়ন করা হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে ইয়াবার আগ্রাসন অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। দেশে যে পরিমাণ মাদকের মামলা হয় তার ৬০ শতাংশ ইয়াবা উদ্ধারের মামলা। কিন্তু ইয়াবা যত পরিমাণেই উদ্ধার হোক না কেন, সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারিত আছে ১৫ বছর কারাদণ্ড। আইনে ইয়াবা সম্পর্কিত কোনো মাদকের কথা উল্লেখ নেই। ইয়াবা এমফিটামিন জাতীয় রাসায়নিক দ্বারা তৈরি। এই এমফিটামিনের কথা আইনে উল্লেখ থাকায় ইয়াবাকে ওই শ্রেণির মাদকদ্রব্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোটি কোটি পিস ইয়াবা বা ইয়াবা তৈরির রাসায়নিক উদ্ধার হলেও সর্বোচ্চ শাস্তি ১৫ বছরের কারাদণ্ড। আইনে ইয়াবা পাচার বা ইয়াবা দখলে রাখার শাস্তির মাত্রা কম থাকায় তা দৃষ্টান্তমূলক হচ্ছে না বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এ কারণে ইয়াবার আগ্রাসন দিন দিন বাড়ছে। এ জন্য আইনের সংশোধন অতি জরুরি বলে তাঁদের মত।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মাদকের দখলদার ছাড়া অন্য কাউকে সাজা দেওয়ার সুযোগ নেই। এ কারণে মাদকদ্রব্য পাচারের সঙ্গে জড়িত রাঘব বোয়ালদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসনের অন্যতম কারণও এটি। এ কারণে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে নতুন করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন করার। ইতিমধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর খসড়াও করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ইতিমধ্যে গণমাধ্যমকে বলেছেন, মাদকের গডফাদারদের বিচারের আওতায় আনার জন্য নতুন আইন করা হচ্ছে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আইনটি যুগোপযোগী করা হচ্ছে। আগের আইনের বেশ কিছু ধারা নতুন করে করা হচ্ছে। সাজার মেয়াদও বাড়ানো হবে।’

বর্তমান প্রচলিত আইনের ১৯ ধারার বিভিন্ন উপধারায় মাদকদ্রব্য দখলে রাখার বিচার করা হয়। চার ধরনের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। ১৯-এর ১ ধারায় হেরোইন, কোকেন ও কোকা থেকে উদ্ভূত মাদকদ্রব্য দখলে রাখার শাস্তির বিধান উল্লেখ রয়েছে। (ক) উপধারায় কেউ এ ধরনের মাদকদ্রব্য ২৫ গ্রামের নিচে দখলে রাখলে বা কারবার করলে তার জন্য দুই থেকে ১০ বছর পর্যন্ত শাস্তি; এর বেশি রাখলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের মাদক রাখার দায়ে কারো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে—এমন নজির বাংলাদেশে নেই। নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন এমন নজির তিনটির মতো রয়েছে। কিন্তু উচ্চ আদালত একটি মামলায় পাকিস্তানের দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। বাকি দুটি এখনো ঝুলে রয়েছে।

আইনের ১৯-এর ২ ধারায় শাস্তির বর্ণনা রয়েছে প্যাথিডিন, মরফিন ও টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল দখলে রাখার শাস্তির। এসব মাদকদ্রব্যের ১০ গ্রাম পর্যন্ত দখলে রাখার শাস্তি দুই থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড। এর বেশি দখলে রাখার অপরাধে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। অপিয়াম, ক্যানাবিস বেসিন বা অপিয়াম থেকে উদ্ভূত মাদকদ্রব্য দখলে রাখার শাস্তিরও উল্লেখ আছে এ ধারায়। এসব মাদক দুই কেজির বেশি পরিমাণ দখলে রাখার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন। আর মেথাডন জাতীয় মাদকদ্রব্য ৫০ গ্রামের বেশি পরিমাণ দখলে রাখার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

ভয়ংকর মাদক রাখার দায়ে কাউকে সর্বোচ্চ সাজা না দেওয়ার কারণ হিসেবে আইনজীবীরা কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এসব মাদক কারবারের আড়ালে যেসব গডফাদার রয়েছে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে। যারা মাদকসহ ধরা পড়ে তাদের রক্ষায় ওই গডফাদাররা কলকাঠি নাড়ে। বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও প্রভাবিত করা হয়। সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আদালতে যেতে দেওয়া হয় না। সাক্ষীর অভাবে মামলা প্রমাণিত হয় না।

নতুন আইনের বিস্তারিত এখনো জানা যায়নি। তবে আগের অনেক মামলার রায় পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মাদক কারবারিদের সঙ্গে পুলিশের সখ্য থাকার কারণে অনেক সময়ই মামলা দায়ের ও তদন্তে গাফিলতি থাকে। এ কারণেও মাদক কারবারিরা খালাস পায়। কাজেই নতুন আইনে তদন্তে গাফিলতির ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তার শাস্তির বিধান রাখা হলে মাদক কারবার কমে আসবে।

আইনজীবীরা বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো মাদকদ্রব্য বা অন্য কিছু জব্দ করতে হলে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিদের সাক্ষী করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বড় ধরনের মাদক কারবারিদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সখ্য থাকায় স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিদের সাক্ষী না করে তাদের সোর্স হিসেবে যারা কাজ করে তাদের সাক্ষী করা হয়। অনেক সময় পথচারীদেরও সাক্ষী করা হয়। তারা আর পরে সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হয় না। শেষ পর্যন্ত আসামিরা খালাস পেয়ে যায়।

ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. বোরহান উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসামিরা মামলা থেকে রেহাই পেতে আইনি দুর্বলতা খুঁজে বের করবেই। তবে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের ক্ষেত্রে মামলা দায়েরে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা হলে ভয়ানক আসামিদের শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ইয়াবা এখন বড় ধরনের সমস্যা। অথচ কোটি কোটি টাকার ইয়াবা চালান ধরা পড়লেও সর্বোচ্চ শাস্তি ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড। ইয়াবা দখলে রাখার শাস্তির মাত্রা বাড়াতে হবে। এর বিকল্প নেই।

১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(৯)-এর ৯(ক) ধারায় বলা হয়েছে, ফেনসাইক্লিন, মেথাকোয়ালন এলএসডি, বারবিরেটস, এমফিটামিন অথবা এগুলোর যেকোনোটি দ্বারা তৈরি মাদকদ্রব্য কারো কাছে পাঁচ গ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেলে সর্বনিম্ন ছয় মাস ও সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। ১৯(১)-এর ৯(খ) ধারায় বলা হয়েছে, পাঁচ গ্রামের বেশি পরিমাণ পাওয়া গেলে সর্বনিম্ন পাঁচ বছর ও সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া যাবে।

ইয়াবা এমফিটামিনের মিশ্রণে তৈরি বিধায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১)-এর ৯(ক) ও ৯(খ) ধারার অধীনে বিচার্য। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যত পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হোক না কেন এর সর্বোচ্চ শাস্তি ১৫ বছরের কারাদণ্ড।

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের সাবেক পিপি এহসানুল হক সমাজী বলেন, এক লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার হলেও যে শাস্তি, এক কোটি বা তারও বেশি পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায়ও সেই শাস্তির বিধান করা হয়েছে। এটা বৈষম্যমূলক। আইন স্পষ্ট নয়। কাজেই আইন সংশোধন জরুরি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারুক আহমেদ বলেন, ২৫ গ্রামের ওপরে হেরোইন পাচার বা দখলে রাখার সর্বোচ্চ শাস্তি যেখানে মৃত্যুদণ্ড, সেখানে কোটি কোটি ইয়াবা বড়ি বহন, চোরাচালান বা দখলে রাখার শাস্তি সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড, এই ফারাকের কারণেই দেশে ইয়াবার জাল বিস্তার হয়েছে। তিনি বলেন, হেরোইনের চেয়ে এখন ইয়াবা চোরাচালানের দিকে বেশি ঝুঁকছে মাদক কারবারিরা। ক্রস ফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়তো সাময়িকভাবে ইয়াবা কারবার কমাবে; কিন্তু যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া ইয়াবা রোধ সম্ভব নয়। তাই ইয়াবা দখলে রাখা, চোরচালানের সঙ্গে জড়িতদেরও মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হলে এটির বিস্তার রোধ হবে। সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ইয়াবার আগ্রাসন রোধ করার জন্য শাস্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে। এর বিকল্প নেই।’

 



মন্তব্য