kalerkantho


ব্লগার শাহজাহান হত্যা

জঙ্গিদের হুমকির কথা বাচ্চু জানিয়েছিলেন

নতুন করে জঙ্গি হামলার শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



জঙ্গিদের হুমকির কথা বাচ্চু জানিয়েছিলেন

মুক্তমনা ব্লগার, প্রকাশক ও সাবেক সিপিবি নেতা শাহজাহান বাচ্চুকে ১০-১২ দিন আগে ফেসবুকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল উগ্রপন্থীরা। এ হুমকির আগে মুন্সীগঞ্জে সিরাজদিখানের পূর্ব কাকালদী গ্রামের বাড়িতে তিনি আলাদা ঘরে ঘুমাতেন। হুমকির পর থেকে ভয়ে দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে এক ঘরে ঘুমাতে শুরু করেন। সম্প্রতি তিনি বাসা থেকে বের হওয়াও কমিয়ে দিয়েছিলেন। লেখক ও ব্লগারদের মধ্যে ৮৪ জনকে নাস্তিক শনাক্ত করে একটি তালিকা তৈরি করে উগ্রপন্থীরা। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি, বর্তমানে আনসার আল ইসলাম) জঙ্গিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা সেই তালিকার ১১ নম্বরে ছিল বাচ্চুর নাম। তিন বছর আগে মোবাইল ফোনেও বাচ্চুকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এর পর থেকে তিনি গ্রামের বাড়িতে বসবাস করছিলেন। নিহত বাচ্চুর পরিবার, ঢাকার কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিসি) ইউনিট ও স্থানীয় পুলিশের একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হত্যার আলামত ও আগের সূত্র থেকে ধারণা করা হচ্ছে, জঙ্গিরাই বাচ্চুকে হত্যা করেছে। বাচ্চু দুই বিয়ে করায় দুই পক্ষের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ আছে। এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে জঙ্গিদের ব্যাপারে বেশি সন্দেহ করা হলেও কোন জঙ্গি সংগঠন এই খুন করেছে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। মুক্তমনা লেখক, ব্লগারদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে ঘাড়ে ও মাথায় আঘাত করে হত্যা করে আনসার আল ইসলামের (আগের এবিটি) জঙ্গিরা। তারা আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমা বহন করলেও খুন করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে। এর আগে ১০টি হত্যাকাণ্ডে একই চিত্র দেখা গেছে। ২০১৪-১৫ সালে পুরনো জেএমবির একটি অংশ পীর, মাজারের খাদেমসহ ভিন্ন মতাদর্শীদের গলা কেটে হত্যা শুরু করেছিল। তবে নব্য জেএমবির জঙ্গিরা শিয়া সম্প্রদায়, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও বিদেশিদের টার্গেট করে হামলা চালায়। তারা গ্রেনেডসহ আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করে। একা নিভৃত পল্লীতে বাচ্চুকে পেয়েও খুনিরা ধারালো অস্ত্রের বদলে গুলি করেছে। এদিকে হত্যার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশের একজন এএসআই চলে আসেন, যাঁকে গুলি করার কথা বলেও হামলা না করে চলে যায় খুনিরা। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত এই খুনের দায় স্বীকার করেনি কেউ। এ কারণে হত্যাকাণ্ডটি নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। তবে নতুন করে জঙ্গি হামলার শঙ্কা খতিয়ে দেখছে সিটিটিসি।

অন্যদিকে বাচ্চু খুনের ঘটনায় গতকাল সিরাজদিখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় চারজনকে আসামি করে মামলা করেছেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী আফসানা জাহান। মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে গতকাল ময়নাতদন্ত শেষে হাসপাতালটির আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) শাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, নিহতের বুকে গুলির সদৃশ ক্ষত পাওয়া গেছে। এই হত্যার প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে মুন্সীগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এর আগে সোমবার রাতে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। গতকাল দুপুরে সেখানে যান অতিরিক্ত ডিআইজি আসাদুজ্জামান আসাদ। পরে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বেশ কয়টি দিক নিয়ে তদন্ত শুরু করেছি। খুঁটিনাটি কোনো কিছু বাদ দিচ্ছি না। তিনি ব্লগার ছিলেন, তাই এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এটি জঙ্গিদের কাজ হতে পারে। আবার পারিবারিক বিষয়ও দেখা হচ্ছে। তবে স্থানীয়ভাবে তাঁর কোনো বিরোধের তথ্য এখনো মেলেনি।’

সোমবার রাতেই সিটিটিসির একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করে। ছায়া তদন্ত শুরু করেছে জঙ্গি নিয়ে কাজ করা এ বিশেষ ইউনিট। সিটিটিসির উপকমিশনার (ডিসি) মুহিবুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আলামত দেখে জঙ্গি হামলা বলেই মনে হচ্ছে। এ কারণে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। তবে কারা বা কোন গোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জঙ্গিরা আবার নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে কি না সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পলাতক থাকা জঙ্গি এবং গ্রেপ্তারকৃতদের সূত্রে আমরা এগোনোর চেষ্টা করছি।’

সিটিটিসি সূত্র জানায়, গত ৩ মার্চ সিলেটের শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী যুবক এনামুলের কোনো সাংগঠনিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি। তবে বাচ্চুকে হত্যার সময় দুই মোটরসাইকেলে চারজন ছিল। তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। এ কারণে হামলাটি সংঘটিত ও পরিকল্পিত বলে নিশ্চিত তদন্তকারীরা। আনসার আল ইসলামের জঙ্গিদের হামলায় সর্বশেষ নিহত হন উন্নয়নকর্মী জুলহাজ মান্নান ও তাঁর বন্ধু তনয়। রাজধানীর কলাবাগানের ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল ওই জোড়া খুনে হত্যাকারী দলে কমপক্ষে পাঁচজন ছিল। আগ্নেয়াস্ত্র থাকলেও তারা চাপাতি দিয়ে খুন করে। বাচ্চুকে গুলি করে হত্যার ঘটনাটি আনসার আল ইসলাম নাকি অন্য কোনো গোষ্ঠী ঘটিয়েছে তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

বাচ্চুর দ্বিতীয় স্ত্রী আফসানা জাহান বলেন, ‘গত ১০-১২ দিন আগে তিনি জানিয়েছিলেন তাঁকে ফেসবুকে হুমকি দিচ্ছে জঙ্গিরা। তিনি তাঁর জীবন নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন। তবে কারা হুমকি দিচ্ছে সেটা বলেননি।’

বাচ্চুর মেয়ে আঁচল বলেন, ‘তিন-চার বছর আগে জঙ্গিদের হিটলিস্টে বাবার নাম ১১ নম্বরে ছিল। তখনো বাবাকে ফোনে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এরপর বাবা গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। মাঝে আর কোনো সমস্যা ছিল না। কয়েক দিন হলো আবার হুমকি পেয়েছেন। বাবা উত্তরের ঘরে একা থাকতেন। কিন্তু হুমকি পেয়ে কিছুদিন ধরে তিনি আমাদের সঙ্গে থাকতেন।’

নিহত বাচ্চুর স্ত্রী আফসানা জাহান জানান, ইফতারের কিছু সময় আগে তাঁর (বাচ্চুর) বন্ধু আনোয়ারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। বাচ্চু পরে আনোয়ারের ওষুধের দোকানে চলে যান। সেখানে কিছু সময় কথা বলার পর বাচ্চু বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে বের হলে আগে থেকে ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। পুলিশ আনোয়ার হোসেন আনুকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

মুন্সীগঞ্জ র‌্যাব-১১ ক্যাম্প কমান্ডার নাহিদ হাসান জনি জানান, তাঁরা ঘটনাটি খতিয়ে দেখছেন। ঘটনাস্থল থেকে যে পথ দিয়ে খুনিরা পালিয়ে গেছে সে পথ ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলে একটি রাস্তা চলে গেছে সিরাজদিখান সদরের দিকে, অন্যটি মুন্সীগঞ্জের দিকে। তবে সিরাজদিখানের রাস্তায় ব্রিটিশ আমেরিকা টোব্যাকোর একটি অফিসের সিসি ক্যামেরার ধারণকৃত দৃশ্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে খুনিরা ওই পথ দিয়ে যায়নি। তবে অন্য পথেও একটি সিসি ক্যামেরা থাকলেও তা সচল ছিল না। 

গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল কাকালদী গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে উত্সুক মানুষের ভিড়। স্থানীয়রা জানায়, ব্যক্তিগত জীবনে বাচ্চুর সঙ্গে কারো বিরোধের কথা কেউ শোনেনি। তিনি বিনয়ী স্বভাবের অত্যন্ত সজ্জন মানুষ ছিলেন।



মন্তব্য