kalerkantho


বিশুদ্ধ ইফতারি

বেলের শরবতের জুড়ি মেলা ভার

নওশাদ জামিল   

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বেলের শরবতের জুড়ি মেলা ভার

গাছে বেল পাকিলে কাকের কী? সত্যিই তো তাই। কাক যতই ঠোকর মারুক, বেলের শক্ত খোসা তার পক্ষে ভাঙা সম্ভব নয়। বাগধারাটি নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়। বেল পাকলে কাকের কিছু যায় আসে না, কিন্তু মানুষ পাকা বেল খেতে পছন্দ করে। পুষ্টিগুণে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এই ফল। অনেকে তাই বলে ‘শ্রীফল’। ফলটি দেখতে ততটা সুশ্রী নয়, কিন্তু নানা উপকারের গুণেই তার দারুণ কদর। পবিত্র রমজান মাসে চলছে নিদারুণ খরতাপ। এই গরমে তৃষ্ণা মেটাতে ইফতারে এক গ্লাস বেলের শরবতের জুড়ি মেলা ভার। গরমে তৃষ্ণা মেটানোই নয়, অনেকে বেলের পুষ্টিগুণের জন্যই পান করে বেলের শরবত।  

পুষ্টিবিদদের মতে, সারা দিন রোজা রাখার পর শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। শরীরে পানিশূন্যতা পূরণে পান করা যেতে পারে বেলের শরবত। নিমিষেই তা শক্তি দেবে। শরীরকে করবে তরতাজা। তাই ইফতারে শরীর ঠাণ্ডা রাখতে ও শরীরের পুষ্টি জোগাতে বেলের শরবত পান করার পরামর্শ দেন তাঁরা। বেলের শরবত নিমেষেই প্রাণ জুড়ায়। পাশাপাশি বেলের গুণও রয়েছে অনেক। এতে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাসিয়াম। মোটামুটি সারা দেশেই জন্মে বেলগাছ। তেমন যত্ন-আত্তি ছাড়াই বেড়ে ওঠে বেলগাছ। গ্রামে-মফস্বলে বসতবাড়ির ধারে দেখা মেলে এ গাছের। বেল এ অঞ্চলেরই ফল। ভারতবর্ষ ছাড়াও থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার নানা দেশে বেলগাছ দেখা যায়। বাংলাদেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, দিনাজপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা ইত্যাদি জেলায় ভালো জাতের বেল জন্ম হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে বেলগাছ ও ফল অত্যন্ত পবিত্র। বেলের পাতা পূর্জা-অর্চনায় ব্যবহৃত হয়। এ জন্য তারা বেলগাছের কাঠও লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করে না। 

কাঁচা বেলের রং সবুজ, পাকলে হলদে হয়। বেলের শক্ত আবরণের ভেতরে শাঁসের রং কমলা বা হলুদ। বেল পাকলে শক্ত আবরণ ভেদ করেও ছড়িয়ে পড়ে সুগন্ধ। পাকা ফল মিষ্টি ও সুস্বাদু। সাধারণত ফাগুন-চৈত্র মাসে বেলগাছের পাতা ঝরে যায়। বৈশাখ মাসে গাছে আসে নতুন পাতা ও ফুল। এ সময়ই পাকে বেল। পাকা ফলের ভেতর থাকে বীজ। সেগুলো জড়িয়ে থাকে আঠার সঙ্গে। কিন্তু তা সহজেই ছড়ানো যায়।

রন্ধনশিল্পী ফাতেমা আবেদীন নাজলা বলেন, ‘ঝটপট বানানো যায় পাকা বেলের শরবত। মাঝারি আকারের একটি পাকা বেল দিয়ে চার গ্লাস শরবত বানানো যায়। পাকা বেল ভেঙে, বিচি ছাড়িয়ে আঁশ সংগ্রহ করতে হবে। পাকা বেলের বীজ বেছে ফেলতে হবে। বীজসহ ব্লেন্ড করলে শরবত তিতা হয়ে যেতে পারে। সামান্য চিনি ও ঠাণ্ডা পানি অথবা বরফকুচি দিয়ে একসঙ্গে ব্লেন্ড করলেই বেলের শরবত হয়ে যাবে। বাসায়  ব্লেন্ডার মেশিন না থাকলেও সমস্যা নেই। কেননা পাকা বেলের আঁশ বেশ নরম ও মোলায়েম। সহজেই তা পানির সঙ্গে মিশে যায়। বেলের শরবতের সঙ্গে বাড়তি স্বাদের জন্য মেশানো যেতে পারে দই কিংবা চিনি।’

একটি বেসরকারি হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ আনোয়ার ভূঁইয়া বলেন, ‘বেলের শরবত পেটের নানা অসুখ সারাতে বেশ কার্যকর। দীর্ঘমেয়াদি আমাশয় ও ডায়রিয়া থাকলে কাঁচা বেল উপকারী। পাকা বেলও খাওয়া যেতে পারে। বেলের শাঁস পিচ্ছিল, তাই পাকস্থলীর জন্য তা উপকারী। বেলের শরবত যেমন কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, তেমনই হজমে সহযোগিতা করে।’ তিনি আরো বলেন, বেলে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। ভিটামিন সি গ্রীষ্মকালীন বহু রোগবালাই দূর করে। এ ছাড়া বেলের শরবত পান করলে কোলন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। এ ছাড়া বেলের ভিটামিন এ চোখের নানা সমস্যা দূর করে।

বাজারে খুঁজলেই পাকা ফল পাওয়া যায়। তবে এখন দাম বেশ চড়া। কারওয়ান বাজারের মসজিদ মার্কেটে খুচরা ও পাইকারি বেল বিক্রেতা আবদুল মিয়া জানান, আকারভেদে বেলের দামে তারতম্য রয়েছে। মাঝারি আকারের প্রতিটি পাকা বেলের দাম ৫০ থেকে ৭০ টাকা। একটু ছোট আকারের প্রতিটি পাকা বেলের দাম ৩০ থেকে ৫০ টাকা। আর বড় আকারে পাকা বেলের দাম ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা।

রাজধানীর প্রায় প্রতিটি জুসবারে বিক্রি হয় পাকা বেলের শরবত। মগবাজারের আলিম জুসবারের কর্ণধার আজিম উদ্দিন বলেন, বেলের শরবতের বেশ চাহিদা রয়েছে। ইফতারের আগে অনেকেই বেলের শরবত কেনেন। পাকা বেলও কেনেন। প্রতি গ্লাস বেলের শরবতের দাম ৪০ টাকা।



মন্তব্য