kalerkantho


টঙ্গীর বস্তিতে মাদক কারবার

শীর্ষ ১৫ কারবারি লাপাত্তা!

শরীফ আহেমদ শামীম, গাজীপুর   

২৭ মে, ২০১৮ ০০:০০



শীর্ষ ১৫ কারবারি লাপাত্তা!

মাদকবিরোধী অভিযানে গাজীপুরের টঙ্গীর শীর্ষ কারবারি বাচ্চু খান র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর গা ঢাকা দিয়েছে কমপক্ষে আরো ১৫ জন। গত বুধবার থেকে তাদের আর প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। এমনকি তাদের দেড় শতাধিক সহযোগীও আত্মগোপনে চলে গেছে। তবে টঙ্গীর চারটি বস্তিতে মাদকদ্রব্য বেচাকেনা বন্ধ হয়নি। স্থানীয় এলাকাবাসী, বস্তির লোকজন, মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, স্বপন, সুজন, রোকন শিকদারসহ ওই ১৫ জন শীর্ষ মাদক কারবারি গা ঢাকা দেওয়ার পর বস্তিগুলোতে মাদকের সঙ্গে যুক্ত লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কারণ এত দিন তারা নানা মহলে মাসোয়ারা দিয়ে নির্বিঘ্নে মাদক কারবার করে আসছিল। মাদকবিরোধী অভিযানে বাচ্চু এভাবে মারা পড়বেন বা অন্যদের গা ঢাকা দিতে হবে—ভাবেনি তারা।

গত বৃহস্পতিবার মাদকের বড় আখড়া হিসেবে কুখ্যাত টঙ্গীর ভরান হাজির মাজার, ব্যাংকের মাঠ, কেরানির টেক ও এরশাদনগর—এই চারটি বস্তি ঘুরেছেন এ প্রতিবেদক। বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টঙ্গীর সবচেয়ে বড় মাদকের আখড়া ভরান হাজির মাজার বস্তি। এ বস্তির মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ ছিল বাচ্চু খানের হাতে। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার বাইলকা গ্রামের মৃত আশরাফ খানের ছেলে বাচ্চু ২৭-২৮ বছর আগে শিশু বয়সে মায়ের হাত ধরে এ বস্তিতে আসেন। নদীভাঙনে তাঁরা ঘরবাড়ি হারিয়েছিলেন। কিশোর বয়সেই স্থানীয় বিএনপির এক নেতার হাত ধরে মাদক কারবারে জড়ান বাচ্চু। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির ওই নেতা মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ

হারান। তখন বাচ্চু হয়ে ওঠেন শীর্ষ কারবারি। প্রতিদিন গড়ে কথিত ডিলার ও পাইকারের মাধ্যমে তার পাঁচ কোটি টাকারও বেশি মাদক বিক্রি হতো। গত মঙ্গলবার ভোরে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন তিনি। এরপর তাঁর সহযোগী চক্রের দ্বিতীয় প্রধান স্বপন মিয়া (৩০) বস্তির মাদক বেচাকেনার নিয়ন্ত্রণ নেন। আব্বাস উদ্দিনের ছেলে স্বপনের বাড়িও ঝিনাইগাতীতেই।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বাচ্চু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পেছনে মাসে ব্যয় করতেন পাঁচ-ছয় কোটি টাকা। টাকার জন্য তাঁর কাছে আসতেন অনেকে। তাই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বাচ্চু নিহত হবেন, তা টঙ্গীর মাদক কারবারিদের কাছে ছিল রীতিমতো অবিশ্বাস্য। গত বুধবার তাঁর নিহত হওয়ার খবর জানার পরপরই বদলে যেতে থাকে টঙ্গীর মাদক বস্তিগুলোর চিত্র। সহযোগীদের নিয়ে গা ঢাকা দেয় শীর্ষ মাদক কারবারিরা। গ্রেপ্তার না করে তাদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। তবে পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

টঙ্গীর মাদক কারবারিদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ও দুর্ধর্ষ সুজন (৩৫)। তাঁর নিয়ন্ত্রণে টঙ্গীর কেরানির টেক ও মরকুন এলাকার মাদক বেচাকেনা। মাদক ছাড়াও তাঁর রয়েছে অস্ত্র কারবার। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র ও হত্যার ১৩-১৪টি মামলা রয়েছে। গত ১৫ দিনে গাজীপুর ও ঢাকার পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তাঁকে দুই দফা আটক করলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয় বলে জানা গেছে।

বস্তির বাসিন্দারা জানায়, সুজন প্রধানত ফেনসিডিল কারবার করেন। তবে ইয়াবা ও গাঁজার কারবারও রয়েছে তাঁর। দৈনিক গড়ে ৫০ লাখ টাকার মাদক বেচাকেনা হয় হয় তাঁর আখড়ায়। তাঁর অধীনে রয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ জন খুচরা কারবারি। স্থানীয় এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এ কারবার চালিয়ে আসছেন সুজন। তবে বাচ্চু খান নিহত হওয়ার পর তাঁকে আর বস্তিতে দেখা যায়নি।

হাজির মাজার বস্তির আরেক শীর্ষ মাদক কারবারি রোকন শিকদার (৩৮)। মৃত তোতা শিকদারের ছেলে রোকনের নামে মাদক মামলা রয়েছে ১৯টি।

বস্তির বাসিন্দারা জানায়, ওই বস্তিতে তিন শতাধিক ঘর রয়েছে। বাচ্চুর সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে বস্তিটির প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করতেন রোকন। এত দিন প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা করলেও গত বুধবার থেকে উধাও তিনি। ঘরে তাঁর স্ত্রী-সন্তানদেরও পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, টঙ্গীর বস্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং মাদকের সবচেয়ে আখড়া হাজির মাজার বস্তি। টঙ্গী, গাজীপুর, রাজধানীর উত্তরা ও তুরাগ এলাকার মাদক সরবরাহ হয় এই বস্তি থেকে। তুরাগ নদ ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই বস্তিতে গড়ে প্রতিদিন ৫০ হাজারের বেশি ইয়াবা, তিন কেজি হেরোইন ও কয়েক মণ গাঁজা পাইকারি ও খুচরা বিক্রি হয়। বস্তি হলেও ভেতরে রয়েছে সাজানো-গোছানো ঘর। রয়েছে আয়েশের সব ব্যবস্থা। প্রতিটি ঘরেই মাদক বিক্রি, সেবন, জুয়া, এমনকি নারীসঙ্গ পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য বস্তির চারপাশে রয়েছে কঠোর নজরদারি। বকশিশ পাওয়ায় পুলিশ কখনোই এ বস্তিতে হানা দেয় না। এ কারণে রাজধানী ও এর আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মাদকসেবীদের জন্য নিরাপদ এই মাজার বস্তি। প্রায় একই চিত্র ব্যাংকের মাঠ, কেরানির টেক ও এরশাদনগর বস্তির।

বাচ্চু নিহত হওয়ার ঘটনা কিংবা শীর্ষ মাদক কারবারিদের গা ঢাকা দেওয়ার পরও বন্ধ হয়নি মাদকদ্রব্য বিক্রি। আগে প্রকাশ্যে বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে খুব গোপনে, যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে বা মোবাইল ফোনে।

নিহত বাচ্চুর সহযোগী ইসমাইল জানান, মাজার বস্তি থেকে প্রতি মাসে থানা ও জেলা পুলিশ, ডিবি ও রাজনৈতিক নেতারা বাচ্চুর মাধ্যমে পাঁচ-ছয় কোটি টাকা নিতেন। তাঁরাও নিরাপদে ব্যবসা করতেন। এখন কী হবে বুঝতে পারছেন না। এর ওপর রয়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ আতঙ্ক। যাঁরা বাচ্চুর কাছ থেকে প্রতিদিন টাকা নিতেন তাঁরাও হতাশ বলে দাবি করেন ইসমাইল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টঙ্গী থানার পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, এ থানার পুলিশের আয়ের একটি বড় অংশ আসত মাদক কারবারিদের কাছ থেকে। মাদকবিরোধী অভিযানে বাচ্চু নিহত হওয়ার পর সব মাদক কারবারি পালিয়ে গেছে। থানায়ও আগের মতো মাদক কারবারি ও সোর্সের জটলা নেই। কয়েকজন শীর্ষ মাদক কারবারিকে ধরতে অভিযানও চালানো হয়েছে। কিন্তু তাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি বলে দাবি ওই পুলিশ কর্মকর্তার।

টঙ্গী থানার ওসি কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি নতুন যোগ দিয়েছেন। তাই টাকা নেওয়ার বিষয়ে কিছুই জানেন না। রোকন, সুজন, স্বপন ছাড়াও ব্যাংকের মাঠ বস্তির রিপন ওরফে রনি, নাজমা, ময়না, তানিয়া, বেলতলার রাসেল, এরশাদনগরের খলিল, টিঅ্যান্ডটির অপুসহ অনেক মাদক কারবারিকে পুলিশ খুঁজছে। তারা গা ঢাকা দিয়েছে। তাদের ধরতে অভিযান চলবে।

গাজীপুর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি আমির হোসেন বলেন, টঙ্গীতে বস্তিকেন্দ্রিক খুচরা মাদক কারবারির সংখ্যা দেড় শতাধিক। প্রতি মাসেই ৩০ থেকে ৩৫ জন গ্রেপ্তার হচ্ছে। আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে তারা আবার মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। ডিবির এই কর্মকর্তা দাবি করেন, অনেক সময় ধরা পড়ার পর মাদক কারবারিরা পুলিশের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অভিযোগ তোলে। শীর্ষ মাদক কারবারি রোকন, সুজন, স্বপন, রিপন, দুরানী, দুলালসহ অন্যদের ধরতে ডিবির বেশ কয়েকটি টিম অভিযান চালাচ্ছে।



মন্তব্য