kalerkantho


আওয়ামী লীগ বিএনপিতে সম্ভাব্য প্রার্থীর ছড়াছড়ি, চাপমুক্ত জাপা

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

২৫ মে, ২০১৮ ০০:০০



আওয়ামী লীগ বিএনপিতে সম্ভাব্য প্রার্থীর ছড়াছড়ি, চাপমুক্ত জাপা

হাওরাঞ্চলের বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে হবিগঞ্জ-২ সংসদীয় এলাকা। দশটি সংসদ নির্বাচনের ফল বলছে, আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। এখানে দুবার করে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি জয়লাভ করেছে। আগামী নির্বাচন ঘিরে এই তিনটি দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা এর মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দখলে থাকা আসনটির বর্তমান সংসদ সদস্য দলের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ খান। নবম সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। অর্থাৎ দুই মেয়াদে জনপ্রতিনিধি হয়ে তিনি এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছেন, যা তাঁকে সামনের নির্বাচনে দলের টিকিট পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রাখছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে চান—এমন আরো কয়েকজন মাঠে কাজ করছেন।

বিএনপির মনোনয়ন লড়াইয়ে আছেন দলীয় দুই কেন্দ্রীয় নেতা। কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবনকে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন কেন্দ্রীয় সদস্য ও সৌদি আরব বিএনপির সভাপতি আহমদ আলী মুকিব আব্দুল্লাহ।

অন্যদিকে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে জাতীয় পার্টি। কারণ দলের একক প্রার্থী হিসেবে জেলা শাখার সদস্যসচিব শংকর পাল কাজ করছেন।

আওয়ামী লীগ : দলটির নেতাকর্মীরা বলছে, সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে বিগত কয়েকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে আসছেন। পর পর দুবার নির্বাচিত হয়েছেন আব্দুল মজিদ খান। আবার নির্বাচন করার জন্য তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরে জনগণের কাছে ভোট চাওয়া শুরু করেছেন। প্রায় প্রতিদিনই তিনি নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড উদ্বোধন এবং দলীয় কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক তজম্মুল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, সংসদ সদস্য আব্দুল মজিদ হাওর এলাকার জন্য আলাদা কিছু প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে ২১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জের শরীফ উদ্দিন সড়ক, ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে বানিয়াচং থেকে শিবপাশা সড়ক, ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ সড়ক বাস্তবায়ন করায় এখন আর বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ অবহেলিত নেই। তাই মজিদ খানকে মনোনয়ন দিলে তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন বলে মনে করেন বানিয়াচং উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তজম্মুল হক।

তবে দলের আরো অন্তত সাতজন নেতা নৌকা প্রতীকে একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান। তাঁরা হলেন বানিয়াচং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমীর হোসেন (মাস্টার), জেলা কৃষক লীগের সভাপতি হুমায়ুন কবীর রেজা, দলের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক ছাদিকুর রহমান চৌধুরী পরাগ, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের শিশু ও পরিবার কল্যাণ সম্পাদক মাহফুজা বেগম সাঈদা, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সদস্য চৌধুরী আবু বকর সিদ্দিকী, ব্রিটেনপ্রবাসী ব্যারিস্টার এনামুল হক, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক আইন সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শরীফ উদ্দিনের ছেলে ময়েজ উদ্দিন শরীফ রুয়েল।

এলাকায় সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মুক্তিযোদ্ধা আমীর হোসেনসহ এই সাত নেতা মনোনয়ন পাওয়ার জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠায় দলে এক ধরনের বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে। আলোচনায় এসেছে সরকারি দলের নেতাকর্মী হিসেবে পাওয়া-না পাওয়া, প্রাপ্তি আর বঞ্চনার নানা কথা। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোতে কারো কারো মধ্যে ক্ষোভ আছে।

সংসদ সদস্য আব্দুল মজিদ খান বলেন, ‘মনোনয়ন চাওয়ার অধিকার আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীরই আছে। তবে দেখতে হবে কে এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছেন। আমি বিগত দুই বারের নির্বাচিত এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জের মতো অবহেলিত জনপদকে একটি উন্নত জনপদে রূপান্তরিত করেছি। যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিদ্যুতায়নে যে উন্নয়ন করেছি তা বিগত ৪০ বছরেও কেউ করতে পারেনি।’

জনগণ নিশ্চয়ই তাঁর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করবে বলে মনে করেন সংসদ সদস্য। দলে বিভক্তির বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে এমনটা হয়েই থাকে। তবে হাতে গোনা কয়েকজন নেতাকর্মী ছাড়া তৃণমূলের সবাই আমার সঙ্গে রয়েছে। নেত্রী এবং দলও আমাকে মনোনয়ন দিবে বলে আশা করি। আমি মনোনয়ন পেলে নেতাকর্মীরা একজোট হয়ে কাজ করবে। এর আগেও নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে থেকে কাজ করেছে।’

১৯৬৮ সালে ছাত্রলীগে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করেছেন জানিয়ে আমীর হোসেন বলেন, তিনি দলকে সংগঠিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও তাঁর সঙ্গে আছে। তাই এবার তিনি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

রাজনীতির নানা বাঁক-মোড়ে কারাবরণসহ নানা ত্যাগ স্বীকারের কথা তুলে ধরে আমীর হোসেন বলেন, ‘শেখ হাসিন বলেছেন ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করবেন। তাই আমি আশাবাদী। তৃণমূলের নেতারা আমাকে প্রার্থী ঘোষণার পর মাঠে কাজ করে যাচ্ছি।’

জেলা কৃষক লীগ সভাপতি হুমায়ুন কবীর রেজাও বলেছেন তিনি ছাত্রলীগ, যুবলীগ করে এসে জেলা কৃষক লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা হয়েছেন। একই সঙ্গে দলের জেলা শাখার কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যের দায়িত্ব পালন করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকেই অন্য দল থেকে এসে আওয়ামী লীগ নেতা হয়ে সর্বোচ্চ সুবিধা নিচ্ছেন। আমার নির্বাচনী এলাকার প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে কৃষক লীগের শক্তিশালী কমিটি রয়েছে। নেতাকর্মীদের নিয়ে আমি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে ইনশাআল্লাহ আমি বিজয়ী হব।’

মাহফুজা বেগম সাঈদা দীর্ঘদিন যাবৎ এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ’৭৯ সালে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত হন। এর পর প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকেছেন। আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল তখন আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থাকার পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদের মামলা পরিচালনা করেছেন। শেখ হাসিনা যখন জেলে ছিলেন তখন তিনি মামলা পরিচালনা করেছেন। এর আগে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আইনজীবী দলেও তিনি ছিলেন।

বন্যা ও ঈদে দুস্থদের সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়ে মাহফুজা বেগম বলেন, তিনি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করেন। তাই নারীদের বেশিসংখ্যক আসনে দলের মনোনয়ন দেওয়ার যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন সেটাও তাঁকে আশাবাদী করে তুলেছে।

জাতীয় পার্টি : আওয়ামী লীগের সনাতন ধর্মালম্বীদের ভোটব্যাংকে এবার ভাগ বসিয়ে চমক দেখানোর প্রত্যাশা করছেন জেলা জাতীয় পার্টির সদস্যসচিব ব্যবসায়ী শংকর পাল। তিনি ২০০১ সালে জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচন করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট পান। দশম সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। এরপর থেকে জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী হিসেবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন শংকর পাল। তাঁর দাবি, গত নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখলের মাধ্যমে তাঁকে পরাজিত করা হয়েছে।

ব্যক্তি উদ্যোগে এলাকার মন্দির, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কবরস্থান ও শ্মশানের জন্য কোটি টাকার ওপরে অনুদান দিয়েছেন জানিয়ে শংকর পাল বলেন, আগামী নির্বাচনে জয়লাভের ব্যাপারে আশাবাদী তিনি।

বিএনপি : বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রচার চালিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। ত্রাণ বিতরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন। আগামীতে তাঁর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করছে। এ আসনটিতে সৌদি আরব বিএনপির সভাপতি ও দলের কেন্দ্রীয় সদস্য আহমদ আলী মুকিব আব্দুল্লাহও শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রার্থী। তাঁর পক্ষে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর অনুসারীরা। তিনি শুধু সৌদি আরবেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও দলকে সংগঠিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় এই আসনে তিনি মনোনয়ন লড়াইয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করছে তাঁর সমর্থকরা।

ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে দল নির্বাচনে যাবে কি না তা এখনো ঠিক হয়নি। বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে একটি সাজানো মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আমরা এখন নেত্রীর মুক্তির জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। নেত্রীর মুক্তির পর দল এবং জোটের সিদ্ধান্ত নিয়েই আমরা আগামী নির্বাচনে যেতে চাই। নির্বাচনে দল যাঁকে মনোনয়ন দিবে আমরা তাঁর পক্ষেই কাজ করে বিজয় ছিনিয়ে আনব।’

সৌদি আরব বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান মনে করছেন ডা. জীবনই বিএনপির মনোনয়ন পাবেন।

অন্যান্য : খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আব্দুল বাছিত আজাদ বলেন, যদি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয় তাহলে আমি নির্বাচন করব। আমার দল আমাকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে।’

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রার্থী আবদুর রব ইউসুফী বলেন, ‘নির্বাচনে সমান সুযোগ বলে একটা কথা আছে। সেটা নিশ্চিত না হলে নির্বাচন স্বীকৃতি পায় না। আমরা আগামী নির্বাচনে যেতে চাই, জনগণের সমর্থন নিয়ে জিততে চাই, ক্ষমতায় যেতে চাই, অপরাজনীতির অবসান চাই।’

হবিগঞ্জ-২ আসনে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান তরুণ সমাজকর্মী ও সংগঠক সাংবাদিক আফসার আহমেদ রূপক। তিনি ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোট পেয়েছিলেন।

আফসার আহমেদ রূপক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি এলাকায় মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। ঢাকা এসে আমার নির্বাচনী এলাকার কোনো লোক সমস্যায় পড়লে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি। বিশেষ করে আমার এলাকার মানুষ চিকিত্সাসেবা যাতে পায় সে ব্যাপারে সহযোগিতা করছি। আমার সমর্থনে ইতিমধ্যে ‘রূপক হেল্প ক্লাব’ করা হয়েছে। এ ক্লাবের মাধ্যমে এলাকার মানুষের চিকিত্সাসেবা দেওয়া হচ্ছে।’

 



মন্তব্য