kalerkantho


ঘুমাতে যাওয়ার কথা বলে চিরঘুমে মুক্তামণি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও সাতক্ষীরা প্রতিনিধি   

২৪ মে, ২০১৮ ০০:০০



ঘুমাতে যাওয়ার কথা বলে চিরঘুমে মুক্তামণি

জন্মের দেড় বছরের মাথায় বাসা বেঁধেছিল যে রোগ তা ১৩ বছরে গিয়ে শেষই করে দিল মুক্তামণিকে। রক্তনালির টিউমারে আক্রান্ত সাতক্ষীরার সেই মুক্তামণির হাতে কয়েক দফা অস্ত্রোপচার করা হলেও বাঁচানো গেল না তাকে। গতকাল বুধবার সকাল ৮টার দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কামারবায়সা গ্রামে নিজেদের বাড়িতেই মারা যায় বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুটি।

মুক্তামণির পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে চিৎকার করতে থাকে মুক্তামণি। তখন বাড়ির সবাই ছুটে আসে তার কাছে। পরে পানি খাওয়ার কথা বলে মাকে এক গ্লাস পানি আনতে বলে। পানি নিয়ে আসার পর বাবার হাতে গ্লাসটি দিয়ে সবাইকে ঘর থেকে বাইরে যেতে বলে মুক্তামণি।

মুক্তামণির বাবা মুদি দোকানি ইব্রাহিম হোসেন কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, তিনি মেয়ের পাশে থাকা অবস্থায় মুক্তামণি বলে, ‘আমার ঘুম পাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠে পানি খাব। তোমরা তোমাদের কাজে যাও।’ এরপর সে ঘুমিয়ে পড়ে। সেই ঘুমেই মুক্তামণি চিরঘুমে চলে যায় বলে জানান তার বাবা।

আর মুক্তামণির মা আসমা খাতুন আহাজারি করে বলছিলেন, ‘ওরে মুক্তা, শেষবারের মতো সবাইকে দেখে গেলি। যাওয়ার আগে এক ফোঁটা পানি না খেয়ে গেলি কেন?’

আদরের সন্তানকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন আসমা খাতুন। মায়ের আহাজারিতে উপস্থিত অন্যদের চোখও ভিজে ওঠে।

মুক্তামণির চাচি খাদিজা খাতুন স্বজনদের বলছিলেন, ঢাকা থেকে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে মুক্তামণি তাঁকে বলেছিল, ‘আমার ভাগ্য ভালো চাচি। আমার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানতে পেরেছেন। না হলে হয়তো এত দিনে মরেই যেতাম।’ ভালো হয়ে মুক্তামণি আবারও স্কুলে যেতে চেয়েছিল বলে জানান খাদিজা খাতুন।

মুক্তামণির মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক জানিয়ে শিশুটির চিকিৎসক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক ইউনিটের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. সামন্তলাল সেনের কাছে ফোন করে খোঁজখবর নিয়েছেন। ডা. সামন্তলাল সেন কালের কণ্ঠকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

এ ছাড়া মুক্তামণির মৃত্যু মেনে নিতে কষ্ট হওয়ার কথা জানিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় ডা. সামন্তলাল সেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘জীবনে বহু রোগীকে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছি, আবার বহু রোগীর মৃত্যুও দেখেছি। কিন্তু মুক্তামণির মৃত্যু আমার জন্য হার্টব্রেকিং খবর। ছোট্ট এ শিশুর ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।’

মুক্তামণির মৃত্যুর খবর পেয়ে শেষবারের মতো দেখতে তাদের বাড়িতে ছুটে যান উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান বাবু, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. শওকত হোসেন, সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার মো. সাজ্জাদুর রহমান, জেলা প্রশাসকের পক্ষে সাবেক সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ আব্দুল সাদী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাজান আলী, উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক মনিরুল ইসলাম মাসুম, ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এস এম মোশাররফ হোসেনসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামজিক নেতা।

মুক্তামণির বয়স যখন দেড় বছর তখন ডান হাতে একটি মার্বেলের মতো গোটা দেখা দেয়। সেটি পরে বড় আকার ধারণ করে। কয়েক বছর আগে থেকে তার আক্রান্ত ডান হাতে গুটির মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং পচন ধরতে শুরু করে। ২০১৭ সালের জুলাই মাসের প্রথম দিকে গণমাধ্যমে মুক্তামণির রোগের কথা প্রকাশিত হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মুক্তামণিকে ওই বছরের ১১ জুলাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানে ডা. সামন্তলাল সেনের তত্ত্বাবধানে তাঁর হাতে অস্ত্রোপচার করা হয়। টানা ছয় মাসের চিকিৎসায় খানিকটা উন্নতি হওয়ায় ২০১৭ সালের ২২ ডিসেম্বর মুক্তামণিকে এক মাসের ছুটিতে বাড়ি পাঠানো হয়। তবে ওই সময় চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন যে মুক্তামণি কোনো দিন পুরোপুরি সেরে উঠতে পারবে না।

বাড়িতে আসার পর কয়েকটা দিন ভালো থাকলেও পরে মুক্তামণির অবস্থা ধীরে ধীরে অবনতির দিকে যেতে থাকে। তার দেহে নতুন করে পচন ধরে। প্রতিদিন একবার ড্রেসিং করা হতো।

মুক্তার বাবা ইব্রাহিম হোসেন জানান, হাতের কয়েকটি স্থানে গর্তের মতো হয়ে সেখান থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। অস্ত্রোপচার করে হাতে যে চামড়া লাগানো হয়েছিল সেগুলো পচে গিয়ে এমন অবস্থা হয়েছিল।

ডা. সামন্তলাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মুক্তামণির বাড়িতে নিয়মিত চিকিৎসক পাঠানো হতো। চিকিৎসার খোঁজ নিতে গত মঙ্গলবারও সাতক্ষীরা থেকে একজন চিকিৎসক পাঠানো হয়েছিল। তার বাবাকে বলা হয়েছিল আবার ঢাকা আনতে, না হলে অন্তত সাতক্ষীরা হাসপাতালে ভর্তি করতে। কিন্তু তার বাবা রাজি হননি। বরং মুক্তামণির বাবা বলেছিলেন, ‘স্যার, অনেক তো চেষ্টা করেছেন। ভাগ্য খারাপ, ভালো হয় নাই। এখন মেয়েটা অনেক কষ্ট পাইতাছে। আর টানাহেঁচড়া করতে চাই না। আল্লাহর হাতে ছাইড়া দিছি। মরলে বাড়িতেই মরুক।’

গতকাল জোহরের নামাজের পর বাড়িতেই মুক্তামণির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাকে তার দাদার কবরের পাশে দাফন করা হয়।

 



মন্তব্য