kalerkantho


প্রার্থীর চাপ আ. লীগে, বিএনপিতে এগিয়ে সুজাত, জাপায় মুনিম

শাহ ফখরুজ্জামান, হবিগঞ্জ   

২৪ মে, ২০১৮ ০০:০০



প্রার্থীর চাপ আ. লীগে, বিএনপিতে এগিয়ে সুজাত, জাপায় মুনিম

নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলা নিয়ে যে সংসদীয় আসন সেটা হবিগঞ্জ-১। প্রবাসী অধ্যুষিত হিসেবে পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ আসনটিকে ঘিরে আলোচনাও থাকে সর্বত্র। প্রবাসে রাজনীতি করেও জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন অনেকেই।

বর্তমান সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মুনিম চৌধুরীও (বাবু) ব্রিটেনপ্রবাসী। তিনি জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। এর আগে ২০১১ সালে উপনির্বাচনে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়াও ব্রিটেনপ্রবাসী। ১৯৯১ সালে বিএনপির টিকিটে নির্বাচন করা ফারুক বখত চৌধুরী ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। আগামী নির্বাচনেও বিভিন্ন দলের মনোনয়নপ্রার্থী এবং স্বতন্ত্র হিসেবে প্রার্থী হতে আগ্রহী বেশ কয়েকজন প্রবাসী আলোচনায় রয়েছেন।

এই আসনে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য সক্রিয়। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া ও জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুল মুনিমের দলীয় মনোনয়ন অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

উল্লেখ্য, হবিগঞ্জ-১ আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে এখানে শক্ত অবস্থান আছে জাতীয় পার্টির। ১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টির খলিলুর রহমান রফি আওয়ামী লীগের দেওয়ান ফরিদ গাজীকে পরাজিত করেন। ১৯৯৬ সালের (১২ জুন) নির্বাচনে দেওয়ান ফরিদ গাজী বিজয়ী হলেও খলিলুর রহমান রফি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলেন। এর পর খলিলুর রহমান রফি বিএনপিতে যোগদান করলে জাতীয় পার্টির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন জাতীয় পার্টির হাল ধরেন ব্রিটেনপ্রবাসী দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুনিম চৌধুরী।

জাতীয় পার্টি : হবিগঞ্জ-১ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়ে আছেন ব্রিটেনপ্রবাসী আরো তিন নেতা। তাঁরা হলেন কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হামিদ, আশরাফ উদ্দিন ও জাতীয় ছাত্রসমাজের সাবেক নেতা আব্দুল মোস্তাকিম।

দশম সংসদ নির্বাচনে মুনিম চৌধুরী নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালান। পাশাপাশি দলকে সুসংগঠিত করার কাজে মনোনিবেশ করেন।

জাতীয় পার্টি নবীগঞ্জ পৌর শাখার সাধারণ সম্পাদক মুরাদ  আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, আগামী নির্বাচনে যাঁরাই মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন না কেন মুনিম চৌধুরী বাবুই হবেন দলের প্রার্থী। তাঁর নেতৃত্বে হবিগঞ্জ-১ আসনে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। দলও অনেক সুসংগঠিত হয়েছে।

সংসদ সদস্য মুনিম চৌধুরী বলেন, হবিগঞ্জ-১ নির্বাচনী এলাকাটি সব সময় অবহেলিত ছিল। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নকাজ করেছেন। তিনি দুটি স্কুল-কলেজকে সরকারি করেছেন, ৫০টি রাস্তা ও ৩৮টি ব্রিজ নির্মাণ করেছেন। নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়ন হওয়ার পথে। স্বাধীনতার পর এত উন্নয়ন কোনো সংসদ সদস্য করতে পারেননি দাবি করে তিনি বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকেন তিনি। এককভাবেই হোক আর জোটগতভাবেই হোক, আগামী নির্বাচনে তাঁর মনোনয়ন চূড়ান্ত—এমন আভাসই  পেয়েছেন তিনি। মনোনয়ন পেলে তিনি আবারও নির্বাচিত হবেন এই আত্মবিশ্বাসও তাঁর আছে।

একাধিক নেতার মনোনয়ন লড়াইয়ে শামিল হওয়ার বিষয়ে মুনিম চৌধুরী বলেন, যেহেতু এই আসনে জাতীয় পার্টির অবস্থান সুসংহত তাই মনোনয়নের জন্য এখানে প্রতিযোগিতা থাকাটাই স্বাভাবিক।

আওয়ামী লীগ : ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়ান ফরিদ গাজী নির্বাচিত হন। তিনি মন্ত্রীও ছিলেন। ২০১০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ সংকটে পড়ে যায়। ২০১১ সালের উপনির্বাচনে সামান্য ভোটে দলের প্রার্থী ও বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরীর পরাজয়ে পিছিয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে পারস্পরিক অনাস্থা ও নানা টানাপড়েন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিয়েছিল জাতীয় পার্টিকে। আগামী নির্বাচনেও যদি আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে আওয়ামী লীগে অসন্তোষ ও হতাশা  দেখা দেবে বলে মনে করছে দলের নেতাকর্মীরা।

নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল জাহান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, আগামী নির্বাচনে যদি দলীয় প্রার্থী না দিয়ে জোটকে এই আসন ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে এখানে আওয়ামী লীগ আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ করে আসা আওয়ামী লীগের কোনো কর্মীবান্ধব নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া বাঞ্ছনীয় হবে বলে তিনি মনে করেন। আর যদি ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ কোনো নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাহলে দলের নেতাকর্মীরা তাঁর পক্ষে কাজ করবে না। যে নেতা সুখে-দুঃখে নেতাকর্মীদের পাশে থাকেন তাঁকেই মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

আওয়ামী লীগ থেকে এ আসনে নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় রয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর মেয়ে হবিগঞ্জ-সিলেট সংরক্ষিত আসনের বর্তমান নারী সংসদ সদস্য বেগম আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী প্রয়াত দেওয়ান ফরিদ গাজীর ছেলে শাহ নেওয়াজ মিলাদ গাজী, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলমগীর চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য আব্দুল মুকিত চৌধুরী।

এ বিষয়ে সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী তিনি এলাকার সাধারণ মানুষের কল্যাণে দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। যদিও এখানকার সংসদ সদস্য সরকারি দলের নয়, তার পরও যাতে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে মানুষ বঞ্চিত না হয় তার জন্য এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট নির্মাণ, অবহেলিত গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুতায়ন, চা শ্রমিকসহ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন তিনি। তিনি আরো বলেন, এই আসনটি পুনরুদ্ধার করার জন্য তিনি মানুষের কাছাকাছি থেকে রাজনীতি করছেন। এই পরিশ্রম ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা মূল্যায়ন করে যদি তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাহলে তিনি জয়ী হতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই তিনি দল ও এলাকার সঙ্গে সম্পৃক্ত। হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলকে জেলায় সুসংগঠিত করেছেন। ছয় বছর ধরে জেলা পরিষদ প্রশাসক ও চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকাসহ সমগ্র হবিগঞ্জে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। তাই মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। হবিগঞ্জ-১ আসনটি পুনরুদ্ধারের জন্য দলের প্রধান শেখ হাসিনা তাঁকে মনোনয়ন দিবেন বলে প্রত্যাশা তাঁর।

শাহ নেওয়াজ মিলাদ গাজী বলেন, গত নির্বাচনে দল ও ‘মহাজোট’ থেকে তাঁর মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু দেশ, জাতি ও ‘মহাজোটের’ বৃহত্তর স্বার্থে তিনি দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানানোতে এবার তাঁর মূল্যায়ন হবে বলে তিনি আশাবাদী।

আলমগীর চৌধুরী বলেন, ৩৮ বছর ধরে তিনি দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ছাত্রজীবন থেকে দলের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নতুন প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে তিনি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করে নবীগঞ্জে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনাসহ দলকে সুসংগঠিত করতে কাজ করছেন। আর এভাবেই এখানে যে আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্য নেই—সেটি বুঝতেই দিচ্ছেন না তিনি। দলের নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার পুরস্কার হিসেবে তাঁকে মনোনয়ন দিলে তিনি আসনটি পুনরুদ্ধার করতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আব্দুল মুকিত চৌধুরী বলেন, তিনি দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের যেহেতু আওয়ামী লীগ বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয় তাই তিনি মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী।

বিএনপি : আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপির প্রার্থী মনোনয়ন ঝামেলামুক্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও দলের জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শেখ সুজাতই হয়তো পাবেন ধানের শীষের টিকিট। ২০১১ সালের আলোচিত উপনির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে চমক দেখান। সিলেট বিভাগে বিএনপির একমাত্র সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি।

১৯৯১ সালে বিএনপির প্রার্থী ফারুক বখত চৌধুরী হবিগঞ্জ-১ আসনে জামানত হারানোর পর তিনি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে দলকে সুসংগঠিক করেন। তবে বছরের অধিকাংশ সময় বিদেশে অবস্থান করায় এবং বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের চাপা ক্ষোভও রয়েছে। এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী আরেক প্রবাসী শাহ মোজাম্মেল হক নান্টু।

নবীগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি ও পৌরসভার মেয়র ছাবির আহমদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা জনগণের ভোটের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীর বিজয় সুনিশ্চিত। তিনি প্রায় নিশ্চিত যে দলের প্রার্থী হবেন শেখ সুজাত মিয়া।

অন্যান্য : এ আসনে জামায়াতে ইসলামী বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নির্বাচনকেন্দ্রিক তৎপরতা তেমনভাবে চোখে পড়ে না। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক খেলাফত মজলিস এ আসনে জোটের মনোনয়নপ্রত্যাশী। দলটির জেলা সহসাধারণ সম্পাদক আবদুল কাইয়ুম জাকী বলেন, বাহুবল-নবীগঞ্জে তাঁদের দলীয় অবস্থান দেশের অনেক এলাকার তুলনায় মজবুত। এখানে তাঁদের একটি ভোট ব্যাংক আছে। ২০১১ সালের উপনির্বাচনসহ বিভিন্ন সময় নির্বাচনে অংশ নিয়ে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছেন তাঁরা। এ আসন থেকে তিনি তাঁর দলের ও জোটের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তবে জোটের যেকোনো সিদ্ধান্তই মেনে নেবেন তাঁরা।

এ ছাড়া এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন ব্রিটেনপ্রবাসী কমিউনিটি নেতা শেখ মহিউদ্দিন আহমেদ। ইতিমধ্যে তিনি এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন ও সমাজসেবামূলক কাজে জড়িয়ে পড়েছেন।

 



মন্তব্য