kalerkantho


ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদন

রোহিঙ্গা নিপীড়নের তথ্য সংগ্রহে ত্রুটি আছে, বিচার কঠিন হবে

বাংলাদেশের সেনা ও পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ ১০ সুপারিশ

মেহেদী হাসান   

২২ মে, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা নিপীড়নের তথ্য সংগ্রহে ত্রুটি আছে, বিচার কঠিন হবে

ফাইল ছবি

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিপীড়নের তথ্য সংগ্রহের কাঠামো আন্তর্জাতিক মান পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যের বেসামরিক বিশেষজ্ঞরা। রোহিঙ্গাদের যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার তথ্য অনুসন্ধানে ব্রিটিশ সরকারের একটি প্রতিনিধিদল গত বছরের ১৪ থেকে ২১ নভেম্বর কক্সবাজার সফর করে। সফরে প্রাপ্ত তথ্য অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে গতকাল সোমবার তারা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে নিপীড়নের তথ্য সংগ্রহের কাঠামোতে ত্রুটি থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমস্যা শুধু যৌন সহিংসতার তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ার কাঠামোতেই নয়; রোহিঙ্গারা যখন নিপীড়নের বর্ণনা দিচ্ছে তখন তাদের যথাযথ মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা দেওয়ার কাঠামোও নিশ্চিত করা হয়নি। এটি সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্যই কেবল ক্ষতিকর নয়, সন্দেহভাজন দোষীদের বিচারেও বাধা হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যৌন সহিংসতার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও তদন্তে বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সংস্থাগুলোর উদ্দেশ্য যথার্থ হলেও প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতা আছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, একই ব্যক্তির সাক্ষাত্কার একাধিক বার নেওয়া হচ্ছে না—এমনটি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। রোহিঙ্গাদের ভাষা জানেন এমন অনুবাদকদের সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনজীবী ও তদন্তকারীদের পরামর্শ ছাড়াই নিপীড়িতদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অথচ জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারও রোহিঙ্গা নিপীড়নকে আক্ষরিক অর্থেই জাতিগত নিধন হিসেবে অভিহিত করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারে যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা কলঙ্ক ও লজ্জা বয়ে বেড়াচ্ছে। তারা এখনো মানবপাচার, যৌন সহিংসতা, গৃহ নির্যাতন ও ধর্ষণের ঝুঁকিতে আছে। কয়েক দশকের পুরনো একটি সংকটকে স্বল্পমেয়াদি হিসেবে দেখা যাবে না। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সমস্যার সমাধান না হলে এ সংকটের অবসান হবে না।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিলেও তাদের ‘শরণার্থী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। প্রত্যাবাসন চুক্তি সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের শিগগিরই স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তন হবে—এমনটি খুব লোকই মনে করে।

এরই আলোকে ব্রিটিশ এই বেসামরিক বিশেষজ্ঞরা মানবিক তৎপরতা এবং যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার তদন্ত ও তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের ১০ দফা সুপারিশ করেছেন। এগুলোর প্রথমেই আছে, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক উদ্যোগ বৃদ্ধি। দ্বিতীয় সুপারিশে যৌন সহিংসতা মোকাবেলায় অংশীদার নিয়ে যুক্তরাজ্যকে আরো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। তৃতীয় সুপারিশে যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা এবং চতুর্থ সুপারিশে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কাজে দোভাষীদের যুক্ত করা এবং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

রোহিঙ্গা শিবিরে আলোর ব্যবস্থা করতে ব্রিটিশ সরকারকে তহবিল দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে পঞ্চম সুপারিশে। ষষ্ঠ দফায় যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতায় কাজ করা আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাগুলোকে অর্থায়ন করতে ব্রিটিশ সরকারকে সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সপ্তম দফায় বাংলাদেশের পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, বিশেষ করে মানবপাচার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে ব্রিটিশ সরকারকে সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশের মধ্যে আরো আছে রোহিঙ্গাদের আইনি সেবা দিতে কারিগরি কমিটি গঠন, তথ্য সংগ্রহকারীদের প্রশিক্ষণ এবং দশম ও শেষ দফায় জবাবদিহির উদ্যোগে নারীদের জোরালো কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ।

 

 



মন্তব্য