kalerkantho


রমজানেও প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা

নেপথ্যে ইশতিয়াকসহ অনেকে

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২১ মে, ২০১৮ ০০:০০



রমজানেও প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করলেন, ‘মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প এখনো মাদকমুক্ত করা যায়নি।’ একই তথ্য দিয়ে র‌্যাব-২-এর একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেককে গ্রেপ্তার করার পরও ক্যাম্পে মাদক কারবারিদের কার্যক্রম চলার তথ্য আছে; অভিযান চালানো হবে। কালের কণ্ঠ’র সরেজমিন অনুসন্ধানেও দেখা যায়, যেন ক্যাম্প নয়, এ মাদকের হাট। ‘বাবা আছে, লাগব নাকি, ছোট বড় যেটাই নেন আমগো কাছে আছে।’ এই প্রতিবেদককে ক্যাম্পে দেখে কয়েক কিশোর এভাবেই বাবা তথা ইয়াবার টোপ দেয়। ক্যাম্পের বয়স্ক ব্যক্তিরা বলছেন, এত দিন মাদক কারবারিরা রাতে কিছুটা গোপনে মাদক বিক্রি করত। রমজানের শুরুতে তারা বিকেল ৫টা থেকেই এই ভয়াবহ কারবার করছে অনেকটা প্রকাশ্যে। দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের মধ্যে বেপরোয়া এ ক্যাম্পের অপরাধীরা।

ক্যাম্পের বয়স্ক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আটকে পড়া পাকিস্তানিদের সংখ্যা এই ক্যাম্পে হবে প্রায় ৪৫ হাজার। এদের বেশির ভাগই শান্তিপ্রিয় ও ধর্মভীরু। কিন্তু কিছু মাদক কারবারি আর জামায়াত-শিবিরের অনেক অনুসারী এখানকার পরিবেশ নষ্ট করছে। ক্যাম্পে কেন প্রতিবাদ হয় না জানতে চাইলে মুরব্বিরা বলেন, প্রতিবাদ করলেই নিশ্চিত মৃত্যু! গত কয়েক বছরে শুধু মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে ২১ জন খুন হয়েছে। প্রায়ই পুলিশ ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে মাদকসেবীদের গ্রেপ্তার করে। কিন্তু পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেনেভা ক্যাম্পসহ মোহাম্মদপুর এলাকার মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে ইশতিয়াক নামে এক শীর্ষ মাদক কারবারি। তার অধীনে রয়েছে শতাধিক মাদক কারবারি। তাদের তালিকা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও দিয়েছে, স্থানীয় থানায় রয়েছে। তবে এর পরও তাদের গ্রেপ্তার না করাকে রহস্যজনক মনে করে ক্যাম্পের বাসিন্দারা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. সামছুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প এখনো মাদকমুক্ত করা যায়নি। তবে মাদক কারবারিদের একটি তালিকা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেই তালিকা ধরে শিগগিরই যৌথ বাহিনী ক্যাম্পে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছে। ক্যাম্পের মাদক কারবারিদের মধ্যে শীর্ষে ইসতিয়াক—এই তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, এরা ক্যাম্পসহ আশপাশের এলাকায়ও ইয়াবাসহ মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে।

র‌্যাব-২-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহমুদ উর রশিদ বলেন, জেনেভা ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে এর আগে অনেক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এর পরও ক্যাম্পে মাদক কারবারিদের কার্যক্রম আছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। শিগগিরই বড় ধরনের অভিযান চালানো হবে সেখানে। র‌্যাব-২ কর্মকর্তা মাহমুদ উর রশিদ জানান, গতকাল রবিবারও মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে মঞ্জু ও সাগর নামে দুই খুচরা মাদক বিক্রেতাকে ২০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, জেনেভা ক্যাম্পে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। অনেক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মাদক সমাজে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ক্যাম্প ঘুরে জানা যায়, ‘ইয়াবা ইশতিয়াক’ ওরফে ‘ন্যাটা ইশতিয়াক’ এর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে তানভীর, আরশাদ, নাদিম, সেলিম, মনির, আরিফ, মুন্না, সীমা, বিল্লাল, রাজা, আরমান,  রাকিব, মুক্তার, জাকির, গুড্ডু, চুন্না কসাই ও সোলেমান রয়েছে ক্যাম্পে। এরা প্রত্যেকেই বড় মাপের মাদক কারবারি। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের প্রশ্রয়ে থাকার ফলেই এদের ধরা হচ্ছে না বলে মনে করেন ক্যাম্পের বাসিন্দারা। ইশতিয়াক সম্পর্কে জানা গেছে, সে শুধু ইয়াবা কারবার করেই এখন কোটিপতি। জেনেভা ক্যাম্প ছাড়াও ঢাকার আশপাশেও তার একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। এর আগে তার সাভারের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা জানতে পারেন সে আশুলিয়া আছে। সেখানে অভিযান চালিয়েও তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে জানা যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, রমজান মাসে জেনেভা ক্যাম্প ঘিরে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ব্যস্ত ধর্মকর্ম নিয়ে। নামাজের সময় হলে কেউ মসজিদে দৌড়াচ্ছে, ব্যবসায়িরা দোকানে। এর মধ্যে কিছু চোখ ক্যাম্পের মধ্যে ঘুরে ঘুরে মাদক ক্রেতা খুঁজছে। আচরণে তারা অন্যদের থেকে আলাদা। তাদের পাহারা দিচ্ছে আলাদা একটি গ্রুপ। তারা বয়সে যুবক। এই গ্রুপের কেউ কেউ মূলত আইন-শৃঙ্খরা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ করে। পোশাক বা সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা ক্যাম্পে প্রবেশ করলেই তারা মোবাইল ফোনে মাদক কারবারিদের সতর্ক করে দেয় বলে ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানায়। পুলিশ চক্কর দিয়ে চলে গেলেই তারা একই কাজ করে। ক্যাম্পের বাসিন্দারা ক্ষোভের সঙ্গে বলে, এই মাদক কারবারিরাই থানা পুলিশের চোখে পলাতক।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরই কেউ কেউ মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তাদের প্রশ্রয় দেয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্যাম্পের আন্তত ৩০ জন অভিযোগ করে। সোলাইমান নামে একজন বলেন, আমরা তো এখানে নিরীহ। ওরা (মাদক কারবারিরা) প্রভাব খাটায়। অন্য একজন বলেন, ‘একটি গোষ্ঠী চাচ্ছে না এই ক্যাম্প মাদকমুক্ত হোক।’ প্রভাবশালীদের নাম জানতে চাইলে একজন বলেন, ‘কার কার নাম বলব। অনেক বড় বড় লোক আছে। তাদের নাম বলেছি বলে আপনি যদি পত্রিকায় আমার নাম প্রকাশ করে দেন তাহলে ওরা আমার বাসায় ঢুকে মারধর করবে। মেরেও ফেলতে পারে।’ ক্যাম্পের লোকজন  মাদকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করলে তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্কুল-কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ইয়াবা কিনছে ক্যাম্পে। একজন ব্যবসায়ী এই প্রতিবেদককে বলেন, “বড় ছোট সব ধরনের ‘বোবা’ আছে। অরেঞ্জ কালার (বেগুনি), সাদা, কমলা—যেইডা চান দিতে পারুম।” আছে নারী মাদক বিক্রেতারাও। জানা যায়, ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত দামে একটি ইয়াবা বড়ি বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতা বুঝে তারা ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়ও ইয়াবা বিক্রি করে।


মন্তব্য