kalerkantho


বুয়েটে গোলটেবিল আলোচনা

ঢাকায় যানজটে দিনে নষ্ট ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ মে, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকায় যানজটে দিনে নষ্ট ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা

ফাইল ছবি

রাজধানী ঢাকায় যানজটে প্রতিদিন গড়ে নষ্ট হচ্ছে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা। এর ফলে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

যানজটে অতিব্যস্ত সময়ে ঘণ্টায় গাড়ির গতিবেগ নেমে এসেছে পাঁচ কিলোমিটারে। হেঁটে চলার গড় গতিও পাঁচ কিলোমিটার। এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে ৬০ শতাংশ যানজট কমানো সম্ভব হবে। তাতে সাশ্রয় হবে ২২ হাজার কোটি টাকা। গতকাল শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেছেন। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে রাখারও আহ্বান জানান তাঁরা। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। আলোচনায় ১৬টি রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও মাত্র আটটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কোনো প্রতিনিধি এতে অংশ নেননি। 

এই গোলটেবিল আলোচনার বিষয় ছিল ‘গণপরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও যানজট নিরসনের পরিকল্পনা রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তি ও বাস্তবায়নে অঙ্গীকার’। এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট ও সড়ক নিরাপত্তা ফাউন্ডেশন।

যানজটে মানব চরিত্রের ৯টি দিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মেজাজ খিটখিটে হচ্ছে, কর্মক্ষমতা কমছে বলে তথ্য তুলে ধরেন আলোচকরা। পরিবহন খাতে ভর্তুকি দেওয়ার পরামর্শ দেন তাঁরা। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ডিটিসিএ, সিসিএস, রাজউক, আরএইডি, এলজিইডি, বিআরটিএর মতো সংস্থাগুলোকে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণের পরামর্শ দেন তাঁরা।

এই গোলটেবিলে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন।  মূল প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “সড়কে এত মৃত্যুর মিছিল, বাসের চাপায় মানুষ মারা যাচ্ছে, অথচ সরকারের নেতারা বলছেন ‘আমরা কি বাস চালাই? সড়কে উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে, সরকার এমন দাবি কিভাবে করে? সড়কে মানুষের মৃত্যুর দায় সরকারকেই নিতে হবে। সরকারদলীয় নেতারা হৃদয়হীন আচরণ করছেন, হাত চলে যাচ্ছে যাত্রীর। অথচ বলা হচ্ছে হাত বের করে রাখলে যাবেই তো! আমি বলব, এখন একটা সোশ্যাল মুভমেন্ট দরকার। এতে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্তি দরকার।” গোলটেবিল আলোচনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিনিধিদের আসা উচিত ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সড়কে নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত ও বাস্তবায়ন করা দরকার।

গোলটেবিল আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সভাপতি এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ।

আলোচনায় আরো অংশগ্রহণ করেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুব্রত চৌধুরী, জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য নাদের চৌধুরী, ঐক্য ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ তারেক, বিকল্পধারার সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক।

কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘বড় দুটি দল আসেনি। আজকে যারা বড় আছে, কালকে তারা না-ও থাকতে পারে। তারা আসেনি বলে এমনটি ভাবার কারণ নেই সড়কে মৃত্যু নিয়ে তারা ভাবছে না। আমি মনে করি, সবাই চায় সড়কে মৃত্যু থামুক। আমাদের গাড়ি ভালো না, রাস্তা ভালো না, ড্রাইভার ভালো না—এগুলো ভালো করতে হবে। চালকদের মূল্যায়ন করতে হবে, সম্মান দিতে হবে। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে চালকদের মূল্যায়ন করা হয় না।’

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘নিরাপদ সড়ক নিয়ে আমি ২৪ বছর ধরে কথা বলে আসছি। পলিটিশিয়ানরা যতক্ষণ পর্যন্ত ঠিক না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এটা ঠিক হবে না। নগরীতে অপরিকল্পিত ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে। অপরিকল্পিত ফ্লাইওভারের কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদে রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছার অভাব আছে। ফুটপাত দোকান বসানোর জায়গা নয়।’ তিনি রাজনীতিবিদদের নিরাপদ সড়কের গুরুত্ব নিয়ে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।

অধ্যাপক  ড.  মোয়াজ্জেম হোসেন তাঁর প্রবন্ধে বলেন, ঢাকা মহানগরীতে অসহনীয় যানজটে দিনে গড়ে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বছরে এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। ‘মিটিগেটিং ট্রাফিক কনজেশন ইন ঢাকা : অ্যাপ্রোপ্রিয়েট পলিটিক্যাল এজেন্ডা’ শিরোনামে প্রবন্ধে তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরীতে দুর্ঘটনার ৭৪ শতাংশ ঘটে পথচারী পারাপারের সময়।

প্রতিদিন ৩৬ লাখ ট্রিপ দেয় গণপরিবহনগুলো। ৮০ শতাংশ ট্রিপ দেওয়া হয় ইঞ্জিনচালিত ও ইঞ্জিনবিহীন পরিবহনে। যাত্রীদের ৩৫ শতাংশ যায় কর্মক্ষেত্রে। ঢাকায় প্রায় ২০০ বাস সার্ভিস চলছে। প্রতিটি রুটে একটি করে কম্পানিকে দায়িত্ব দিলে শৃঙ্খলা ফিরবে ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমবে।

সড়ক নিরাপত্তা ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি আবদুল হামিদ শরীফ বলেন, ‘আমরা এলিভেটেড টাওয়ার কার পার্কিং নির্মাণ করতে পারি। এটা করতে পারলে প্রতিটি টাওয়ারে ৫০টি গাড়ি পার্কিং করা যাবে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) পরিচালক (টেকনিক্যাল) মাহবুবুর রহমান জানান, দেশের মোট যানবাহনের মাত্র ০.১ শতাংশ বিআরটিসি পরিচালনা করে।



মন্তব্য