kalerkantho


পবিপ্রবির চাকরিপ্রার্থী দেবাশীষের আত্মহত্যা

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উপাচার্যের বারণ

কৌশিক দে, খুলনা, এমরান হোসেন সোহেল, পটুয়াখালী ও তারিকুল হক তারিক, কুষ্টিয়া    

১৮ মে, ২০১৮ ০০:০০



শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উপাচার্যের বারণ

দেবাশীষ মণ্ডলকে হারিয়ে মায়ের শোক। গতকাল ডুমুরিয়ার কাঁঠালিয়া গ্রামে গেলে সন্তানের ছবি হাতে এভাবেই বিলাপ করতে দেখা যায় মাকে। ছবি : কালের কণ্ঠ

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করা মেধাবী ছাত্র দেবাশীষ মণ্ডলের আত্মহত্যার ঘটনায় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ডাকা কর্মসূচি পালন করতে দেননি উপাচার্য হারুনর রশিদ। শিক্ষার্থীদের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে জয়বাংলা পাদদেশে গতকাল বিকেল ৪টায় ওই কর্মসূচি হওয়ার কথা ছিল।

তা ছাড়া গতকাল কালের কণ্ঠে ‘চাকরিপ্রার্থীর আত্মহত্যা নানা প্রশ্ন’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষক এবং তিনজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উপাচার্যের নির্দেশে তাঁদের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। বিশেষ করে কালের কণ্ঠের সঙ্গে পুরোপুরি নিষেধ।

এদিকে সন্তানদের পড়ালেখা করাতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হওয়া দেবাশীষের পরিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার দৌড়ে প্রথমসারিতে থাকা মেধাবী এই সন্তানের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে। একই সঙ্গে তাদের কথায় ক্ষোভ ঝেড়ে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

দেবাশীষের শোকাহত বাবা পরিমল মণ্ডল জানান, দেবাশীষ প্রথমে জানিয়েছিল যে চাকরির জন্য ১০ লাখ টাকা লাগবে। ভাইভা দেওয়ার পর জানায় ১০ লাখ টাকায় হবে না, ১৫ লাখ টাকা লাগবে। তিনি বলেন, ‘ওই টাকা দিতে না পারার জন্যই আমার ছেলের চাকরি হয়নি। আমার ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী পটুয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আমি এর বিচার চাই।’

দেবাশীষের আত্মহত্যার ঘটনায় শিক্ষার্থীরা পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে জয়বাংলার পাদদেশে গতকাল বিকেল ৪টায় জড়ো হতে শুরু করে। কিন্তু উপাচার্য হারুনর রশিদ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও ওই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি মো. মাজেদুল হক খান, রুবেল গাজী ও রবিউল ইসলামকে ডেকে কোনো আন্দোলন করতে না করেন।

কর্মসূচি করতে না পরার পর শিক্ষার্থী মো. মাজেদুল হক খান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কালো পতাকা দিয়ে মুখ বেঁধে আমাদের আজ বৃহস্পতিবার মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করার কথা ছিল। কিন্তু ভিসি স্যার আমাদের তিনজনকে অনুরোধ করেছেন আজ আন্দোলন না করার জন্য।’

কেন আন্দোলনে নিষেধ করা হলো জানতে চাইলে মাজেদুল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা নিয়োগ বোর্ড চলছে। এ ধরনের কোনো প্রগ্রাম হলে স্ট্যানোরা আসবে না। নিয়োগটা হবে না। এ জন্যই আমরা অনুরোধ রক্ষা করেছি।’

তবে তাঁদের আন্দোলন হবে জানিয়ে মাজেদুল বলেন, ‘রবিবার থেকে আমরা দেবাশীষ দাদার আত্মহত্যা নিয়ে আন্দোলনে মাঠে থাকব। তাঁর আত্মহত্যা এখনো গোলক ধাঁধা। আমরা আসল রহস্য জানতে চাই।’

দেবাশীষের আত্মহত্যা প্রসঙ্গে মাজেদুল বলেন, ‘‘আমি ভিসি স্যারকে বলেছি, ‘স্যার আপনারা বলছেন দেবাশীষ দাদার মৃত্যুতে আপনাদের কোনো দায় নাই। তাহলে এই লোকটা কেন ভাইভা দেওয়ার পর আত্মহত্যা করল?’...স্যার বলেন, ‘হয়তো ভেতর থেকে তাঁর সেলেক্ট না হওয়ার বিষয়টা কেউ লিক করে দিছে। ওর আত্মহত্যা করা ঠিক হয়নি। ঈদের পরে সয়েলে আরো টিচার নিব তখন বিবেচনা করতাম’।’’

দেবাশীষের আত্মহত্যা নিয়ে গতকাল পুরো ক্যাম্পাস ছিল সরব। দেবাশীষের আত্মহত্যা আর ঘুষ দিতে না পারার বিষয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুখে মুখে ছিল একই আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে ব্যাপক সমালোচনা।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নাঈম হোসেন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘ক্ষমা করবেন দাদা। দেবাশীষরা আত্মহত্যা করে না। এঁদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।’

সাজিদ জামান নামের পবিপ্রবির এক শিক্ষার্থী ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘দেবাশীষ দাদা মাফ করে দিয়েন আমাদের, আপনি হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন এটা পবিপ্রবি; এখানে প্রশাসন হাসি মুখেই আমাদের মৃত্যুর মুখে ধাবিত করে।’

সাবেক শিক্ষার্থী ওয়ার্ল্ড ফিসের গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘সকলেই স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু স্বপ্ন ভাঙার কষ্টটা কেউ বোঝে না। একটি সরি কি সকল কিছুর সমাধান? আমাদের মাঝেও হাজার দেবাশীষেরা স্বপ্ন ভাঙার কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকে। বদলে গেছে পৃথিবী, বদলে গেছে মানুষ, বদলে গেছি আমরা।’

পবিপ্রবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের একাংশের সাধারণ সম্পাদক পলাশ আহসান ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ কেন কোনো যোগ্যতার পরীক্ষা নেওয়া হয় না? বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির ক্ষেত্রে মেধার আড়ালে কোটি টাকার বাণিজ্য কবে বন্ধ হবে?’

কালের কণ্ঠের সঙ্গে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা সরাসরি কথা বলতে না চাওয়ায় দ্বিতীয় মাধ্যম ব্যবহার করে এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা হয়। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘দেবাশীষের মৃত্তিকা বিজ্ঞানে শিক্ষক হিসেবে চাকরি হবে এটা এই ক্যাম্পাসের সবাই জানত। ভিসি স্যারই তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন। ভালো ছাত্র ছিলেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। খুবই মেধাবী ছিলেন। তাঁর শিক্ষক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত ছিল, তাই শিক্ষকরা তাঁকে দিয়ে কাজও করিয়েছেন দুই বছর পর্যন্ত। আত্মহত্যার পর শুনলাম তাঁর কাছে প্রথমে ১০ লাখ টাকা চাইছিলেন। পরে আরো পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন ভিসি স্যার। এ জন্য টাকার অভাবে চাকরি না হওয়ার হতাশায় নাকি আত্মহত্যা করেছেন। এত ক্যাম্পাসের সবাই জানে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি  ফোন ধরেননি। আর উপাচার্য হারুনর রশীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে খুলনার ডুমুরিয়ায় গতকাল দেবাশীষদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর মা দিপ্তী মণ্ডল বিরামহীন প্রলাপ বকছেন আর বলছেন, ‘চাকরির জন্য জীবন হারায়। তাহলে আর কী হবে? আমার তিনটি সোনার টুকরা। কষ্ট করে জীবনটা বানাইচ্ছি। বাড়ি এসেই আমাকে সেবা (ছালাম) করবে, ওর বাবারে সেবা দেবে। আবার বাইরে যাওয়ার সময়ও। কলেজ পড়ছে-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ছে। কিন্তু কোনো সময়ই মা-বাবা জনম মুর্গ তা মনে করেনি। আমার সব শেষ হয়ে গেল। কত স্বপ্ন, কত আশা; আমার টুকরো ছেলেডা ওই চাকরির জন্যই জীবনটা দিল।’

শুধু দেবাশীষের মা’ই নন, পরিবারের কোনো সদস্য; এমনকি পাড়া-প্রতিবেশীরাও তাঁর এ আত্মহত্যার ঘটনা মেনে নিতে পারছে না। তাই দেবাশীষের মৃত্যুর তিন দিন পরও বাড়িতে শোকের মাতম থামছে না।

মহানগরী খুলনা থেকে সড়ক, মহাসড়ক ও কাঁচা মাটির পথসহ ৭০-৭৫ কিলোমিটার পেরিয়ে দেবাশীষদের গ্রামের বাড়ি। বাবা পরিমল মণ্ডল নিতান্তই কৃষক, মা দিপ্তী মণ্ডল গৃহিণী। তিন ভাইয়ের মধ্যে দেবাশীষ মেঝ। বড় ভাই মিল্টন মণ্ডল দাকোপ উপজেলার চালনা কেসি কলেজের শিক্ষক ও ছোট ভাই আশীষ মণ্ডল খুলনা নর্থ ওয়েস্টান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে এ প্রতিবেদক দেবাশীষদের বাড়িতে পৌঁছালে দেখা যায় বাড়ি ভর্তি মানুষের জটলা। সন্তান হারানো মায়ের আহাজারি। প্রতিবেশী ও বাড়িতে আসা কারও সান্ত্বনাই মায়ের জন্য কাজে আসছে না।

পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের স্বপ্নের চাকরি না পেয়েই দেবাশীষ মণ্ডল আত্মহত্যা করেছেন। তিনি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে (পবিপ্রবি) নিজের মাতৃভূমি দাবি করতেন। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করবে বলে তিনি অন্য কোথাও চাকরির চেষ্টা করেননি। এমনকি মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়া সত্ত্বেও পিএইচডির জন্য বাইরে যাননি। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার জন্য দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিশ্চিত চাকরিটি না হওয়ায় তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন।

দেবাশীষের বাবা পরিমল মণ্ডল বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে ছেলেদের লেখাপড়া করিয়েছি। তিনটি ছেলেই আমার সোনার টুকরো। ওরা পড়াশোনায় ভালো। আমার এখন কিছু নেই। বাড়ির উঠানের খড়ের পালাটিও প্রতিবেশীর। গ্রামের লোকজন আমাকে বলত, তুমি এত কষ্ট করছ। ছেলেদের লেখাপড়া শিখিয়ে কী হবে। আমি বলতাম, ওরাই আবার সব করবে। দেবাশীষের স্বপ্ন ছিল ও পটুয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে। তাই অনার্স মাস্টাস শেষ করেও বাড়ি আসেনি। এখনো পটুয়াখালী বাসা রয়েছে। সময় ও ছুটি পেলেই সে পটুয়াখালী যেত। বলত, ‘বাবা ওই বিশ্ববিদ্যালয় তো আমার মাতৃভূমি।’

পরিমল মণ্ডল বলেন, ‘ও দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্কুলারের অপেক্ষায় ছিল। সার্কুলার হলে ও বলত চাকরি পেতে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে। যেভাবেই হোক তোমরা আমাকে টাকা দিও। আমাদের এখানে জমির মূল্য নেই। তার পরও তিন বিঘা জমি বিক্রি করি। আরো কিছু জমি বন্ধক রাখি ও বড় ছেলের ব্যাংক লোন নিয়ে সাত লাখ টাকা গুছিয়ে রাখি। দেবাশীষ বলল বাবা, আমি তিন লাখ টাকা ম্যানেজ করব। তোমরা টেনশন করো না। আমার তো চাকরিতে টাকাই লাগার কথা নয়। তার পরও টাকা ছাড়া চাকরি হবে না। ও ১২ তারিখ (১২ মে) পটুয়াখালীতে চাকরির ভাইভা দিয়ে খুশি মনে ফোন দিয়েছিল। ওর পরীক্ষা ভালো হইছে চাকরি পাবেই।’

পরিমল মণ্ডল আরো বলেন, ‘দেবাশীষ পরে ওর দাদা (মিল্টন) এর কাছে চাকরির জন্য ১০ লাখ টাকায় হবে না, ১৫ লাখ টাকা লাগবে জানিয়ে ফোন দেয়। ওই টাকা দিতে না পারার জন্যই আমার ছেলের চাকরি হয়নি।’ 

দেবাশীষের বড় ভাই ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক মিল্টন মণ্ডল বলেন, ‘শুধু ঘুষের টাকা দিতে না পারার জন্যই আমার ভাইয়ের জীবনটা এভাবে শেষ হয়েছে। আমি চালনা রূপালী ব্যাংক শাখায়...অ্যাকাউন্টে ওর চাকরির জন্য সাত লাখ টাকা রেখে দিয়েছিলাম। জমি বিক্রি ও বন্ধক করে ও ব্যাংক লোনে এ টাকা জুগিয়েছিলাম। ১৩ মে পৌনে ৫টার দিকে ও মোবাইল করে জানায় চাকরির জন্য ১০ লাখ টাকায় হবে না, ১৫ লাখ টাকা লাগবে। তুমি যেভাবে পার টাকা গুছাও। ও আমাকে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টও দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পরে আর তা দেয়নি।’

মিল্টন বলেন, ‘‘আমি ওর কাছে জানতে চাইছিলাম আগে ১০ লাখ টাকার কথা বলছো। এখন ১৫ লাখ বলছো, টাকা কী ভিসিরে দিবা। তার সাথে কী তোমার যোগাযোগ হইছে। ও আমারে মৃদু ধমক দেয়। বলে, ‘সব কথা ফোনে বলতে হয় না, তুমি ভিসির নাম বল্লা কেউ যদি শুনে ফেলে সমস্যা হবে। আমি ওকে অভয় দেই। কেউ এ কথা শুনতে পারেনি। পরদিন আমি ব্যাংকে গিয়ে আমার টাকা তোলার কথা বলি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘দাদা, এত টাকা আপনি একদিন আগে বললে ভালো হতো। কিন্তু এখন তো সমস্যা। তার পরও দেখছি।’ আমি বিষয়টি দেবশীষকে জানালে ও পরে আমাকে টাকা তুলতে নিষেধ করে। বলে ‘পরে তোমাকে আমি জানাব’।’’

দেবাশীষের ছোট ভাই আশীষ মণ্ডল বলেন, ‘দাদা আমাদের সঙ্গে সব কিছুই শেয়ার করত। ও বলত চাকরি আমার হবেই। কিন্তু সমস্যা এক আওয়ামী লীগ নেতার ভাইজি। ঠিকমতো টাকা দিতে না পারলে চাকরি পাওয়া একটু কষ্ট হবে।’

আশীষ কুষ্টিয়ায় তার দাদার সহকর্মীদের বরাত দিয়ে জানায়, ‘আত্মহত্যার দিনে তার সহকর্মীরা খুব উদ্বিগ্ন দেখেছে। সে ঠিকমতো লাঞ্চেও যায়নি। উল্টো শিক্ষকদের হাজিরা তালিকা থেকে নিজের নাম পুরো কেটে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা ব্যক্তিগত বইপত্র নিয়ে গেছে।’ 

দেবাশীষের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে আসা পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি) কমিউনিটি হেলথ বিভাগের প্রভাষক লিটন চন্দ্র সেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেবাশীষ আমাদের জুনিয়র হলেও ছিল বন্ধুর মতো। ওর স্বপ্ন ছিল পটুয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া। আমরা নিজেরা নিজেদের সান্ত্বনা দিতে পারছি না। বুঝছি কিভাবে এমন ঘটনা ঘটল।’

পবিপ্রবির শিক্ষক হওয়ার অপেক্ষায় থাকা দেবাশীষ কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিষয়ক শিক্ষক ছিলেন। তাঁর আত্মহত্যার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কুষ্টিয়া সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক রবিউল ইসলাম গতকাল বিকেলে জানান, তিনি যে আত্মহত্যা করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা যেখানে তিনি গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেন সেখানে তিনি একটি সুইসাইড নোট রেখে গিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল আমার মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী নয়—দেবাশীষ। সুইসাইড নোটটি যে দেবাশীষের নিজ হাতে লেখা সেটি নিশ্চিত হবার পরে সেটি জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

তিনি কুষ্টিয়া শহরে গোরস্তানপাড়ায় প্রফেসর টাওয়ারের তৃতীয় তলায় অন্য দুই সহকর্মীর সঙ্গে থাকতেন। সেখানে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।

ওই ফ্ল্যাটে বসবাসকারী কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ অনুষদের শিক্ষক আবদুল মান্নান ও একই বিভাগের শিক্ষক আমিনুল ইসলাম তালুকদার জানান, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) মৃত্তিকাবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন দেবাশীষ। তার স্বপ্নও ছিল সেখানকার শিক্ষক হবেন তিনি। সেভাবেই তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। অনার্স ও মাস্টার্সে তিনি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছেন। মাঝখানে কিছুদিনের জন্য তিনি কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। এরই মাঝে পবিপ্রবির মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে লেকচারার নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হলে তাঁর মৌখিক পরীক্ষাও ভালো হয়। চাকরি পাওয়ার শর্তে কর্তৃপক্ষের ঘুষের ১৫ লাখ টাকা তিনি জোগাড়ও করে ফেলেছিলেন। চাকরি না হওয়ার কথা জানতে পেরে রাগে-ক্ষোভে-অভিমানে এই মেধাবী ছাত্র গত ১৪ মে বর্তমান কর্মস্থল কুষ্টিয়ায় ভাড়াবাড়িতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এর আগে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তির পর নানা ধাপ পেরিয়ে গত ১২ মে দেবাশীষ মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১৩ মে রাত সাড়ে ৮টায় কুষ্টিয়ায় ফেরেন। এর পরদিন সকালে যথাসময়ে তিনি কুষ্টিয়ার কর্মস্থলে আসেন এবং বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে তিনি ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। এর পরই তিনি আত্মহত্যা করেন।

কুষ্টিয়া সদর মডেল থানার ওসি নাসির উদ্দীন জানান, পরিবার কোনো অপত্তি না করায় আমরা মোবাইলের কললিস্ট পরীক্ষার উদ্যোগ নেইনি।

 



মন্তব্য