kalerkantho


মাদক ছাড়তে গিয়ে নব্য জেএমবির আমির!

মসজিদে বিদেশি জঙ্গির সংস্পর্শে কট্টরপন্থী হয়ে ওঠে নিলয়

এস এম আজাদ   

১৬ মে, ২০১৮ ০০:০০



মাদক ছাড়তে গিয়ে নব্য জেএমবির আমির!

নিলয়

রাজধানীর গুলশানের ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান আকরাম হোসেন খান নিলয় ছিল ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ছাত্র। বন্ধুদের পাল্লায় পরে গাঁজা ও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ে সে। তার পরিবার ধর্মভীরু হলেও ধর্মকর্ম পালন করত না নিলয়। এ নিয়ে তার মা-বাবা ছিলেন দুশ্চিন্তায়। ২০১২ সালে রমজান মাসে হঠাৎই পরিবর্তন আসে নিলয়ের। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার পাশাপাশি মসজিদে ইতিকাফে বসতে শুরু করে সে। গুলশানের আজাদ মসজিদে ইতিকাফে বসে পরিচয় হয় নাইজেরিয়ার নাগরিক ওয়াহাবের সঙ্গে। এই ওয়াহাবই প্রথম নিলয়কে কট্টরভাবে ইসলামী নিয়ম-কানুন পালন ও জিহাদে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।

ছেলের মাদকাসক্তি ছাড়াতে তার সব কাজে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল পরিবার। এরপর আজাদ মসজিদকেন্দ্রিক আড্ডা থেকে সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হয়ে জিহাদে যেতে সদস্য সংগ্রহ করতে শুরু করে নিলয়। তার কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একপর্যায়ে পুরো পরিবারই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। আজাদ মসজিদের আড্ডায় তামিম আহম্মেদ চৌধুরীসহ নব্য জেএমবির শীর্ষ জঙ্গিদের ঘনিষ্ঠ হয় নিলয়। শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর পর বিদেশে থাকা সহযোগীদের মনোনয়নে নব্য জেএমবির সর্বশেষ আমির নির্বাচিত হয় সে। তার বোন শুভ্র নব্য জেএমবির ‘সিস্টার উইংয়ের’ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। নিলয়ের সাংগঠনিক নাম ছিল আবু আল বাঙালি ও আবু আব্দুল্লাহ। তবে নব্য জেএমবির নিজস্ব যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রাম চ্যানেলে নিলয়ের পরিচয় ছিল তিনটি—‘স্লেড উইলসন’, ‘জ্যাক স্প্যারো’ ও ‘ব্রুস ওয়েনে’।

আলাদা মামলায় তিন দফায় ১৭ দিনের রিমান্ডে নিলয় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের তদন্তকারীদের কাছে মাত্র ২৪ বছর বয়সে নব্য জেএমরি আমির হয়ে ওঠার কাহিনি বর্ণনা করেছে। তবে কট্টরভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া এই তরুণ আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হয়নি। গত ২০ এপ্রিল রিমান্ড শেষে ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত নিলয়কে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন। আর তার মা, বাবা ও বোন স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর এখন জেলহাজতে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মাদকের মতোই জঙ্গিবাদে আসক্ত হয়ে পড়েছিল নিলয়। তার স্বজনরা এই আসক্তি প্রতিকার না করে উল্টো নিজেরাই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। এর খেসারত দিচ্ছে পরিবারটি।

গত ২২ মার্চ বগুড়ার শিবগঞ্জ এলাকা থেকে নব্য জেএমবির সামরিক কমান্ডার হাদিসুর রহমান সাগরসহ নিলয়কে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। পরে আদালতের নির্দেশে

সাগরকে গুলশান হামলায় সাত দিন এবং নিলয়কে পান্থপথে হোটেল ওলিওতে বিস্ফোরণের ঘটনায় ছয় দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। ফের উভয় আসামিরই পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। নিলয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ২ এপ্রিল পল্লবীর একটি খাল থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড পিস্তলের গুলি, একটি গ্রেনেডের কনটেইনার, ১০৫টি ডেটোনেটরসহ বিভিন্ন উপকরণ জব্দ করে সিটিটিসি। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় সন্ত্রাস দমন আইনের মামলায় গত ৪ এপ্রিল তাকে ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

নিলয়ের বাবা আবু তুরাব খান, মা সাদিয়া হোসনা লাকী ও বোন তাজরীন খানম শুভ্র গ্রেপ্তার হয় আরো আগে, গত বছরের ১০ নভেম্বর। গুলশানের ১ নম্বরের ১২৭ নম্বর সড়কের ১২ নম্বর বাড়ি থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। জেলে থাকা এই পরিবারের বিলাসবহুল বাড়িতে এখন তালা ঝুলছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের আবু তুরাব খানের বড় ধরনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আছে। তাঁর একমাত্র ছেলে নিলয় স্কলাস্টিকা থেকে ‘ও’ লেভেল এবং ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে ‘এ’ লেভেল পাস করে। ২০১২ সালে নিলয় যখন ‘এ’ লেভেলের ছাত্র তখন বন্ধুদের সঙ্গে ইয়াবা ও গাঁজা সেবন করত। মা ও বাবা ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। ওই বছরের রমজান মাসে নিলয়ের মধ্যে পরিবর্তন আসে। গুলশানের আজাদ মসজিদে ইতিকাফে বসে সে। সেখানে ওয়াহাব নামে এক নাইজেরিয়ান নাগরিকের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের প্রাথমিক দীক্ষা নেয় নিলয়। ঢাকায় পড়তে আসা ওয়াহাব পরে লিবিয়ায় জিহাদ করতে গিয়ে নিহত হয়।

জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সিটিটিসি কর্মকর্তা বলেন, ২০১৪ সালে মালয়েশিয়ার লিংকন ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যায় সে। সেখানে নিবরাসের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। দেশে ফিরে গুলশানের আজাদ মসজিদকেন্দ্রিক একটি দলের সঙ্গে যুক্ত হয়, যারা সিরিয়ায় আইএসে যেতে নেটওয়ার্ক গড়ছিল। সেখান থেকেই জুনায়েদ খান, জুন্নুন শিকদার, গালিব, শ্যামন, ডা. সানায়েতসহ কয়েকজন জঙ্গি দলে নাম লেখায়। দুই বছর আগে সিরিয়ায় যাওয়া জুনায়েদ ও জুন্নুন এবং নিহত মাইনুল ইসলাম মুসার মাধ্যমে তামিমের ঘনিষ্ঠ হয় নিলয়।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ১ জুলাই হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার দিন গুলশানে থেকেই পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিলয়। ওই হামলার আগে কয়েক দফায় সে নব্য জেএমবির জঙ্গিদের টাকা দেয়। গত বছরের ১৫ আগস্ট পান্থপথের ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে অভিযানের সময় আত্মঘাতী সাইফুল ইসলামকেও খুঁজে বের করে হামলার জন্য তৈরি করে নিলয়। তার বাবা আবু তুরাবও জঙ্গি সাইফুলকে দুই দফা টাকা দিয়েছিলেন। নাজমুল হাসান মামুন নামের অন্য এক জঙ্গি ময়মনসিংহের ভালুকায় বোমা তৈরি করে। এরপর মহাখালীতে এসে সাইফুলের কাছে পৌঁছে দেয়।

নিলয়ের ভাষ্য মতে, সিরিয়ায় যাওয়ার জন্য ঢাকার পাকিস্তান, টার্কিশ ও ইরান দূতাবাসে ভিসার আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়। গত বছর অবৈধভাবে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে সে। দালালের মাধ্যমে আঁধার কার্ড (ভারতের জাতীয় পরিচয়পত্র) তৈরি করে। ওই পরিচয়পত্র দিয়ে পাসপোর্ট তৈরির চেষ্টা করে। গত বছরের নভেম্বরে দিল্লিতে তার এক সহযোগী ধরা পড়লে সে দেশে ফিরে আসে।

নিলয় দাবি করে, সংগঠনের নাজুক অবস্থার কারণে বিদেশে থাকা সহযোগীরা তাকেই আমিরের দায়িত্ব পালন করতে বলে। মুসার মৃত্যুর পর আইয়ুব বাচ্চুও তার নেতৃত্ব মেনে নেয়। সম্প্রতি সামরিক কমান্ডার হাদিসুর রহমান সাগরকে সংগঠনে সক্রিয় করে নব্য জেএমবিকে ফের চাঙ্গা করতে বগুড়ায় যায় নিলয়। এর আগে নিজের কাছে থাকা অস্ত্র ও বিস্ফোরক পল্লবীর খালে ফেলে যায় সে। সিলেট, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি আস্তানা গড়ে বোমা ও বিস্ফোরক মজুদ করে নব্য জেএমবি। এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য অর্থের সংস্থান করে নিলয়।

নিলয়ের বোন শুভ্র ছিল নব্য জেএমবির ‘সিস্টার উইংয়ের’ প্রধান। সে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ‘ব্যাট উইমেন’ গ্রুপের প্রধান হুমায়রা ওরফে নাবিলা ওই দায়িত্ব পায়। গত বছরের ২০ নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়া প্রকাশক তানভীর ইয়াছিন করিমের স্ত্রী হুমায়রাকেও ওলিও হোটেলে বিস্ফোরণের মামলায় গত ৪ এপ্রিল গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি।

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আব্দুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে পুরো পরিবার নিয়ে কিভাবে জঙ্গি নেতা হয়েছে তার বর্ণনা দিয়েছে নিলয়। তবে সে আদালতে জবানবন্দি দিতে রাজি হয়নি। তার দেওয়া তথ্য নিয়ে তদন্ত চলছে।’ জঙ্গিবাদে অর্থ সংস্থানের কারণে নিলয়ের পরিবারের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আবেদন করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।


মন্তব্য

alauddin commented 9 days ago
ধর্ম চর্চা বন্ধ করে দিলে আর জঙ্গী তৈরী হবেনা। যেখানে ধর্ম নাই সেখানে জঙ্গীও নাই।