kalerkantho


তদন্ত অবহেলায় ১০ বছর হাজিরা দিচ্ছে আসামি!

আশরাফ-উল-আলম   

২৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



তদন্ত অবহেলায় ১০ বছর হাজিরা দিচ্ছে আসামি!

মামলাটি অর্থ আত্মসাতের। তদন্ত চলছে ১০ বছর ধরে। এজাহারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। তদন্ত করে শুধু বলতে হবে অভিযোগ সত্য অথবা মিথ্যা। এই কাজটাই করতে পারছেন না তদন্ত কর্মকর্তারা। তার খেসারতে ১০ বছর ধরে আদালতে হাজিরা দিয়ে যাচ্ছেন আসামিরা।

অবশ্য ১০ বছর পর একজন তদন্ত কর্মকর্তা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে আসামিদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। ওই সুপারিশ গ্রাহ্য না করে আদালত আবারও তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে আবার নতুন করে শুরু হয়েছে তদন্ত কার্যক্রম। নতুন একজন তদন্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি আবার কত বছর কাটাবেন, সে প্রশ্নই তুলেছেন আসামিরা।

মামলার এজাহারে জানা যায়, রাজধানীর পূর্ব বাসাবোর ৫৯ নম্বর বাড়িতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘পল্লী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’-এর কার্যালয়। এই প্রতিষ্ঠানের বকেয়া উত্তোলনকারী সম্পাদক (রিকভারি সেক্রেটারি) দেলওয়ার হোসেন ভূঁইয়া ২০০৮ সালের ৩০ জানুয়ারি সবুজবাগ থানায় একটি মামলা করেন। ওই প্রতিষ্ঠানের সাবেক ব্যবস্থাপক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আনোয়ারুল আমিন, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক সৈয়দ আলাউদ্দিন ও কনিষ্ঠ কর্মকর্তা মো. জামশেদের নামে মামলাটি করা হয়। মামলার অভিযোগ, ২০০৬ সালের ১১ জুলাই থেকে ২০০৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ওই তিন কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকারীদের কিস্তি আদায় করে ও সদস্যদের সঞ্চিত টাকা ক্যাশে জমা না দিয়ে তিনজনে পরস্পর যোগসাজশে ৫৯ লাখ ৬৮ হাজার ৭১৮ টাকা আত্মসাৎ করেন।

দণ্ডবিধির ৪০৮ ধারায় দায়ের করা এই মামলা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শিডিউলভুক্ত ছিল। প্রথমে তদন্তের দায়িত্বভার দেওয়া হয় দুদকের উপসহকারী পরিচালক শাহজাহান হাওলাদারকে। কিন্তু আট বছরেও দুদক তদন্ত প্রতিবেদন দেয়নি। পরে এই ধারার মামলার তদন্ত আইন সংশোধন করে পুলিশকে ক্ষমতা দেওয়া হয়। সবুজবাগ থানার এসআই সুজন বিশ্বাস মামলার তদন্তের ভার পান। গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর এই তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিল করে বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। কিন্তু এই অভিযোগের সপক্ষে মূল কাগজপত্র বা দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে মামলায় আপাতত চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হলো।

মূল দলিলপত্র পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

পরে এই প্রতিবেদন আদালত গ্রহণ না করে পিবিআইকে আবার তদন্ত করতে বলা হয়। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন পিবিআইয়ের এসআই মো. এমদাদুল হক।

আসামি আনোয়ারুল আমিনের আইনজীবী এম এ নাসির খান কালের কণ্ঠকে বলেন, পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী আপাতত আসামিদের অব্যাহতি পাওয়ার কথা। কিন্তু আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রাহ্য না করায় এবং পিবিআইকে নতুন করে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ায় আসামিরা অব্যাহতি পাচ্ছেন না।

অ্যাডভোকেট নাসির জানান, তাঁর আসামি আনোয়ারুল আমিন মামলা হওয়ার পর জামিন নিয়েছেন। গত ১০ বছর ধরে আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। এর পরও মামলার কোনো ফল পাচ্ছেন না। আসামি হলেও এটা তাঁর জন্য খুবই কষ্টকর ও ভোগান্তির। তিনি আরো জানান, একটি প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা আত্মসাৎ করলে তার প্রমাণ থাকবে। এসব মামলা তদন্ত করতে এত বছর লাগার প্রশ্নই আসে না। দুদক তদন্তকাজ ফেলে রাখে আট বছর। আর আসামিকে হাজিরা দিতে হয়েছে ১০ বছর, যা অত্যন্ত অমানবিক। অপরাধ করলে বিচার হোক। কিন্তু বিচারের নামে আসামিদের এমন ভোগান্তিতে ফেলা আইনের মূলনীতি নয়।

মামলার আসামি আনোয়ারুল আমিন বলেন, চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করার মানে হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের টাকা আত্মসাতের প্রমাণ নেই। আবার তদন্ত হলেও একই ফল হবে। তাহলে বছরের পর বছর আদালতে হাজিরা দিয়ে যেতে হবে, এটা কেমন আইন? তিনি আরো বলেন, এই মামলার বাদীর বিরুদ্ধে একই প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের মামলা করেছিলেন তিনি। ওই মামলার তদন্তে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাওয়ায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এই বাদী দেলওয়ার হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিশেষ জজ আদালতে বিচার চলছে। তিনি পলাতক আছেন।

 

 


মন্তব্য