kalerkantho


প্রত্যাবাসন ধাপ্পা মিয়ানমারের

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা ও কক্সবাজার   

১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



প্রত্যাবাসন ধাপ্পা মিয়ানমারের

খুব শিগগির রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হবে বলে গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন মিয়ানমারের বাংলাদেশ সফরকারী মন্ত্রী উইন মিয়াট আয়ে। এর দুই দিনের মাথায় গতকাল রবিবার বাংলাদেশ থেকে নয়, বরং নিজ ভূখণ্ডের শূন্যরেখায় অবস্থানরত এক রোহিঙ্গা পরিবারকে ফিরিয়ে নিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা জানিয়েছে মিয়ানমার।

বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে, মিয়ানমারের ভেতরে শূন্যরেখায় অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নিজেদের বাড়িঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়েই সংকট সমাধানে ওই দেশটির আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে। শূন্যরেখায় অবস্থানরত রোহিঙ্গারা যেহেতু এখনো মিয়ানমারের ভেতরে এবং বাংলাদেশে ঢোকেনি, তাই তাদের নাগরিক পরিচয় যাচাইয়ে নেপিডোর অবস্থানের সঙ্গে একমত নয় বাংলাদেশ। মিয়ানমার সরকার তার নিজ ভূখণ্ড থেকে গতকাল যে রোহিঙ্গা পরিবারকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে তারও নাগরিকত্ব যাচাই  প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বানোয়াট হলেও এ ঘটনার মাধ্যমে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানাতে চাচ্ছে, তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং সংকট সমাধানে তৎপর রয়েছে। আবার শূন্যরেখা থেকে যাওয়া রোহিঙ্গা পরিবারকে যেহেতু নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, অন্য কেউ গেলেও তাদের একই পরীক্ষা দিতে হবে।

জানা গেছে, তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে গত শুক্রবার রাতে মিয়ানমারের ভেতরে যায় আকতার আলম (৫০) নামের এক রোহিঙ্গা ও তাঁর চার সদস্যের পরিবার। রাখাইনে গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া মিয়ানমার বাহিনীর নির্যাতনের মুখে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় এলেও বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকেনি। আকতার আলম বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের তুমব্রু গ্রামের চেয়ারম্যান।

মিয়ানমার সরকার আকতার আলম ও তাঁর পরিবারকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা গতকাল সোমবার ফলাও করে প্রচার করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে আকতার আলমের ‘মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের’ ছবি সরবরাহ করে নেপিডো বলেছে, অভ্যর্থনা কেন্দ্রে এসে আকতার আলম ও তাঁর পরিবার মিয়ানমারের আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব যাচাই কার্ড পূরণ করেছে। তাদের জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ‘তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে একটি রোহিঙ্গা পরিবারের ফিরে যাওয়ার কথা শুনেছি। তবে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সম্পাদিত প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় এ পরিবারটি যায়নি।’

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামানও একই তথ্য জানান।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলাদেশে এখনো ১১ লাখ রোহিঙ্গা রয়ে গেছে। তাদের মধ্যে একটি পরিবার ফেরত নেওয়ার বিষয়টি হাস্যকর। মিয়ানমারের সীমানায় ‘নো ম্যান্স ল্যান্ডে’ ছয় হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদের ফেরত নেওয়ার জন্য আমরা বারবার বলার পরও তারা নিচ্ছে না।”

তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে হঠাৎই একটি রোহিঙ্গা পরিবার ফিরে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে সেখানে অবস্থানরত অন্য রোহিঙ্গাদের মধ্যে। শূন্যরেখায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা নেতা আরিফ মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, “রোহিঙ্গা আকতার আলম বরাবরই একজন ‘রোহিঙ্গা রাজাকার’। তিনি এবং তাঁর পরিবার নো ম্যান্স ল্যান্ডের বাসিন্দা হিসেবে ত্রাণসামগ্রীসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও বাস্তবে ছিলেন মিয়ানমার সরকারেরই একজন গুপ্তচর।”

আরিফ জানান, আকতার আলম মিয়ানমারে থাকার সময়ও ওই দেশটির সরকারের কাছে তথ্য সরবরাহ করতেন। রাখাইনের ক্ষতাসীনদের সঙ্গেও রোহিঙ্গা আকতারের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেই আকতার আলমের বাড়িঘরও পুড়িয়ে দেওয়া হয়নি। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে গোপন আঁতাত করেই তিনি ও তাঁর পরিবার ফিরে গেছে। গত শুক্রবার বিকেলের দিকে আকতারকে সপরিবারে তুমব্রু বাজারে একটি গাড়িতে চড়তে দেখা গেছে। আর পরের দিন তাঁকে দেখা গেছে মিয়ানমার সরকারের লোকজনের ফেসবুকে।

শূন্যরেখায় অবস্থানরত আরেক রোহিঙ্গা নেতা ফরিদ আলম জানান, আকতার আলমের আরো দুই সন্তান বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তাঁদের একজন সাইফুল কাদের (২২) রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। অন্যজন মেয়ে। তাঁর বিয়ে হয়েছে সীমান্তের এপারে।

এদিকে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, এক ‘রোহিঙ্গা রাজাকার’কে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ফিরিয়ে নিয়ে বড় ধরনের এক বিজয় মনে করছে। তারা বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর কথা বলে বিশ্বের কাছে নিজেদের আন্তরিকতা দেখাচ্ছে। বাস্তবে এটি এক মহাধাপ্পাবাজি।

 



মন্তব্য