kalerkantho


ওয়াকিলকে চায় স্থানীয় আ. লীগ বিএনপির রুহুল আলম প্রস্তুত

তৈমুর ফারুক তুষার ও শফিক সাফি   

২৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ওয়াকিলকে চায় স্থানীয় আ. লীগ বিএনপির রুহুল আলম প্রস্তুত

রাজধানীর গুলশান, বনানী, ক্যান্টনমেন্ট ও ভাষানটেক থানা নিয়ে ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসন। গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক এলাকা এবং সেনানিবাসের অবস্থান হওয়ায় আসনটি রাজনীতিবিদদের কাছে মর্যাদাপূর্ণ। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এ চার থানার এলাকাগুলো ঢাকা-৫ আসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। নবম জাতীয় নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্বিন্যাসের সময় ঢাকা-৫ ভেঙে তিনটি আসন করা হয়। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য বিএনএফ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ। ২০০১ সাল থেকে এলাকাটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এবার এ আসনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিতে নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুরোধ জানাবেন বলে জানিয়েছেন। তাদের পছন্দের প্রার্থী হলেন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ও জাতীয় কমিটির সদস্য ওয়াকিল উদ্দিন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) রুহুল আলম চৌধুরী কৌশলে জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন এই এলাকায়। দলটির প্রভাবশালী আর কোনো নেতাকে এই আসনে এখনো নির্বাচনমুখী কর্মকাণ্ড চালাতে দেখা যায়নি। তবে গুঞ্জন রয়েছে, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আওয়াল এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন।

পঞ্চম সংসদ থেকে বিভিন্ন সময়ে এ আসনের এমপি ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ, বিএনপির মেজর (অব.) কামরুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগের এ কে এম রহমত উল্লাহ। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এই এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন এ কে এম রহমত উল্লাহ। পরের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী কামরুল ইসলামের কাছে তিনি হেরে যান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের সমীকরণে আসনটি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও তারা আসনটি এরশাদকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এরশাদ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনএফের আবুল কালাম আজাদ।

দীর্ঘ ১৭ বছর এই আসনে দলীয় সংসদ সদস্য না থাকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের বঞ্চিত মনে করছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ওয়াকিল উদ্দিনকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান এ আসনের সব থানা ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতাকর্মী। ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য না থাকায় ওয়াকিল উদ্দিন বিপদে আপদে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ান, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অর্থ জোগান দিয়ে থাকেন।

ওয়াকিল উদ্দিন পাকিস্তান আমলে ছাত্রলীগে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আসেন। স্বাধীনতার পর গুলশান থানা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পান। পরে যুবলীগে যুক্ত হন। ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি গুলশান থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে তিনি দলের জাতীয় কমিটির সদস্য। জনপ্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘদিন স্থানীয় সরকারে কাজের অভিজ্ঞতা আছে ওয়াকিল উদ্দিনের। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। এরপর ঢাকা সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের দুই মেয়াদে কমিশনার নির্বাচিত হন ওয়াকিল উদ্দিন। তিনি রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত। তিনি স্বদেশ প্রপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বারিধারা করপোরেশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের পরিচালক।

আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে ওয়াকিল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই এই এলাকার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বিগত কয়েক মেয়াদে এই আসনে আমাদের দলের এমপি নেই। ফলে নেতাকর্মীদের দাবি এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী। আমি মাঠ গোছানোর কাজ করছি। এখন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যদি আমাকে বিবেচনা করেন তবে নির্বাচনে অংশ নেব।’

ভাষানটেক থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি গিয়াসউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন এই আসনে আওয়ামী লীগের এমপি না থাকায় দলীয় নেতাকর্মীরা নানা ক্ষেত্রে উপেক্ষিত। এলাকার সাধারণ মানুষও নাগরিক সুবিধা ঠিকমতো পাচ্ছে না। এ জন্য আমরা এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়ার জন্য দলীয় হাইকমান্ডের কাছে অনুরোধ করব। আর প্রার্থী হিসেবে কর্মীবান্ধব নেতা ওয়াকিল উদ্দিনই হবে আমাদের পছন্দ। তিনি বিপদে-আপদে নেতাকর্মীদের পাশে থাকেন, খোঁজখবর রাখেন।’

বনানী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মীর মোশারফ হোসেন বলেন, ‘আমরা দলীয় প্রার্থী চাই। এর আগে চেয়েও পাইনি। এখানে হায়ার করা মানুষকে প্রার্থী করা হয়েছে। অন্য দলের যাঁদের এমপি বানিয়েছি তাঁরা কেউ আমাদের দলের নেতাকর্মীদের চেনেও না, খোঁজখবরও নেন না। সত্যিকার অর্থেই এখানকার কর্মীরা উপেক্ষিত।’ দলীয় প্রার্থী হিসেবে কাকে চান জানতে চাইলে মীর মোশারফ বলেন, ‘এখানে অনেকেই প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে ওয়াকিল উদ্দিনই এগিয়ে আছেন। তিনিই আমাদের জোরালো মনোনয়নপ্রত্যাশী।’

গুলশান থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত উল্লাহ বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, এখন কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠনের কাজ চলছে। আগামী নির্বাচনে আমরা ওয়াকিল উদ্দিনকে ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী হিসেবে চাইব। গত তিন মেয়াদে আমাদের দলীয় এমপি না থাকায় তিনিই এখানকার আওয়ামী লীগ গুছিয়ে রেখেছেন। দলের সব অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকেন এবং অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকেন। উনার মতো কর্মীবান্ধব নেতা এমপি হলে দল উপকৃত হবে।’

স্থানীয় বিএনপির নেতারা বলছেন, কূটনৈতিক জোন ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ভোটারদের কথা বিবেচনায় রেখেই এ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করবে দল। দলের সম্ভাব্য প্রার্থী মে. জে. (অব.) রুহুল আলম চৌধুরী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মাড কোরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। দীর্ঘ চাকরি জীবনে তিনি সেনাবাহিনীর জিওসিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বাইরে আপাতত এই আসনে বিএনপির অন্য কেউ প্রচার চালাচ্ছেন না। দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথা বলেও জানা যায়, এই আসনে প্রার্থী হিসেবে সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের কাউকে বিবেচনা করা হবে। আবার জোটের হিসাব-নিকাশে নতুন কোনো প্রার্থীও আসতে পারেন বলে জানা গেছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) গত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তাবিথ আওয়াল। ডিএনসিসির স্থগিত হওয়া উপনির্বাচনেও তাঁর প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ওই উপনির্বাচন নিয়ে জটিলতা এখনো কাটেনি। সার্বিক বিবেচনায় তাবিথ এই এলাকায়ও রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।

রুহুল আলম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সহায়ক সরকারের দাবি আদায়ের আন্দোলন চলমান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের দলের চেয়ারপারসনের মুক্তির আন্দোলন। দাবি আদায় করতেই আন্দোলন-সংগ্রাম ও জনমত তৈরি করছি। সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে পরিবেশ দরকার সরকারের তরফে তা সৃষ্টির ন্যূনতম লক্ষণও নেই। কিন্তু নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির নেতাকর্মীরা অবশ্যই আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে বিএনপির সদিচ্ছার অভাব নেই। আমি দলের তরফে নির্দেশনা পাওয়ার পর ঢাকা-১৭ আসনের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করছি। প্রতিদিনই নানা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। দল নির্বাচনে অংশ নিলে আশা করি জয়ী হতে পারব।’

 

 

 

 


মন্তব্য