kalerkantho


সিরাজুল আলম খানকে কাঁধে তুলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেছি

মোস্তফা মোহসিন মন্টু

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সিরাজুল আলম খানকে কাঁধে তুলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেছি

১৯৬৯ সাল থেকে শুরু। পাকিস্তান রেডিওতে অনবরত ঘোষণা হতো খসরু, মন্টু ও সেলিমকে ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। খসরু মানে কামরুল আলম খান খসরু, পরবর্তী সময়ে ‘ওরা ১১ জন’ সিনেমার নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। তিনি ছিলেন সিরাজুল আলম খানের চাচাতো ভাই। সেলিম হলেন আমার আপন ভাই। তিনজনই ছিলাম ছাত্রলীগের কর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের প্রভাব বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা ছিল আমাদের, ক্ষেত্রবিশেষে মারামারিও করতে হয়েছে। মোনেম খাঁর রাগটা ছিল সে কারণে।

স্বাধীনতাউত্তর সময়ে মুসিলম লীগের ছাত্রসংগঠন এনএসএফের ব্যাপক প্রভাব ছিল। এনএসএফ দেখাশোনা করত মোনেম খানের ছেলে খসরু। তার একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ ছিল। তাদের টার্গেট ছিল ছাত্রলীগ। সাধারণ ছাত্ররাও তাদের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ ছিল, তবে প্রতিবাদ করা ছিল বেশ কঠিন।

এনএসএফের সন্ত্রাসী বাহিনীর লাঠিয়ালরা পরিচিত ছিল ‘পাচপাত্তর’ নামে। অবশ্য এটা কারো নাম ছিল না। এদের একজনের নাম সাইদুর রহমান। আরেকজন ছিল খোকা নামে। সাইদুর রহমান থাকত এসএম হলে। তার সামনের একটি দাঁত ছিল না। একবার কেউ একজন সাইদুর রহমানের শ্রেণিপরিচয় জানতে চাইলে জবাব দেয় ‘পাস পার্ট টু’। দাঁত না থাকায় শোনা যায় ‘পাচপাত্তর’। সেই থেকে পরিচিতিটা এসে যায় ‘পাচপাত্তর’ বলে। এই দুই সন্ত্রাসীরই অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। সাইদুর রহমান মারা যায় এসএম হলের ক্যান্টিনে। খোকার লাশ পাওয়া যায় রমনা পার্কে। তাদের মৃত্যুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এনএসএফের বাতি একেবারে নিভে যায়।

যে কাজগুলো করা বা বলার ক্ষেত্রে জাতীয় নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বাধ্যবাধকতা ছিল, তিনি সেগুলো ছাত্রনেতাদের দিয়ে করাতেন বা বলাতেন। সে জন্য ছাত্রনেতারাই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে-পরামর্শে স্বাধীনতা আন্দোলনটা এগিয়ে নিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন সিরাজুল আলম খান, এরপর শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদসহ চার খলিফা হিসেবে পরিচিতরা।

ছয় দফা ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতাই গ্রেপ্তার হন। ছাত্রলীগের প্রথম সারির নেতারাও ছিলেন জেলে। তবে ব্যতিক্রম ছিলেন সিরাজুল আলম খান। তিনি গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলতে পারতেন। সে সময় আমি ও খসরু বিশেষ দায়িত্ব পালন করতাম, যাতে কোনোভাবেই দাদা ভাইকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে না পারে। এটা বুঝতাম, সিরাজুল আলম খানও যদি গ্রেপ্তার হয়ে যান তাহলে আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন অনেক দিন গেছে, আমরা সিরাজুল আলম খানকে ঘাড়ে তুলে দৌড়ে নিরাপদে পৌঁছে দিয়েছি।

নেতাদের কাছে থাকার কারণে অনেক গোপন বিষয়াদি আমাদের কানে আসত। ১৯৬৫ সালেই কথা উঠেছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার। সে ধারণাই পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রনেতারা এগিয়ে নেন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের গোড়াতেই শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদসহ ছাত্রনেতারা ঢাকার আশপাশের ছাত্র-তরুণদের ডাকেন। ইকবাল হলে (বর্তমান জহুরুল হক হল) সভা হয়। সভায় নেতারা পরিষ্কারভাবেই আমাদেরকে বলেন সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে। ইপিআরের একজন সদস্য একটি অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে এসে ইকবাল হলে আশ্রয় নিয়েছিল। তাকে আমাদের কেরানীগঞ্জে নিয়ে বাড়ির সামনের মাঠে ছাত্র-তরুণদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু করি।

২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর বাসার সামনে দাঁড়িয়ে সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘তুমি কেরানীগঞ্জের বাড়িতে যাও, আমরা আসছি।’ আমার সঙ্গে তখন ১০-১২ জন। নিউ মার্কেট এলাকায় আসতেই গোলাগুলির আওয়াজ পাই। বাড়িতে যাওয়ার পথেই কেরানীগঞ্জ থানা দখলে নিয়ে নিই। থানায় পাই ২৫টি রাইফেল, এক পেটি গুলি ও চারটি পিস্তল। অস্ত্রগুলো নিতে নিতে ভোর হয়ে যায়।

২৭ মার্চ থেকে নেতারা আমাদের বাড়িতে আসতে থাকেন। আসতে থাকে বিধ্বস্ত জনতার স্রোত। নেতাদের নিয়ে আমরা ফরিদপুরের দিকে যেতে থাকি।

১ এপ্রিল বিবিসি সংবাদ প্রচার করে, আওয়ামী লীগের নেতারা ঢাকা শহরের অদূরে কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নিয়েছে। ২ এপ্রিল ভোররাতে ভারী অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা কেরানীগঞ্জ আক্রমণ করে। এখানে কয়েক হাজার মানুষ শহীদ হয়। আগের রাতেই আমি, নুরে আলম সিদ্দিকী ও শাজাহান সিরাজ মুন্সীগঞ্জে শাহ মোয়াজ্জেমের বাড়িতে পৌঁছে যাই। পরদিন নৌকায় পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে ফরিদপুরে পৌঁছাই। ফরিদপুর তখন নিরাপদ মুক্তাঞ্চল। তৎকালীন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার নুরুল মোমেন মিহির সম্পর্কে আমার চাচাতো ভাই। তিনি আওয়ামী লীগের নেতাদের সহযোগিতা করছেন, পুলিশ লাইনের অস্ত্রও তাদের দিয়েছেন। দেখা হলো ওবায়দুর রহমানের সঙ্গে।

প্রবাসী সরকার গঠনের আগেই মুজিবনগরে পৌঁছাই। মুজিবনগরে একটি ক্যাম্প করি। কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী এবং তাঁর সেনাবাহিনীর চিকিৎসক স্ত্রী একসঙ্গে কুষ্টিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি সেনারা মুজিবনগর দখল করে নিলে ভারতে চলে যাই। বেশ কিছুদিন কলকাতায় থাকতে হয়। তখনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়নি। সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক জানান, ভারত সরকারের সঙ্গে কথা হচ্ছে, দ্রুত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হবে। আমাদের সঙ্গে ছিলেন মুন্সীগঞ্জের মহিউদ্দিন। প্রথমে যাই বাগডোরা ক্যাম্পে। সেখান থেকে মে মাসে প্রশিক্ষণ নিতে যাই দেরাদুনে। দেরাদুন হচ্ছে জেলা, চাকরাতা থানা। এই চাকরাতা থানার অধীনে টান্ডুয়া ছিল আমাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। প্রশিক্ষণ নিয়ে জুলাই মাসে দেশে প্রবেশ করি। আমার দায়িত্ব ছিল ঢাকা মহানগরের পশ্চিম ভাগ ও কেরানীগঞ্জ।

 

লেখক : স্বাধীনতাপূর্বকালীন সময়ে ছাত্রলীগের অন্যতম নেতা। ১৯৭১-মুজিব বাহিনীর ঢাকা মহানগর পশ্চিমাঞ্চল কমান্ডার ছিলেন।

অনুলিখন : লায়েকুজ্জামান



মন্তব্য