kalerkantho


১৪ দলের কয়েক নেতা প্রচারে, দ্বিধায় বিএনপি

তৈমুর ফারুক তুষার ও শফিক সাফি   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



১৪ দলের কয়েক নেতা প্রচারে, দ্বিধায় বিএনপি

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল, পল্টন ও রমনা থানার এলাকাগুলো নিয়ে ঢাকা-৮ সংসদীয় আসন। গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে জয় পেতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে রাজনৈতিক দলগুলো। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ক্ষমতাসীন ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। তিনি আবারও প্রার্থী হবেন এ আসনে। কোনো কারণে নির্বাচনে জোট না থাকলে যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রার্থী কে হবেন তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিএনপির প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা মির্জা আব্বাস কিংবা হাবিব উন নবী খান সোহেল প্রার্থী হতে পারেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ আসনের বিভিন্ন এলাকায় মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের পক্ষে বহু ব্যানার, ফেস্টুন টানানো হয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা রাশেদ খান মেনন ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর আগে তিনি বরিশালের একটি আসন থেকে নির্বাচন করতেন। ১৯৯১ সালে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী হিসেবে কাস্তে প্রতীক নিয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মেনন। পরে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি আর পারেননি। ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। জোটগতভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত হলে আসনটিতে আবারও রাশেদ খান মেননের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী। আর আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে এ আসনে

প্রার্থী হিসেবে দেখা যেতে পারে যুবলীগের জনপ্রিয় নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটকে।

স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা জানায়, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস অথবা দলের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেলকে প্রার্থী হিসেবে দেখা যাবে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে সোহেলই বিএনপির প্রার্থী ছিলেন।

এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন ২০০৫ সালে ১৪ দলীয় জোট গড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। টানা দুই মেয়াদে সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বেশ সখ্য গড়ে তুলেছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ নানা কাজ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে থাকেন মেনন। আগামী নির্বাচনে তিনি এ আসন থেকেই আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এলাকায় নিয়মিত বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন তিনি।

রাশেদ খান মেনন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ঢাকা-৮ আসন থেকেই আবারও নির্বাচন করব। যেহেতু আমি জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব সে জন্য জোটের শরিক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে মতবিনিময় করছি। মাদক নির্মূলসহ নানা ইস্যুতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে আমি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গিয়ে অনুষ্ঠান করছি। সবার সঙ্গেই আমার সুসম্পর্ক রয়েছে।’

এ নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছেন যুবনেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি হিসেবে তিনি রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। আওয়ামী লীগের যেকোনো সভা-সমাবেশে সম্রাটের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নিয়ে থাকে। বিরোধী দলের সরকারবিরোধী কর্মসূচির দিনে ঢাকার রাজপথে যুবলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন সম্রাট। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের অনেক কেন্দ্রীয় নেতারও বিশেষ প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছেন তিনি। মতিঝিল, পল্টন ও রমনার বিভিন্ন এলাকায় সম্রাটের পক্ষে বিপুলসংখ্যক ব্যানার, ফেস্টুন ঝুলিয়েছে তাঁর কর্মী-সমর্থকরা। কাকরাইল এলাকায় বেড়ে ওঠা সম্রাট ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি থেকে শুরু করে থানা, মহানগর ও কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ছিলেন। এরপর রমনা থানা যুবলীগের সভাপতি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরে একই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পান।

ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে আত্মনিয়োগ করেছি। যুবলীগের পক্ষে ঢাকা মহানগরে আমরা ১০০ টিম করেছি। তারা কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন করছে। আমার কাছে নৌকাকে বিজয়ী করাই গুরুত্বপূর্ণ। আমি দীর্ঘদিন নেত্রীর (শেখ হাসিনা) একজন ক্ষুদ্র অনুসারী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। নেত্রীই ভালো বোঝেন কাকে কোথায় মনোনয়ন দেবেন।’

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-৬ অথবা ঢাকা-৮ আসনে মনোনয়ন পেতে আগ্রহী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ। তবে তিনি এখনো জোরালোভাবে মাঠে নামেননি।

শাহে আলম মুরাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ঢাকা মহানগরে দীর্ঘদিন ধরে দলকে সংগঠিত করার কাজ করে যাচ্ছি। আওয়ামী লীগ সভাপতি যদি মনোনয়ন দেন তবে নির্বাচনে অংশ নেব।’

আসনটিতে একজন শক্তিশালী প্রার্থী দিয়ে সেটি পুনরুদ্ধার করতে চায় বিএনপি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস অথবা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেলকে প্রার্থী হিসেবে চায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তবে এ দুই নেতাই বিভিন্ন মামলায় জর্জরিত। সোহেলের বিরুদ্ধে মামলা আছে তিন শতাধিক। মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে। তবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারলে মির্জা আব্বাসের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কোনো কারণে আব্বাস প্রার্থী হতে না পারলে সোহেলই হবেন। আপাতত এই দুজনকে নিয়েই নির্বাচনী মাঠ সাজাচ্ছে দলটি। কোনো কারণ দুজনের একজনও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য হলে বিকল্প ভাববে বিএনপির হাইকমান্ড। আর দুজনই নির্বাচনের যোগ্য হলে সম্ভাবনা বুঝে দুটি আসনে তাদের প্রার্থী করা হতে পারে।

আসনটি মির্জা আব্বাসের এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানেই তাঁর বাড়ি। এই আসন থেকেই তিনি এমপি নির্বাচিত হয়ে পূূর্তমন্ত্রী হয়েছিলেন। সীমানা পুনর্বিন্যাসের আগে মতিঝিল, শাহজাহানপুর, সবুজবাগ, মুগদা, খিলগাঁও নিয়ে গঠিত ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে মির্জা আব্বাস আওয়ামী লীগের মোজাফফর হোসেন পল্টুকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। সপ্তম সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবের হোসেন চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন। অষ্টম সংসদ নির্বাচনে সাবের হোসেন চৌধুরীকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন মির্জা আব্বাস।

বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও মির্জা আব্বাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি এক কর্মসূচি শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমরা স্পষ্ট বলে দিয়েছি, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছাড়া নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হলে জনগণ তা মানবে না।’

এক-এগারোর সরকারের সময় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন হাবিব উন নবী খান সোহেল। রংপুরে জন্ম হলেও এখন তিনি ঢাকার বাসিন্দা। তিনি ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ২০০০ সাল পর্যন্ত সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে সোহেল বিএনপির কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। দলের নেতাকর্মীদের ধারণা, এবার এ আসন কিংবা ঢাকার অন্য কোনো আসন থেকে নির্বাচন করবেন সোহেল।

আত্মগোপনে যাওয়ার আগে হাবিব উন নবী খান সোহেল কালের কণ্ঠকে বলেছিলেন, ‘দল নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে অবশ্যই নির্বাচন করব এবং তা ঢাকা থেকে করার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও এটি পুরোটাই নির্ভর করছে দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর। তবে এ মুহূর্তে আমরা নির্বাচন নিয়ে ভাবছি না। কিভাবে অগণতান্ত্রিক এই সরকারকে হটিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করব, সেটাই আমাদের প্রথম কাজ।’

 



মন্তব্য