kalerkantho


মানিকগঞ্জে র‌্যাবের অভিযান

অপহরণকারীচক্রের টর্চার সেলের সন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



অপহরণকারীচক্রের টর্চার সেলের সন্ধান

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে অপহরণকারীচক্রের ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে অপহৃত দুই ব্যবসায়ীকে। একই সঙ্গে চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ছয়টি বিদেশি পিস্তল, ৯টি ম্যাগাজিন, ৩৫ রাউন্ড গুলি, সাতটি চায়নিজ কুড়াল, চারটি চাপাতি ও নগদ দুই লাখ ৮৫ হাজার টাকা।

গত রবিবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ওই এলাকায় অভিযান চালানো হয়। পরে গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র‌্যাব কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানায় র‌্যাব।

র‌্যাব জানায়, এই অপহরণকারীচক্রের দলনেতা সেলিম মোল্লা ও তাঁর ছেলে রাজিব। মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার কালোয়া এলাকায় নিজ বাড়িতে ছিল সেলিম মোল্লার টর্চার সেল। এখানে অপহরণকারীদের ধরে নিয়ে ব্যাপক নির্যাতনের পর মুক্তিপণ আদায় করত বাবা-ছেলে ও তাঁদের সহযোগীরা। 

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন চক্রের মূল হোতা সেলিম মোল্লা (৫০) ও তাঁর ছেলে রাজিবুল হাসান রাজিব (২৭)। বাবা-ছেলের সহযোগী মোশারফ হোসেন (৪৭), নিরব আহম্মেদ টিটু (২৯), আব্দুর রাজ্জাক (৩৫), তারেক হোসেন (৩১), আবুল বাশার বিশ্বাস (৩৩), রুহুল আমিন (৩৫), তারেক হোসেন পুলক (২৬) ও তুহিন বিশ্বাস (৩০)।

অভিযানে ওই বাড়িতে আটকে রাখা জাফর ইকবাল (৪০) ও মিরাজ গাজী (৩৫) নামে অপহৃত দুই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করা হয়। অপহরণের পর হাত, পা ও চোখ বেঁধে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করার চেষ্টা করা হচ্ছিল।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র‌্যাব কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে র‌্যাব-২-এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এএসপি ফিরোজ কাউছার সাংবাদিকদের জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্রের সদস্য। তাঁরা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনকে অপহরণের পর মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ হাতিয়ে নিতেন। দাবি করা টাকা না পেলে অমানবিক নির্যাতন চালাতেন।

র‌্যাব জানায়, গত ৯ মার্চ সকাল ১১টার দিকে দুই ব্যবসায়ী জাফর ইকবাল ও মিরাজ গাজী নামে দুই ব্যবসায়ীকে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়। একপর্যায়ে তাঁদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। সেই সঙ্গে টাকা না দিলে তাঁদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ অবস্থায় অপহৃত জাফরের ভাগ্নে হাফিজুর রহমান সবুজ রাজধানীর শেরেবাংলানগর, র‌্যাব-২ কার্যালয়ে অভিযোগ দেন। 

র‌্যাব-২ অপহৃতদের উদ্ধারের পাশাপাশি অপহরণকারীচক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করতে গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। তদন্তসংশ্লিষ্ট র‌্যাব-২ কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে অপহরণের পরপরই মিরাজের পরিবার মুক্তিপণ হিসেবে চক্রের সদস্য রাজিবুল হাসান রাজিবের অ্যাকাউন্টে আড়াই লাখ টাকা জমা দেয়।

র‌্যাব জানায়, অপহরণকারীরা মোবাইল ফোন চালু রেখে নির্যাতনের সময় অপহৃতদের চিৎকার আর কান্না শোনাত। অপহরণকারীদের চাপে জাফর তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বললে তাঁর স্ত্রী বাসার ড্রয়ারে থাকা চেক বই ও নগদ টাকাসহ দুই লাখ ৮৫ হাজার টাকা বের করে তাদের দিয়ে স্বামীকে ফেরত চান। দুর্বৃত্তরা ওই টাকা মানিকগঞ্জে নিয়ে আসার জন্য বলে। পরে জাফরের বোন চেক বই ও টাকা মানিকগঞ্জে নিয়ে আসেন। এ সময় অপহরণকারীদের একজন তাঁর বোনের সঙ্গে দেখা করে চেক বই ও টাকা নিয়ে আসে।

অন্যদিকে অপহরণকারীদের চাপে অপর অপহৃত মিরাজ ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত পাঁচ লাখ টাকা পাঠাতে বলে একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর দেয়। অনেক কষ্ট করে মিরাজের স্ত্রীও আড়াই লাখ টাকা ওই অ্যাকাউন্টে পাঠান। বাকি টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করছেন বলে অপহরণকারীদের জানান। ওই অ্যাকাউন্ট ছিল রাজিবের।

মিরাজ ও জাফরের স্ত্রীরা র‌্যাবকে বলেন, অপহরণকারীদের চাহিদানুযায়ী টাকা পাঠাতে দেরি হওয়ায় পুনরায় তাঁদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে হাত, পা, চোখ বাঁধা অবস্থায় ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁদের তারা পবিত্র কলেমা পাঠ করায় এবং বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিয়ে একটি গাড়িতে ওঠায়। আমরা অনুনয়-বিনয় করে প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে আকুতি জানাই এবং বাকি টাকা খুব দ্রুত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিই।

প্রাথমিক তদন্তে গ্রেপ্তারকৃতদের সম্পর্কে র‌্যাব জানতে পারে, চক্রের দলনেতা সেলিম মোল্লা সমাজে ভদ্রবেশী আচরণের অন্তরালে সংঘবদ্ধ অপহরণকারীচক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এই ভয়ংকর সন্ত্রাসী দীর্ঘদিন ধরে এই ঘৃণ্য কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এলাকার সাধারণ জনগণও তাঁর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কাছে জিম্মি। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলত না। তিনি এলাকার উচ্ছৃঙ্খল যুবক, উঠতি বয়সী বখাটে ছেলেদের কাঁচা টাকার লোভ দেখিয়ে রাজধানীসহ এলাকার বিত্তবান ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে অপহরণ করতেন।



মন্তব্য