kalerkantho


আবার মর্যাদার আসনে পাট

প্রায় ২০০ ধরনের পাটপণ্য তৈরি করছেন বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা

মোশতাক আহমদ   

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আবার মর্যাদার আসনে পাট

ফাইল ছবি

পাট এখন আর কেবল দড়ি, বস্তা, চটের উৎস নয়। বহুমুখী উপযোগিতায় পাট পেয়েছে মর্যাদার আসন। ফলে পাটের বাজারমূল্য বাড়ছে, আশাবাদী কৃষক চাষের জমি বাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলার পাট আবার নির্ভরতার জায়গায় স্থান নিচ্ছে। সূত্র মতে, দেশে প্রায় ৬৫ হাজার হেক্টর জমি আছে, যেখানে পাট ছাড়া অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করা যায় না। তাই এই পাটকে বহু ব্যবহারে নিয়ে যেতে পারলে একদিকে যেমন দেশের আয় বাড়বে, অন্যদিকে এই বিশাল ভূমির ব্যবহারও অর্থবহ হয়ে উঠবে।

দেশের একসময়ের প্রধান অর্থকরী ফসল পাটের কদর কমতে থাকে আশির দশকের পর। এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী বন্ধ করে দেওয়া হয়। শীর্ষ রপ্তানি পণ্য হিসেবে পাটের জায়গা দখল করে তৈরি পোশাক। কিন্তু গত কয়েক বছরে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে পাট খাত।

বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম রবিবার কালের কণ্ঠকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক ইচ্ছা আর সরকারের নিরলস প্রচেষ্টায় অবশেষে আমরা পাটের হারানো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি।’ তিনি জানান, যেখানে চার-পাঁচ বছর আগেও দেশে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ বেল পাট উৎপন্ন হতো, সেখানে বর্তমানে পাটের উৎপাদন ৯১ লাখ বেল ছাড়িয়ে গেছে।

প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম গতকাল পাটসংক্রান্ত এক গোলটেবিল বৈঠকে বলেছেন, ‘আমরা পাটজাত পণ্যের বহুমুখীকরণে কাজ করে যাচ্ছি। গত বছর পাটের পণ্যের বহুমুখীকরণের তালিকা পেয়েছিলাম ১৩৫টি, সেখানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেটা ২৪০টিতে এসে দাঁড়িয়েছে।’ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘পাটের উন্নয়ন : গণমাধ্যমের ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি আরো বলেন, পাটের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র হয়েছে। ’৭৫ পরবর্তী সময়ে পাটকে ধ্বংস করার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিজেএমসির মিলগুলো বেসরকারীকরণের নামে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা হয়। শর্ত থাকলেও কেউ মিল চালু করেনি। বরং গাছপালা, ঘরবাড়ি বিক্রি করে জায়গা ভাড়া দিয়ে দেওয়া হয়।’ অর্থনৈতিক বিটের সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের যৌথভাবে আয়োজিত বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘৯০ ভাগ বীজ ভারত থেকে এনে পাট চাষ করতে হয়। কিন্তু ’৭৫ সালের আগে বাংলাদেশে এ অবস্থা ছিল না। ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় মিল বন্ধ এবং চাষিদের বীজ উৎপাদনে নিরাশ করা হয়েছে।’

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বেসরকারি খাতের বড় শিল্পোদ্যোক্তারা পাট খাতে বিনিয়োগ শুরু করেছেন। বিকাশের ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে চিংড়িকে ডিঙিয়ে পাট দ্বিতীয় রপ্তানি পণ্যের তালিকায় উন্নীত হয়। তবে বিভিন্ন কারণে সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়লেই দেশের পাটকলগুলো সারা বছর কর্মচঞ্চল থাকতে পারে। পাটের বাজারমূল্য বাড়তে পারে এবং পাটচাষিরাও পেতে পারে ন্যায্যমূল্য। এ জন্য সরকার ‘ম্যান্ডেটরি প্যাকেজিং অ্যাক্ট ২০১০’ বাস্তবায়ন করেছে। ফলে দেশের অভ্যস্তরীণ বাজারেই প্রতিবছর প্রায় ১০০ কোটি টাকার পাটের বস্তার অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপের বাজারে এ বছর থেকেই কৃত্রিম আঁশের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর সুফল পাওয়া যাবে বাংলাদেশের পাটপণ্যে। আগামী বছর থেকে ইউরোপের ২৮টি দেশে একযোগে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ হবে। বিশ্বে প্রতিবছর ৫০০ বিলিয়ন পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। এই বাজারের ২ শতাংশও যদি বাংলাদেশ ধরতে পারে, তাহলে দেশের পাট খাতের চেহারা আমূল পাল্টে যাবে। পরিবেশবান্ধব পণ্য হওয়ায় বিশ্বের বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বর্তমানে পাটের ব্যাগ ব্যবহৃত হচ্ছে। এর বেশির ভাগই যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। বর্তমানে নতুন নতুন বাজারের সন্ধান মিলছে। ইউরোপের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যেও নতুন গন্তব্য শুরু হয়েছে পাটের। দেশের প্রায় চার কোটি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাটের সঙ্গে জড়িত।

২০১১ সালে ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ১৫ হাজার অংশগ্রহণকারীর হাতে যে আকর্ষণীয় ডিজাইনের পাটের ব্যাগ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোও গিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে। বিমানের ইন্টেরিয়র, গাড়ির ডেকোরেশনে ব্যবহার হচ্ছে পাট। নামি গাড়ি নির্মাতা বিএমডাব্লিউর সর্বাধুনিক ‘আই-থ্রি’ মডেলের ইলেকট্রিক গাড়ির অভ্যন্তরীণ ডেকোরেশন, বডি ও অন্যান্য উপাদান তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে পাট। সেগুলো রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া জার্মানির ফক্সওয়াগন, জাপানের টয়োটা ও নিশান গাড়ির বডি তৈরির কাঁচামাল হিসেবেও বাংলাদেশের পাটের কদর বাড়ছে। জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) কাজ করছে বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে। এর ফলে প্রায় ২০০ ধরনের পাটপণ্য তৈরি করছেন বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা।

গত পাঁচ বছরে বহুমুখী পাটপণ্যের রপ্তানি বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। ২০১২ সালে বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩৭০ কোটি টাকার। ২০১৬ সালে তা হয়েছে ৭০০ কোটি টাকার। ২০১৭ সালে এ অঙ্কটা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৯৮ কোটি টাকায়।

দেশে পাটবীজের ৯০ শতাংশ আমদানি নির্ভরতা কমানো প্রসঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাজমুল হক কালের কণ্ঠকে জানান, এ লক্ষ্যে বিনা মূল্যে কৃষকদের পাটের বীজ সরবরাহ ও তাদের উৎপাদিত পাটবীজ উচ্চমূল্যে ক্রয় করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় যাতে অর্থ বরাদ্দ দেয় সে জন্য কাজ করছে সরকার।

সূত্র জানায়, সরকার ১৭টি পণ্যে পাটের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন করায় দেশেও পাটের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ খাতে নতুন-নতুন শিল্প হচ্ছে। অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের ন্যায় পাট খাতও যাতে ২ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পায় সে জন্য রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আদলে দশ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘উদ্যোক্তারা কাঁচাপাট কিনে পণ্য উৎপাদন করে রপ্তানি করেন। রপ্তানিপণ্য হওয়ার পরও কাঁচামাল আমদানি করতে হয় না বলে ইডিএফ থেকে ঋণ সহায়তা পান না তাঁরা।’


মন্তব্য