kalerkantho


আলোচনায় নসরুল হামিদ ও গয়েশ্বর

হায়দার আলী ও আলতাফ হোসেন মিন্টু    

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আলোচনায় নসরুল হামিদ ও গয়েশ্বর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে সারা দেশে বড় দুই দলের নেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও ভিন্ন চিত্র দেখা যায় ঢাকা-৩ আসনে। কেরানীগঞ্জ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটি নিয়ে গঠিত এই আসনে দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দুই নেতা ছাড়া আর কারো নাম নেই আলোচনায়। তাঁদের পক্ষে ভোটের বেশ আগে থেকেই প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে দুই দলের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন বর্তমান সংসদ সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু।

অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তবে মামলার কারণে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে বিকল্প কী হবে সেটিও বিএনপি ভেবে রেখেছে বলে দলের স্থানীয় নেতারা দাবি করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের অন্যান্য এলাকার মতো রাজনৈতিক সংঘাত নেই ঢাকা-৩ আসনে। নসরুল হামিদ বিপুর কঠোর অবস্থানের কারণে বিএনপি নেতাকর্মীরাও নির্বিঘ্নে শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ পাচ্ছেন।

একসময় কেরানীগঞ্জ উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে ছিল একটি আসন। এই আসনটিকে মানুষ জানত বিএনপি নেতা আমানউল্লাহ আমানের ঘাঁটি হিসেবে। আমান এই আসনে চারবার নির্বাচন করে বিজয়ী হন। কিন্তু ২০০৮ সালে আসনের পাঁচটি ইউনিয়ন জিনজিরা, আগানগর, শুভাঢ্যা, তেঘরিয়া ও কোণ্ডা নিয়ে গঠন করা হয় ঢাকা-৩ আসন। আর উপজেলার বাকি সাতটি ইউনিয়ন, সাভার ও ঢাকার কামরাঙ্গীর চরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয় ঢাকা-২ আসন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা-৩ আসন থেকে বিএনপির গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে বিপুল ভোটে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন নসরুল হামিদ বিপু। ২০১৪ সালেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন তিনি। সেই সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টানা দুই মেয়াদে এমপি নির্বাচিত হয়ে বিপু এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নকাজ করেছেন। একসময়ের সমস্যাজর্জরিত কেরানীগঞ্জ এখন উন্নয়নের মডেল। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছে, নসরুল হামিদ বিপুর আবার দলীয় মনোনয়ন পাওয়া এবং ‘হ্যাটট্রিক বিজয়’ সময়ের ব্যাপার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে এরই মধ্যে এলাকার প্রতিটি ইউনিয়নে দলের প্রস্তুতি কমিটি করা হয়েছে।

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এখন কারাগারে। তাঁর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারসহ দলীয় কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন তাঁর পুত্রবধূ ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি নিপুণ রায় চৌধুরী। কিন্তু নানা কারণে দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা হতাশ। অনেকে এরই মধ্যে এমপি বিপুর হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন।

নসরুল হামিদ বিপু একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা প্রয়াত হামিদুর রহমান ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ। রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন বিপুর মা হাসনা হামিদও। তাঁদের অনুপ্রেরণায় বিপুর রাজনীতিতে হাতেখড়ি। তিনি স্থানীয় ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদ, পরে কেরানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক-আহ্বায়ক, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং বিগত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ছিলেন।

জিনজিরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাকুর হোসেন সাকু বলেন, ‘নেতা হিসেবে যেমন সফল, তেমনি একজন সৎ মানুষ হিসেবেও বিপু ভাইকে জানে কেরানীগঞ্জের মানুষ। প্রতিমন্ত্রী হয়েও এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট থাকেন। আগামী নির্বাচনে বিপু ভাইয়ের হ্যাটট্রিক বিজয় দেখার অপেক্ষায় আছি।’

উপজেলা যুবলীগের এক নেতা বলেন, চার বছরে অভাবনীয় উন্নয়নের মাধ্যমে কেরানীগঞ্জের সার্বিক চেহারাই পাল্টে দিয়েছেন নসরুল হামিদ বিপু। বিদ্যুৎ সেক্টরে নজিরবিহীন উন্নয়নসহ সার্বিক ক্ষেত্রে বদলে গেছে কেরানীগঞ্জ।

তেঘরিয়া ইউপি চেয়ারম্যান হাজি মো. জজ মিয়া বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। সমাপ্ত হয়েছে অধ্যাপক হামিদুর রহমান স্টেডিয়ামের কাজ। শুরু হয়েছে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কার্যক্রম। এডুকেশন ভিলেজের কাজ এগিয়ে চলছে। প্রক্রিয়াধীন রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। এ ছাড়া রাস্তাঘাট ও স্কুল-কলেজের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। চলছে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক চার লেনের কাজ। এলাকার উন্নয়নের জন্যই মানুষ আবারও বিপু ভাইকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে।’

কোণ্ডা ইউপি চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের অলিগলিসহ সকল রাস্তাঘাট সংস্কার, নতুন রাস্তা নির্মাণ, স্যুয়ারেজ লাইন এবং স্কুল-কলেজে ব্যাপক উন্নয়নকাজ হয়েছে।’

আগানগর ইউপি চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর শাহ খুশী বলেন, বুড়িগঙ্গার তীরে ফুটপাত নির্মাণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বৃক্ষরোপণ, বাঁশপট্টি এলাকায় বিদ্যুতের সাবস্টেশন স্থাপন, দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু টোলমুক্তকরণ, কদমতলী-খালপাড় রোড নির্মাণসহ উন্নয়নের জোয়ার বইছে। এই উন্নয়ন ধরে রাখতে বিপু ভাইকেই ভোট দেবে মানুষ।’

জিনজিরা ইউনিয়নে দলের নির্বাচন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক হাজি মোস্তাক আহমেদ বলেন, “কেরানীগঞ্জ ছিল একসময় ‘বাতির নিচে অন্ধকার’। এখন কেরানীগঞ্জের যেদিকে তাকাবেন সেদিকেই আলো। আমাদের প্রিয় নেতা নসরুল হামিদ বিপুর নেতৃত্বে আগামীতে কেরানীগঞ্জে বিদ্যুতের তার চলে যাবে মাটির নিচে।”

আগানগর ইউনিয়নে দলীয় নির্বাচন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসরারুল হাসান আশু বলেন, ‘আগানগর ইউনিয়নসহ পুরো কেরানীগঞ্জের এমন কোনো ইউনিয়ন নাই যেখানে নসরুল হামিদ বিপুর উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। প্রাইমারি স্কুল, হাই স্কুল, কলেজ, মসজিদ-মাদরাসায় নতুন নতুন ভবন তৈরি করা হয়েছে। ল্যাপটপ-কম্পিউটার ও আসবাবপত্র দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়নের একমাত্র আমবাগিচা খেলার মাঠটি তিনি নিজ উদ্যোগে বরাদ্দ দিয়ে খেলার উপযোগী করে তুলেছেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা চিন্তা করে প্রতিটি ইউনিয়নে দিয়েছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং ময়লা ফেলার গাড়ি ও ভ্যান। জনসাধারণের হাঁটার জন্য সংস্কার করেছেন আগানগর ব্রিজ রোডের দুই পাশ। বিপু ভাইয়ের নির্দেশেই আগানগর ইউনিয়নের প্রতিটি অলিগলি পাকা হয়েছে। হয়েছে আগানগর-শুভাঢ্যা খালের ব্যাপক উন্নয়ন।’

শুভাঢ্যা ইউনিয়নে নির্বাচন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক, ইউপি চেয়ারম্যান ও ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘এই ইউনিয়নসহ কেরানীগঞ্জের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে নসরুল হামিদ বিপুর উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে নাই। লোকজন যাতে বাড়িঘরের ময়লা যেখানে-সেখানে ফেলে পরিবেশ নষ্ট না করে সে জন্য বিপু ভাই মাথায় নিয়েছেন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ তৈরির প্ল্যান। প্রতিটি ইউনিয়নের বাড়ি বাড়ি থেকে ময়লা টানার জন্য ভ্যান ও ডাম্পিং স্টেশন থেকে ময়লা নেওয়ার জন্য গাড়ি দিয়েছেন। বিপু ভাই কেরানীগঞ্জের মা-মাটি-মানুষের সাথে মিশে গেছেন।’

এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। জিনজিরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হাজি ওমর শাহনেওয়াজ বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির একক প্রার্থী গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। যদি কোনো কারণে গয়েশ্বর দাদা নির্বাচন করতে না পারেন তাহলে আমাদের আরো দুজন প্রার্থী রয়েছেন যা এখন প্রকাশ করা যাবে না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চেয়ে কঠোর পুলিশ। পুলিশের কারণে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পারছি না।’

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুযাদ্দে আলী বাবু বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে দল অংশ নিলে ঢাকা-৩ আসনে আমাদের একক প্রার্থী সবার প্রিয় গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। নির্বাচন ঘিরে আমরা জিনজিরা, আগানগর, কোণ্ডা ও তেঘরিয়ায় রেখেছি একটি করে কমিটি। শুধু শুভাঢ্যা ইউনিয়নকে তিন ভাগ করে তিনটি কমিটি করা হয়েছে। অবাধ, সুষুম ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আমরা কেরানীগঞ্জের এই আসনটি পুরুদ্ধার করতে পারব।’

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একসময় কেরানীগঞ্জকে মানুষ সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে চিনত। প্রতিদিনই উপজেলার কোথাও না কোথাও মার্ডার, ছিনতাই, অপহরণ, ধর্ষণ চলত। আতঙ্কের মধ্যে এখানকার মানুষ বসবাস করত। ঢাকার উপকণ্ঠে কেরানীগঞ্জ, কিন্তু বিদ্যুৎ ছিল না, অবকাঠামো ছিল খুবই দুর্বল। ২০০৮ সালে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করি কেরানীগঞ্জকে। উপজেলার প্রতিটি মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্কুলের ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। উপজেলায় বিদ্যুৎ বলতে কিছু ছিল না, বিদ্যুৎ নিয়ে কানামাছি খেলা চলত। এখন বিদ্যুতের সমস্যা চিরতরে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসের জনপদ এখন উন্নয়ন আর সমৃদ্ধির জনপদে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে যদি সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় না দেওয়া হয় তাহলে কোনো দিন সন্ত্রাস হবে না। বিগত দিনে বিএনপি-জামায়াত প্রশ্রয় দিয়েছিল, কিন্তু সেটা এখন বন্ধ হয়েছে। ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ চাঁদাবাজি এবং অপহরণ থেকে মুক্তি পেয়েছে। এলাকার রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। পরিকল্পিত নগরী করতে যা যা করা দরকার সবই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক কাজ এগিয়ে চলছে। আশা করছি আগামী নির্বাচনে মানুষ এলাকার শান্তি ও উন্নয়ন দেখেই নৌকা মার্কায় ভোট দেবে।’

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কারাগারে থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলা যায়নি। তাঁর পুত্রবধূ কেরানীগঞ্জ উপজেলা দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি নিপুণ রায় চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।



মন্তব্য