kalerkantho


সাধারণের প্রত্যাশার খোঁজে সরকার

আবুল কাশেম ও মোশতাক আহমদ   

৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সাধারণের প্রত্যাশার খোঁজে সরকার

সারা দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে শহুরে ধনী এলাকার মানুষের ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা জানতে চায় সরকার। সাধারণ মানুষের অতীতে প্রত্যাশা কী ছিল, এখন তারা কী চায়—সে বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ করছে সরকার। দেশের প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ মানুষ নিজ নিজ এলাকার ও সমগ্র দেশে কোন ধরনের উন্নয়ন চায়, উন্নয়নে কোন কোন বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব চায়, তার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে পাঠাতে দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে (ডিসি) নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

জনসাধারণের প্রত্যাশা জানার পর সেসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে আগামী দিনে উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করবে সরকার। প্রতিটি জেলার মানুষ নিজ জেলায় কোন ধরনের উন্নয়ন চায়, প্রতিটি সংসদীয় আসনের মানুষ ওই আসন এলাকার জন্য কোন ধরনের উন্নয়ন চায়, সেগুলো আলাদাভাবে পুনর্বিন্যাস করবে সরকার। একই সঙ্গে সুশাসন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সার্বিক বিষয়েও জনগণের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্য থেকেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনার সঙ্গে একটি প্রশ্নমালাও পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সভার আয়োজন করে এলাকা সম্পর্কে ধারণা রাখেন ও উন্নয়নের জন্য ভাবেন এমন ব্যক্তিদের অভিমত ওই প্রশ্নমালার মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠভাবে সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। সংগ্রহ করা তথ্য পর্যালোচনা করে জেলা ও সংসদীয় আসন অনুযায়ী বিন্যাস করার পর পুনরায় সভা করে জনগণের মাঝে সরকারের নেওয়া কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে বলা হয়েছে। এই কর্মকাণ্ডে জেলা প্রশাসক ইউনিয়ন পর্যায়ে সংযুক্ত কর্মকর্তাসহ তৃণমূল পর্যায়ের যেকোনো সরকারি কর্মকর্তার সহায়তা নিতে পারবেন।

এ প্রসঙ্গে নজিবুর রহমান বলেছেন, ‘এর মাধ্যমে আগামী দিনে সব স্থানে জনমানুষের চাহিদা অনুযায়ী উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে মনোযোগ বেড়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, মেট্রো রেল প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ বৃহৎ অবকাঠামো খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়েও সব মানুষের মাঝে উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছে দিতে তাদের মতামত ও প্রত্যাশা জানার জন্য সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।

আগামী জানুয়ারি মাসে বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হবে। তার আগে ডিসেম্বর মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনের আগে আগামী জুনে মাসে শেষ জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এতকাল ধরে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাজেটে তার জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় সাধারণ জনগণ ও তাদের ভোটে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও সংসদ সদস্যদেরও কোনো ভূমিকা থাকে না। আমলারা ঢাকায় বসে প্রকল্প প্রণয়ন করেন। ফলে অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না। জনপ্রতিনিধিদের খুশি করার জন্য কিছু প্রকল্প নেওয়া হলেও তাতে জনপ্রত্যাশা পূরণ হয় না। এ অবস্থায় সরকার আগামী দিনে জেলা ও সংসদীয় আসনভিত্তিক উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। এ জন্যই তথ্য সংগ্রহের পর জেলা ও প্রতিটি সংসদীয় আসনভিত্তিক প্রকাশনা, থিম সং, টিভিসি, তথ্যচিত্র ও পোস্টার প্রকাশেও ডিসিদের অনুরোধ জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

আগামী ১ মার্চের মধ্যে ওয়ার্ড পর্যায়ে ও ২০ মার্চের মধ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে সভা করে জনগণের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জেলা ও সংসদীয় আসনভিত্তিক বিন্যাসের পর তা পরিবেশন উপযোগী করে ৩১ মার্চের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।

চিঠিতে নজিবুর রহমান বলেছেন, ‘বিগত ৯ বছরে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের (উন্নয়নশীল) দেশে উন্নীত হয়েছে। শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা। এ সময় প্রায় সব আর্থ-সামাজিক নির্দেশকে (সূচকে) বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। বাংলাদেশ সারা বিশ্বের কাছে রোল মডেল। বদলে যাওয়া বাংলাদেশের মূল শক্তি ও প্রেরণা এ দেশের জনগণ। তাই বর্তমান সরকার জনগণকে আরো সম্পৃক্ত করে উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে চায়। সে লক্ষ্যে প্রতিটি ওয়ার্ডের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা সম্পর্কে তথ্য চেয়ে একটি প্রশ্নমালা প্রস্তুত করা হয়েছে।’

এতে আরো বলা হয়েছে, ‘কোনো দেশের সুশাসন এবং উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি ওই দেশের জনগণ। সুশাসন সরকার ও জনগণের পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ভিতকে সুদৃঢ় করে। দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সবার জন্য সুষম উন্নয়ন করা সরকারের দায়িত্ব। পক্ষান্তরে জনকল্যাণে গৃহীত কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, মতামত প্রদান করা নাগরিক অধিকার। জনগণকে আস্থায় নিয়ে তাদের প্রয়োজনের নিরিখে কল্যাণমূলক কার্যক্রম গ্রহণ ও তার সুফল জনগণকে জানানোর মাধ্যমে এ অধিকার রক্ষা করা সম্ভব।’

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়া গত সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উন্নয়ন নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত সংগ্রহ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চিঠি পেয়েছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে সভা আয়োজন করতে সহকারী জেলা প্রশাসককে (শিক্ষা ও আইটি) দায়িত্ব দিয়েছি। তিনি উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেবেন। সেখানে সরকারের কাছ থেকে জনগণ কোন ধরনের উন্নয়ন ও সেবা প্রত্যাশা করে তা জানার পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হবে।’

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তৃণমূলের মানুষের মতামত ও প্রত্যাশা জানার নির্দেশনাসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চিঠি পেয়েছি। ওয়ার্ড ও ইউনিয়নগুলোতে সভা আয়োজনে সহকারী জেলা প্রশাসককে (সার্বিক) দায়িত্ব দিয়েছি। এসব সভায় আমি নিজেও উপস্থিত থাকার চেষ্টা করব।’



মন্তব্য