kalerkantho


সওজে লাগামহীন দুর্নীতি

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে দুদকের ২১ সুপারিশ

হায়দার আলী   

৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে দুদকের ২১ সুপারিশ

সারা দেশে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের অধীনে প্রতিদিনই চলছে সড়ক নির্মাণ ও মেরামতের কাজ। এসব কাজে অধিকাংশ জায়গায়ই চলে কোটি কোটি কিংবা হাজার কোটি টাকার অনিয়ম আর দুর্নীতি। সওজের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে প্রভাবশালী ঠিকাদাররা হাতিয়ে নিচ্ছেন সরকারি অর্থ, বিনিময়ে কর্মকর্তারা নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের উেকাচ। এ ছাড়া স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন না করা, কাজ পেতে ঠিকাদারদের প্রকাশ্য সিন্ডিকেট পদ্ধতি, উেকাচের বিনিময়ে কাজের মান ঠিক না রাখা, কাজ ফেলে রাখা, উদ্দেশ্যমূলক ডিজাইন পরিবর্তন, বেনামে সরকারি প্রকৌশলীদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, ভুয়া বিল-ভাউচার, উদ্দেশ্যমূলক অতিরিক্ত প্রাক্কলনসহ বহুবিধ উপায়ে চলছে সরকারের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কাজ।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সওজ-সংক্রান্ত একটি প্রাতিষ্ঠানিক টিমের প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। এ অবস্থায় সওজে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে ২১ দফা সুপারিশ পাঠিয়েছে দুুদক। গতকাল রবিবার সকালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে বলে দুদক সূত্র কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছে।

দুদক সচিব ড. মো. শামসুল আরেফিনের সই করা চিঠিটি গতকাল রবিবার মন্ত্রিপরিষদসচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে উল্লেখিত সুপারিশের আলোকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। দুদকের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের সদস্যরা দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে দুর্নীতি প্রতিরোধে ২১ দফা সুপারিশ করেন।

দুদক টিম দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখতে পায়, কিছু ক্ষেত্রে নির্মাণকাজের ব্যয় নির্ধারণ ও ডিজাইন প্রণয়নই দুর্নীতির অন্যতম একটি উৎস। অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি চলছে। বিশেষ করে টেন্ডারের তথ্য ফাঁস, নেগোসিয়েশনের নামে অনৈতিকভাবে বিশেষ সুবিধা নিয়ে সাপোর্টিং বা এজেন্ট ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া, বারবার নির্মাণকাজের ডিজাইন পরিবর্তন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, টেন্ডারের শর্তানুসারে কাজ বুঝে না নেওয়া, কোনা কোনো ক্ষেত্রে মেরামত বা সংস্কারকাজের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে বেনামে অথবা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ পরিচালনাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ এবং ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর অনৈতিক সুবিধা লাভের ক্ষেত্রে দুর্নীতির উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে দুদক।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো ওই প্রতিবেদনে দুর্নীতির উৎস হিসেবে আরো কিছু বিষয় তুলে আনা হয়েছে। দেখা গেছে, টোল আদায়যোগ্য যেসব ব্র্রিজ বা সেতু রয়েছে সেগুলোর ইজারা, সড়ক নির্মাণে মাটির কাজসহ নানা কাজ রয়েছে। সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে কাজের গুণগতমান এবং পরিমাণ বজায় না রাখার মাধ্যমেও লাভবান হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা। এমনকি সড়কের পুরুত্বের (Thickness) পরিমাণ টেন্ডারের স্পেসিফিকেশনের চেয়ে কম থাকা। নির্ধারিত টাইম ফ্রেমের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে প্রকল্প মূল্য এবং সময় বৃদ্ধি করে দুর্নীতির পথকে প্রশস্ত করা হয়।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আইন, বিধি, পরিচালন পদ্ধতি, সরকারি অর্থ ব্যয়ের দিকগুলো পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে ওই প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা, প্রতিবন্ধকতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সুপারিশমালা তৈরির জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করে দুদক। এই প্রাতিষ্ঠানিক টিম সরেজমিনে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন এবং গোয়েন্দা টিমের প্রাপ্ত তথ্য প্রমাণাদি, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, অধিদপ্তরের বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা, গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের  দুর্নীতির উৎসগুলো তুলে আনা হয়েছে।

২১ দফা সুপারিশ  :

(১.) ব্যবহৃত ইট বা খোয়ার মান সঠিকভাবে নির্ণয় করতে হবে। পরবর্তীকালে তা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে মাণের ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করলেই এই প্রবণতা বন্ধ হতে পারে।

(২) নিম্নমাণের উপকরণ ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণের কারণে সড়ক বাঁচাতে কংক্রিটের সড়ক নির্মাণের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন।

(৩) অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের মাঠপর্যায়ে পদায়ন না করে স্বচ্ছতার সঙ্গে যোগ্য ও সাহসী কর্মকর্তাদের পদায়ন করা।

(৪) জেলা পর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী অথবা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের সরাসরি দায়িত্বে না রেখে সুপারভাইজিং ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা তৃতীয় পক্ষের দ্বারা ফাইনাল মেজারমেন্ট গ্রহণ করা।

(৫) সড়ক নির্মাণে মাটি ভরাট অনিয়ম-দুর্নীতির আরেকটি উৎস, যা বর্ষাকালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এসব কাজে মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব মনিটরিং টুলস অথবা দুদকের সহযোগিতা গ্রহণ করতে পারে।

(৬) প্রকল্প বাস্তবায়ন, নির্মাণ, সংস্কার, বা মেরামতকাজ শেষে পরবর্তী একটি যৌক্তিক সময় পর্যন্ত উক্ত কাজের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিজ খরচে বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আইনানুগভাবে অর্পণ করা করা।

(৭) সওজে ই-জিপি টেন্ডারপ্রক্রিয়ার সার্বিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ঠিকাদারদের নিবন্ধন ও সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন ও ওয়েবসাইটসহ সর্বমহলে প্রচারের ব্যবস্থা করা।

(৮) ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত বিল প্রদানের পূর্বে কাজের মান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট এলাকার নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মতামত (সামাজিক নিরীক্ষা) গ্রহণ করা।

(৯) প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের সময় সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এলাকাভিত্তিক টিম গঠন করা।

(১০) যেসব প্রকৌশলী প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করবেন, তাঁরা বাস্তবায়ন কাজে জড়িত হতে পারবেন না। আউটসোর্সিয়ের মাধ্যমেও চূড়ান্ত প্রাক্কালন তৈরি করা যেতে পারে।

(১১) মহাসড়কে ওভারলোডিং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের কাজ ওভারলোডিংয়ের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন প্রকৌশলী ও ঠিকাদাররা।

(১২) নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটালে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

(১৩) টোল আদায়ের ক্ষেত্রে আধুনিক ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে দূরে বসে টোল আদায় কার্যক্রম কম্পিউটার মনিটরে পর্যবেক্ষণ করা যায়।

(১৪) নির্ধারিত টাইম ফ্রেমের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা এবং যৌক্তিক কারণ ব্যতিরেকে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি না করার বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।


মন্তব্য