kalerkantho


সুবর্ণ জয়ন্তী

বাকৃবিতে মৎস্যবিদদের মিলনমেলা

আবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি   

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বাকৃবিতে মৎস্যবিদদের মিলনমেলা

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের সুবর্ণ জয়ন্তীতে শোভাযাত্রা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, স্মৃতির রোমন্থন, বর্ণিল সাজসজ্জা—প্রিয় বিদ্যাপীঠে আত্মহারা প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। গতকাল শনিবার ছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের সুবর্ণ জয়ন্তীর উৎসব। ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আত্ম উজাড় করা শিক্ষার্থীরা যেন ফিরে পায় ক্যাম্পাসজীবনের সেই প্রাণবন্ত দিনগুলো। উৎসব হয়ে ওঠে আঁটসাঁট অপরূপ বন্ধন।

উপমহাদেশের প্রথম উচ্চতর মৎস্য শিক্ষা ও গবেষণা খ্যাত এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সকাল থেকে হাজির হয় ক্যাম্পাসে। গতকাল সকাল ১০টার দিকে অনুষদের সামনে থেকে বের হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এরপর অনুষদের মাঠে তৈরি প্যান্ডেলে শুরু হয় সুবর্ণ জয়ন্তীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। শুরুতেই মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ৫০ বছরের গবেষণা, সাফল্য এবং অর্জন তুলে ধরে একটি প্রামাণ্যচিত্র উপস্থাপন করা হয়।

১৯৬৭ সালে যাত্রা শুরু করে অনুষদটি। ৫০ বছর ধরে গবেষণার ক্ষেত্রে অসাধারণ সফলতার সাক্ষ্য বহন করে আসছে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদটি। এ কারণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্যবিদ ও ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান বলেন, ‘বাকৃবির মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ দেশের মৎস্যবিজ্ঞানীদের আঁতুড়ঘর। দেশের মৎস্য সেক্টরে যত অবদান এর প্রায় সব কিছুরই দাবিদার এ অনুষদ।’

সুবর্ণ জয়ন্তীতে অংশ নিয়েছেন দেশ-বিদেশের মৎস্য সেক্টরের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব, মহাপরিচালকসহ অন্যান্য পলিসি মেকাররা। এ ছাড়া অংশ নিয়েছে আন্তর্জাতিক, বহুজাতিক সংস্থা, দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও কম্পানির প্রতিনিধি, ব্যক্তি উদ্যোক্তা, মৎস্য চাষি ও হ্যাচারির মালিক, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ প্রায় দুই হাজার প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী। তিন দিনব্যাপী এ আয়োজন আজ রবিবার শেষ হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. গিয়াস উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রধান পৃষ্ঠপোষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলী আকবর ও বাকৃবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্বাহী সভাপতি ড. মো. কবীর ইকরামুল হক, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জসিমউদ্দিন খান।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা আলী রেজা হোসেন।

অনুষদের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিউটের পরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, ‘দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও রপ্তানি আয়ে মৎস্য খাতের অবদান আজ সর্বজন স্বীকৃত। আমাদের জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩.৬১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২৮.৪১ শতাংশ। প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে। দেশের ১৪ লাখ নারীসহ প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে। এ খাতে প্রতিবছর ছয় লক্ষাধিক লোকের নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে। অনুষদটির কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।’

প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমানে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুস সালাম সাগর বলেন, ‘সুবর্ণ জয়ন্তী তথা মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। অনুষ্ঠানে এসে বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী, শিক্ষক, সিনিয়র-জুনিয়রদের সঙ্গে মিলিত হতে পেরে মনে হচ্ছে ফিরে গেছি ক্যাম্পাসজীবনের সেই প্রাণবন্ত দিনগুলোতে।’

বর্তমান শিক্ষার্থী শাহীন সরদার বলেন, মৎস্য সেক্টরের বিপুল উত্পাদনের জন্য পৃথিবীতে মুক্ত জলাশয় ও চাষভিত্তিক মৎস্য উত্পাদনে বাংলাদেশ আজ পঞ্চম, যা সম্ভব হয়েছে এ অনুষদের কল্যাণেই। অ্যালামনাই না হয়েও আমাদের সুযোগ দেওয়ায় আমরা অনেক ভাগ্যবান। কারণ আমাদের বড় ভাই-বোনরা কর্মরত, ক্যাম্পাসে তাঁদের পদচারণ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে।

জানা গেছে, বিগত ৫০ বছরে অনুষদের শিক্ষক ও গবেষকরা বাইম, মাগুর, শিং, তারা বাইম, গুচি বাইম, বাটা মাছের কৃত্রিম প্রজননসহ ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ পদ্ধতি, একসঙ্গে মাছ ও সবজি চাষের আধুনিক পদ্ধতি, স্বল্প খরচে বরফ ব্লক রিং টানেল পদ্ধতিতে শুঁটকি, খাঁচায় পাঙ্গাশ মাছের চাষ, ডাকউইড দিয়ে মিশ্র মাছ চাষ, মাছের বিষ্ঠা দিয়ে সবজি চাষ, মাছের জীবন্ত খাদ্য হিসেবে টিউবিফেক্স (এক ধরনের কীট) উত্পাদনের কলাকৌশল, ইলিশ মাছ আরহণের পর মানসম্মত উপায়ে বাজারজাতকরণ, দেশি পাঙ্গাশের কৃত্রিম প্রজনন, মাছের পোনা চাষের জন্য রটিফারের চাষ, কুঁচে মাছের কৃত্রিম চাষ পদ্ধতি আবিষ্কার, খাঁচায় দেশি কই মাছ চাষ পদ্ধতি এবং ইলিশ মাছের স্যুপ এবং নুডলস উদ্ভাবন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের জিন টেকনোলজি, মৎস্য জীব ও শারীরতত্ত্ব, মৎস্য চাষ, মৎস্য পুষ্টি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ও মাটির ভৌত রসায়ন, মৎস্য আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ গবেষণাগারগুলো এরই মধ্যে বিশ্বমানে উন্নীত হয়েছে।



মন্তব্য