kalerkantho


একাধিক হেভিওয়েট নেতা বড় দুই দলেই কোন্দল

মো. মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ   

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



একাধিক হেভিওয়েট নেতা বড় দুই দলেই কোন্দল

মুন্সীগঞ্জ-১ (শ্রীনগর-সিরাজদিখান) আসনটি একসময় বিএনপির দুর্গ বলে পরিচিত হলেও এখন আওয়ামী লীগের আধিপত্য। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য এখানে মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক হেভিওয়েট নেতা থাকায় বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে রয়েছে দলীয় কোন্দল। এ কারণে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে গণসংযোগ ও প্রচার চালাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। বিকল্পধারার অবস্থান অনেকটা নিজ ভূমে পরবাসীর মতো। আর জাতীয় পার্টি নিষ্ক্রিয়।

আওয়ামী লীগ : এ আসনের সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা গোলাম সারোয়ার কবীর গ্রুপের মধ্যে গত বছর মার্চে সংঘর্ষ হয়। এর দুই দিন পর এক সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষকে ঢাকায় নেওয়া হয়। সেই থেকে তিনি আর খুব একটা এলাকায় আসেননি। সর্বশেষ গত ২৮ জানুয়ারি জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিসভায় ছিলেন তিনি।

এমপির অনুপস্থিতির কারণে শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলায় তাঁর ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। তবে তারা নিজেদের মতো করে এমপির সমর্থনে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, সুকুমার রঞ্জন ঘোষ আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের টিকিট নিয়েই এলাকায় ফিরবেন।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এমপির অনুপস্থিতিতে তাঁর কিছু নেতাকর্মী এরই মধ্যে নিজেদের পছন্দের অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীর সমর্থনে প্রচারে যোগ দিয়েছে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগের চেষ্টা করে এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষের ফোন বন্ধ পাওয়ায় কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর এপিএস হাজি নেছারউল্লাহ সুজন জানিয়েছেন, সুকুমার রঞ্জন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থতার কারণে তিনি এলাকায় আসতে পারেননি। এখন তিনি মোটামুটি সুস্থ। শিগগির তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবেন।

এদিকে এমপির অবর্তমানে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে প্রচার চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাবেক স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. বদিউজ্জামান ভূইয়া ডাবলু, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি গোলাম সারোয়ার কবীর, সিরাজদিখান উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ।

এঁদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই প্রচার চালাচ্ছেন গোলাম সারোয়ার কবীর। তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করতে পেরেছেন বলে মানছে এলাকার তরুণরা। সপ্তাহের দুই-তিন দিন তিনি এখন এলাকায় জনসংযোগে ব্যস্ত থাকেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গোলাম সারোয়ার কবীর বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি করে চলেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন পূরণে জনগণের সাথে কাজ করছি। শ্রীনগর-সিরাজদিখানে আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছি। মনোনয়ন পেলে অবশ্যই পাস করব।’

আর মো. মহিউদ্দিন আহম্মেদ সিরাজদিখান উপজেলার দুই-দুইবারের চেয়ারম্যান। এর আগে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন একাধিকবার। সেই সুবাদে এলাকায় তাঁরও নেতাকর্মী-সমর্থক রয়েছে অনেক। তিনিই এখন প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কথা বলে তাঁর নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করছেন।

মহিউদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২৫ বছর ধরে সিরাজদিখান উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিচ্ছি। গত ৪৬ বছরে সিরাজদিখান থেকে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী দেওয়া হয়নি। তাই আমি এবার দল থেকে মনোনয়ন চাচ্ছি। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি আসনটি দলকে বিজয়ী হিসেবে উপহার দিতে পারব।’

ডা. বদিউজ্জামান ডাবলুও মনোনয়ন পেতে গত রমজান থেকে এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে অবশ্য তাঁকে এলাকায় তেমন একটা দেখা যায়নি।

ডা. বদিউজ্জামান বলেন, ‘এলাকায় দেখা যায়নি কথাটা ঠিক নয়। এলাকার বিভিন্ন সামাজিক কাজে আমার উপস্থিতি ছিল। দলের মধ্যে কোনো বিভাজন সৃষ্টি করতে চাইনি বলেই এলাকার রাজনীতিতে কখনো হস্তক্ষেপ করিনি। কেন্দ্রীয়ভাবেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম। তবে এখন এলাকার রাজনীতিতে একটা শূন্যতা বিরাজ করছে। এই শূন্যতা আমি পূরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে।’

এদিকে মনোনয়ন চাইবেন বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক নুরুল ইসলাম চৌধুরী। বারবার দলের কাছে মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আসেননি। এলাকাবাসীর কাছে সুস্থ ধারার রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের এই নেতার গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও এলাকায় না আসার কারণে নেতাকর্মীরা দূরে চলে যাচ্ছে। তবে তাঁর অনুসারীরা বলছে, এবার তিনি মনোনয়ন নিয়েই এলাকার ফিরবেন।

বিএনপি : আসনটি পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা করলেও বিএনপি নেতাকর্মীরা হতাশায় ভুগছে। দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব-কোন্দল থাকার কারণে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা সরাসরি মাঠে নেই। তবে তাঁদের অনুসারীরা ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কোন্দলের কারণে দলীয় কোনো অনুষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে একেক নেতার নামে হচ্ছে।

দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন, শ্রীনগর উপজেলা চেয়ারম্যান মমীন আলী, ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মো. ফরহাদ হোসেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর শরাফত আলী সপু, সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আল মুসলিম গ্রুপের কর্ণধার শেখ মো. আব্দুল্লাহ। তবে শ্রীনগর-সিরাজদিখান উপজেলা বিএনপির সাবেক ও বর্তমান কমিটির মধ্যে দ্বন্দ্ব যে রূপ নিয়েছে তার নিরসন হবে কি না তা নিয়ে তৃণমূল যথেষ্ট সন্দিহান।

এর আগে শাহ মোয়াজ্জেম শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকলেও এখন তিনি সুস্থ আছেন এবং নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে এলাকার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ খুব কম থাকায় নেতাকর্মীরা থাকছে দূরে দূরে।

এ প্রসঙ্গে শাহ মোয়াজ্জেমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তাঁঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সঙ্গী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘মোয়াজ্জেম সাহেবের দাঁত ওঠানোর কারণে তিনি কথা বলেতে পারছেন না।’ তিনি জানান, আমার ভোট আমি দেব—যাকে খুশি তাকে দেব—দেশে এ রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে। আর বিএনপি নির্বাচনে গেলে শাহ মোয়াজ্জেমও নির্বাচন করবেন। এলাকায় তিনি কম গেলেও নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। দীর্ঘ ৬৫ বছরের রজনীতিতে এলাকায় তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। তাই বিষয়টি নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই।

শ্রীনগর উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা মমীন আলীও সম্ভাব্য প্রার্থী হতে এলাকায় প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপি থেকে যখন বি চৌধুরী চলে যান তখন দলের দুঃসময়ে মমীন আলী স্থানীয় বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি উপজেলা নির্বাচনে জয়ী হন। দল তাঁকে মনোনয়ন দেবে বলে তাঁর নেতাকর্মীরা আশা প্রকাশ করে।

মমীন আলী সম্পর্কে জেলা কমিটির অনুমোদনে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দাবিকারী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘২০০৮ সালের পর শাহ মোয়াজ্জেমকে একবারও এলাকায় দেখিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে। মমীন আলীর প্রতি ভোটারদের আস্থা রয়েছে। হাইকমান্ড তাঁকে মনোনয়ন দেবে বলে আমরা আশাবাদী।’

মমীন আলী বলেন, ‘বিএনপির দুঃসময়ে দলের হাল ধরেছি। আওয়ামী লীগের নির্যাতনের সময়ে হয়েছি উপজেলা চেয়ারম্যান। জনগণ আমার পাশে আছে। মনোনয়ন পেলে অবশ্যই পাস করে আসনটি দলকে উপহার দিতে পারব।’

ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মো. ফরহাদ হোসেনও মনোনয়ন পেতে এলাকায় সভা-সমাবেশ করে চলেছেন। সাবেক এই ছাত্রনেতার একটা ইমেজ রয়েছে ছাত্রদলসহ তরুণদের কাছে। একসময়ের এই ছাত্রনেতা তারেক রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছেন। তিনি আশাবাদী এবার দলের মনোনয়ন পাবেন।

ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আমি ছাত্র রাজনীতি থেকে দলের মধ্যে আমার অবস্থান তৈরি করেছি। গতবারও দলনেত্রী খালেদা জিয়া আমাকে কথা দিয়েছেন আগামীতে আমাকে দলীয় মনোনয়ন দেবেন।’

শেখ মো. আব্দুল্লাহ এবারও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, এবার তিনি মনোনয়ন পেতে সক্ষম হবেন। সরাসরি তারেক জিয়ার সঙ্গে তাঁর সখ্য থাকায় অনেকেই বিশ্বাস করে এবার তিনি নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে পারেন।

শেখ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বিএনপির দুঃসময়ে দলের হাল ধরে রেখেছি। এলাকার আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছি। তারেক রহমানের দোয়া রয়েছে আমার সাথে। দলীয় বিবেচনায় আমি মনোনয়ন পেলে এ আসনটি এবার বিএনপিকে বিজয়ী হিসেবে উপহার দিতে পারব।’

বিকল্প ধারা : বিএনপির ব্যানারে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বর্তমান বিকল্প ধারা বাংলাদেশের সভাপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর (বি চৌধুরী) প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শ্রীনগরের দয়াহাটা মজিদপুরে তাঁর বাড়ি। তবে এলাকার সঙ্গে এখন তেমন একটা যোগাযোগ নেই তাঁর। খুব কমই আসেন এলাকায়।

আর বদরুদ্দোজা চৌধুরী দলীয় মনোনয়ন না নিলে আসনটিতে তাঁর ছেলে সাবেক এমপি মাহী বি. চৌধুরীও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। তবে মাহীর অবস্থাও বাবার মতো। তাঁকেও এলাকায় তেমন দেখা যায় না।

এ প্রসঙ্গে বি. চৌধুরীর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

জাতীয় পার্টি : জাতীয় পার্টির হয়ে এই আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যক্তিগত আইনজীবী ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ মো. সিরাজুল ইসলাম।

তবে শেষ মুহূর্তে জোটের কারণে পাল্টে যেতে পারে হিসাব-নিকাশ। বিকল্প ধারা যদি আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি যেকোনো একটির সঙ্গে যোগ দেয় সে ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী এই আসনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ভোটের রাজনীতি।

 


মন্তব্য