kalerkantho


বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস আজ

যেকোনো দরকারে কোপ বনের জমিতে হুমকিতে বন্য প্রাণী

বনের চার লাখ ২৮ হাজার ৫৫ একর জমি হাতছাড়া

আরিফুর রহমান   

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



যেকোনো দরকারে কোপ বনের জমিতে হুমকিতে বন্য প্রাণী

সুন্দরবনে অস্তিত্ব হুমকিতে বাংলার অহংকার রয়েল বেঙ্গল টাইগার

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারে থাকার ব্যবস্থা করতে গিয়ে বন বিভাগের প্রায় পাঁচ হাজার একর জমি বেদখল হয়ে গেছে, যা পুরোটাই হাতির বিচরণক্ষেত্র ছিল। বন বিভাগের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যানেই এ তথ্য জানা গেছে।

শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, দেশের যেকোনো জায়গায় রাস্তা ও রেললাইন নির্মাণ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন কিংবা শিল্পাঞ্চলের জন্য জমি প্রয়োজন হলেও কোপ পড়ছে বনের জমির ওপর। ড্রেন কিংবা স্থাপনা তৈরিতেও বেহাত হচ্ছে বনভূমি।

এভাবেই বছরের পর বছর ধরে বেহাত হচ্ছে বনভূমি। প্রতিনিয়ত বনের জমি দখল হয়ে যাওয়ায় হুমকিতে পড়ছে হাতিসহ অসংখ্য বন্য প্রাণী। এই পরিস্থিতির মধ্যেই আজ দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বণ্য প্রাণী দিবস। ‘বাঘ গোত্রীয় প্রাণীরা আজ বিপদাপন্ন/এদের রক্ষায় এগিয়ে আসুন’—এই প্রতিপাদ্যে এবার দিবসটি উপলক্ষে নানা আয়োজন করা হয়েছে।

বনভূমি উজাড় হওয়ার প্রেক্ষাপটে জীববৈচিত্র্য ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের কাছে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এ এস এম ফেরদৌস স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়েছে, ‘দোহাজারি হতে রামু হয়ে কক্সবাজার দিয়ে মিয়ানমার সীমান্তে ঘুনধুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণে এখন পর্যন্ত বনের ১৬৫ একর জমি নিয়ে গেছে রেলওয়ে; যার পুরোটাই হাতির বিচরণ এলাকা। এখন বলা হচ্ছে, বনের আরো জমি লাগবে। এতে করে জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে।’ ওই রেললাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হলে প্রতিনিয়তই হাতি দুর্ঘটনার কবলে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বন্য প্রাণী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা পাভেল পার্থ কালের কণ্ঠকে জানান, সুন্দরবনের ভেতরে শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবে যাওয়ার পর থেকে তাঁরা দেখেছেন, সেখানে বন্য প্রাণী ভোঁদড়ের সংখ্যা কমে গেছে। তাঁর মতে, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে আসায় তারা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান সুন্দরবনে এক দশক আগেও বাঘের সংখ্যা ছিল ৪০০। বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সোয়া ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনে এখন বাঘের সংখ্যা কমে এসে ঠেকেছে ১০৬-এ।

আয়তনের দিক থেকে সুন্দরবনের পরেই হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বনের অবস্থান। সত্তরের দশকে রেমা-কালেঙ্গা বনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি ছিল। সেই বনে এখন বাঘের অস্তিত্ব নেই।

এ ছাড়া জীবন-জীবিকার তাগিদে মৌলভীবাজারের লাউড়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষ শূকর, হরিণসহ নানা ধরনের বন্য প্রাণী শিকার করছে।

টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য এখন হুমকিতে। সেখানে নির্বিচারে গাছ কাটছে প্রভাবশালীরা। খাদ্যসংকটের কারণে বন্য প্রাণী ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে।

এভাবে বন উজাড় হচ্ছে। গাছ কাটা পড়ছে নির্বিচারে। মানুষের মধ্যে বন্য প্রাণীর প্রতি হিংস্রতা বাড়ছে। এসব কারণে হুমকিতে পড়েছে বন্য প্রাণী।

এমন বাস্তবতায় আজ সারা বিশ্বে একসঙ্গে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস। ২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৩ মার্চকে বন্য প্রাণী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০১৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম এ দিবসটি পালন করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

দিবসটি উপলক্ষে আজ এক সেমিনারের আয়োজন করেছে বন বিভাগ। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন ভবনে আয়োজিত সেমিনারে থাকবেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, পরিবেশ সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী, প্রধান বন সংরক্ষক সফিউল আলম চৌধুরী। সেমিনারে মোট চারটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে।

বন্য প্রাণী শাখার বন সংরক্ষক জাহিদুল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো ‘বন্য প্রাণী সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণের জন্য বিশ্ববাসীকে সোচ্চার করে তোলা। তিনি বলেন, সারা বিশ্বে বন উজাড় ও শিকারের কারণে বাঘ এক মহাবিপন্ন প্রজাতি চিহ্নিত হয়েছে। এখন মাত্র ১৩টি দেশে বাঘের অস্তিত্ব দেখা যায়। অবৈধ শিকার ও আবাসস্থল কমে যাওয়ায় বন্য প্রাণী সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়ে গেছে।

বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য বলছে, স্থাপনা নির্মাণ কিংবা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এখন পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে এক লাখ ৫৯ হাজার ৭৯০ একর জমি। এর বাইরে জবরদখলকৃত বনভূমির পরিমাণ দুই লাখ ৬৮ হাজার ২৬৫ একর। সব মিলিয়ে বন বিভাগের চার লাখ ২৮ হাজার ৫৫ একর জমি হাতছাড়া হয়ে গেছে। বন বিভাগে এখন গেজেটভুক্ত বনভূমি আছে ৪৬ লাখ ৫২ হাজার ২৪৯ একর জমি।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি সংস্থাকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি জমি দেওয়া হয়েছে বরিশাল অঞ্চল থেকে, ৯০ হাজার একর। দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম অঞ্চল, ৩৭ হাজার একর। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ঢাকা অঞ্চল থেকে হস্তান্তর করা হয়েছে ২৭ হাজার একর জমি। রাঙামাটি অঞ্চলে দুই হাজার ৭০০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান বন সংরক্ষক সফিউল আলম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে আইন অনুসরণ করেই জমি দেওয়া হয়। আর যেসব জমি এরই মধ্যে বেহাত হয়ে গেছে, সেগুলো উদ্ধারে বন বিভাগ কাজ করছে।’


মন্তব্য