kalerkantho


আ. লীগ-বিএনপিতে শক্ত মনোনয়নপ্রার্থী একাধিক

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আ. লীগ-বিএনপিতে শক্ত মনোনয়নপ্রার্থী একাধিক

মানিকগঞ্জ-৩ আসনটি জেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকা হিসেবে বিবেচিত। সদর উপজেলার সাত ইউনিয়ন ও পৌরসভা এবং সাটুরিয়া উপজেলা নিয়ে জাতীয় সংসদের ১৭০ নম্বর এই নির্বাচনী এলাকার ভোটের পরিসংখ্যানে বিএনপি এগিয়ে আছে। তবে আসনটি বর্তমানে আওয়ামী লীগের দখলে। গুরুত্ব বিবেচনায় এখানে একাদশ সংসদ নির্বাচনেও দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থী একাধিক। তাঁদের মধ্যে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকজন শক্ত অবস্থানে আছেন। এসব নিয়ে এলাকায় আলোচনার পাশাপাশি মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কর্মকাণ্ডও বাড়ছে।

১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের পর ২০০৮ সালে আসনটি ফিরে পায় আওয়ামী লীগ। মাঝখানে ১৯৯৭ সালে একবার উপনির্বাচনসহ আটটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ছয়বার। জাতীয় পার্টির প্রার্থী জিতেছেন দুইবার।

১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে হারুনার রশিদ খান মুন্নু নির্বাচিত হন মানিকগঞ্জ-২ আসন থেকে। ২০০১ সালে তিনি মানিকগঞ্জ-৩ আসনেও জয়লাভ করেন। পরে তিনি মানিকগঞ্জ-২ আসনটি ছেড়ে দেন। ওই আসনে উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শামসুদ্দিন আহম্মেদ বিএনপির প্রার্থী জামিলুর রশিদ খানকে পরাজিত করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে হারুনার রশিদ খান মুন্নু প্রার্থী হন মানিকগঞ্জ-৩ আসনে। তাঁকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহিদ মালেক স্বপন আসনটি পুনরুদ্ধার করেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে জাহিদ মালেক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এ দফায় সরকারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।

আওয়ামী লীগ : একাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে এগিয়ে আছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তাঁর হাত ধরেই দীর্ঘদিন পর আসনটি ফিরে পেয়েছিল ক্ষমতাসীনরা। তাঁর বাবা প্রয়াত কর্নেল (অব.) এ মালেক ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, ঢাকার মেয়র ও মন্ত্রী।

জাহিদ মালেকের সময়কালে মানিকগঞ্জ কর্নেল মালেক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, ডায়াবেটিক হাসপাতাল, নার্সিং ইনস্টিটিউট, টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট, শহরে চার লেন সড়ক, জজকোর্ট ভবন, কালীগঙ্গা সেতুসহ বেশ কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে। গত ৯ বছরে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও শক্তিশালী বলয় গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছেন। জাহিদ মালেক প্রতি সপ্তাহেই এলাকায় আসেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, জাহিদ মালেকের হাত ধরে মানিকগঞ্জে যে উন্নয়ন হয়েছে তা আগে আর কখনোই হয়নি। এর জন্য তিনি প্রশংসার দাবি রাখেন। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, জাহিদ মালেকের বিকল্প এখনো গড়ে ওঠেনি এ আসনে। ব্যাপক উন্নয়নের মাধ্যমে তিনি জনগণের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বদরুল ইসলাম খান বাবলুও মনোনয়ন চাইবেন বলে কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন। ১৯৭৩ সালে এ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন তাঁর বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা মফিজুল ইসলাম খান কামাল। পরে তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে প্রথমে বাকশাল এবং পরে ড. কামাল হোসেনের গণফোরামে যোগ দেন। কিন্তু বড় ভাইকে অনুসরণ করে বদরুল ইসলাম বাবলু আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেননি, বরং দলের দুঃসময়ে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছেন। দলের প্রতি আনুগত্য এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কারণে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে মনে করেন বাবলু।

মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন লাগিয়ে প্রচারের মাধ্যমে আলোচনায় উঠে এসেছেন জেলা আওয়ামী লীগের শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক তাবারাকুল তোসাদ্দেক হোসেন খান টিটু। এলাকায় এলে তাঁকে ঘিরে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর ভিড় হয়। তরুণ এই ব্যাবসায়িক নেতা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কালের কণ্ঠকে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে তরুণদের নেতৃত্ব দিতে হবে। সেই নেতৃত্বের সুযোগ নিতেই তিনি মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান। তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে মনোনয়ন দিলে তিনিই মনোনয়ন পাবেন বলে দাবি করেন টিটু।

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আরেকজন হলেন ড. রফিকুল ইসলাম। বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) এই কর্তাব্যক্তি আমেরিকাপ্রবাসী। তিন বছর ধরে তিনি দেশে আছেন নির্বাচন সামনে রেখে। তাঁর গড়া রাবেয়া ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এরই মধ্যে এলাকায় দুস্থদের বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন তিনি।

ড. রফিকুল ইসলাম মনোনয়ন চাইবেন বলে নিশ্চিত করে জানান, বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতার সম্মতি নিয়ে তিনি মাঠে আছেন।

বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ অন্তপ্রাণ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধী অপশক্তির বিচার হয়েছে। কিন্তু এরা নানা ছদ্মবেশে এখনো সক্রিয়। এদের নির্মূল করতে হলে শেখ হাসিনার হাতে দেশের নেতৃত্ব থাকতে হবে।’ শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতেই তিনি মনোনয়ন চেয়েছেন এবং বিজয়ের ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত বলে জানান রফিকুল ইসলাম। তবে তিনি অভিযোগ করেন যে এলাকায় কাজ করতে তাঁকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগ নামধারী কয়েক সন্ত্রাসী তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে।

বিএনপি : মানিকগঞ্জ-৩ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির পরাজয়ের পেছনে দলীয় কোন্দল অন্যতম কারণ ছিল বলে দলের নেতাকর্মীরা মনে করে। ওই নির্বাচনে বিএনপি থেকে প্রার্থী হন হারুনার রশিদ মুন্নু। আর মানিকগঞ্জ-২ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাঁর মেয়ে আফরোজা খানম রিতাকে। এতে দলের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে তখন মুন্নুকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে।

হারুনার রশিদ মুন্নু মারা যাওয়ার পর তাঁর মেয়ে বর্তমানে জেলা বিএনপির সভাপতি। এখন পর্যন্ত সেই বিভেদ ঘোচেনি বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আফরোজা খানম রিতা আগামী সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে অন্যতম। সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নুর মেয়ে হিসেবে যেমন, তেমনি তিনি নিজেও এলাকায় বহুল পরিচিত। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, হারুনার রশিদ মুন্নু ও শামসুল ইসলাম খানের মতো জেলার নেতাদের মৃত্যুর পর মূলত তিনিই জেলা বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। জেলা বিএনপিতে বিভক্তি থাকলেও বেশির ভাগ নেতাকর্মী তাঁর সঙ্গেই রয়েছে বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের দাবি। তাঁদের দাবি, রিতার মনোনয়ন পাওয়া নিশ্চিত।

দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে আফরোজা খানম রিতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা। বিরূপ পরিস্থিতিতেও উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে এরই মধ্যে তিনি জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিয়েছেন। কালের কণ্ঠকে মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আতাউর রহমান আতা। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে জেলা বিএনপির কোনো কমিটিতে তাঁকে রাখা না হলেও কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা জেলার সাংগঠনিক বিষয়ে তাঁর সঙ্গেই আলোচনা করেন। তিনি বলেন, এ আসন বিএনপিকে ফিরে পেতে হলে তাঁর বিকল্প নেই।

জেলা বিএনপির সহসভাপতি জামিলুর রশিদ খানও মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জন্য সর্বমহলে তিনি সমাদৃত। সাংগঠনিক নাজুক অবস্থার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এর দায় নিতে হবে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে। তবে তিনি বলেন, সরকারের হয়রানি ও নির্যাতনমূলক আচরণের কারণে নেতাকর্মীরা মাঠে নামতে পারছে না। কিন্তু সুষ্ঠু ভোট হলে তারা ঠিকই বিএনপিকে ভোট দেবে।

জাসদ : জেলা জাসদের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল হোসেন খানও দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন। ১৪ দল জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলেও তিনি এ আসনে মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করা এই নেতা এলাকায় অত্যন্ত পরিচিত মুখ। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা ঢুকে পড়েছে। টাকা, পেশিশক্তি ব্যবহার করে রাজনীতিকে কলুষিত করছে। আগামী নির্বাচনে অরাজনৈতিকদের মাঠ ছেড়ে দেওয়া হবে না।’

অন্যান্য : ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মফিজুল ইসলাম খান কামাল। সে সময় তিনি ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। পরে তিনি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে গণফোরাম গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দলের হয়ে কেন্দ্রীয় নেতাও ছিলেন তিনি। অতি সম্প্রতি তিনি গণফোরাম থেকে পদত্যাগ করেছেন। বর্তমানে তিনি গণচেতনা নামের একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করছেন।

রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও মানিকগঞ্জ মহিলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মফিজুল ইসলাম খান কামালকে মানিকগঞ্জে দল-মত-নির্বিশেষে সবাই শ্রদ্ধা করে। সুষ্ঠু পরিবেশ থাকলে আগামী নির্বাচনে এ আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন।


মন্তব্য