kalerkantho


আ. লীগ-বিএনপিতে মনোনয়ন লড়াই

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আ. লীগ-বিএনপিতে মনোনয়ন লড়াই

মানিকগঞ্জ-২ (সিঙ্গাইর, হরিরামপুর ও সদর উপজেলার তিন ইউনিয়ন) আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি থেকে কারা মনোনয়ন পেতে পারেন সেই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে দলীয় কোন্দল রয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টিতে এ ধরনের সমস্যা নেই। মাঠে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের তৎপরতা পর্যালোচনা করে এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে মনোনয়ন নিয়ে দুই দলেই কয়েকজন নেতার মধ্যে লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

তবে জাতীয় পার্টি বলছে, নবম সংসদ নির্বাচনের মতো আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট হলে এ আসন আবার দলটিকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। এমনটি না হলেও জাতীয় পার্টি এ আসনে প্রার্থী দেবে। সে ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য একজন প্রার্থীর কথাই শোনা যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের ফলে সিঙ্গাইর ও হরিরামপুর উপজেলা এবং মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় মানিকগঞ্জ-২ আসনটি। এটি জাতীয় সংসদের ১৬৯ নম্বর নির্বাচনী এলাকা। এর আগে সিঙ্গাইর ও মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে সংসদীয় আসনটি ছিল মানিকগঞ্জ-৩। সে সময় হরিরামপুর ও শিবালয় উপজেলা নিয়ে ছিল মানিকগঞ্জ-২। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনটি নির্বাচনে বর্তমান মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন বিএনপির সাবেক শিল্পমন্ত্রী শামসুল ইসলাম খান। ২০০৬ সালে তিনি মারা গেলে উপনির্বাচনে তাঁর ছেলে বর্তমান জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাঈনুল ইসলাম খান শান্ত এই আসনে নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাঁকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। মনোনয়ন দেওয়া হয় সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নুর মেয়ে বর্তমান জেলা বিএনপির সভাপতি আফরোজা খান রিতাকে। নির্বাচনে তিনি মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির এস এম আবদুল মান্নানের কাছে হেরে যান। আওয়ামী লীগ প্রার্থী না দিয়ে জাতীয় পার্টিকে সমর্থন দেয়। ওই সংসদে কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বাঘা বাঘা প্রার্থী থাকলেও সরাসরি মনোনয়ন দেওয়া হয় তাঁকে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগ : দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মমতাজ বেগম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। সংসদ সদস্য তাঁর এলাকা সিঙ্গাইরে আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ব নিজের কবজায় নিয়ে নেন, হয়ে যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তবে তাঁর নির্বাচনী এলাকা সিঙ্গাইর ও হরিরামপুর উপজেলায় তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক ভিত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে পছন্দের লোকজন দিয়ে কমিটি করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে বাদ দেওয়া হয়েছে অনেক পুরনো ও পরীক্ষিত নেতাকে। এসব কারণে দলের একটি অংশে ক্ষোভ রয়েছে, যারা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ফুটবলার দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুলের নেতৃত্বে একটি বলয়ে জড়ো হয়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ের বেশ কিছু কমিটির নেতাও রয়েছেন তাঁর পক্ষে। প্রকাশ্যে না হলেও ভেতরে ভেতরে তাঁরা একসময়ের ফুটবল তারকা শফিউল আরেফিন টুটুলের নেতৃত্বই পছন্দ করেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিমত, এই দুই পক্ষকে একত্র করতে না পারলে আগামী নির্বাচনে আসনটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। অবশ্য মমতাজের পক্ষ এসব অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে।

রাজনীতির মাঠে না থাকলেও দশম সংসদ নির্বাচনে কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমকে সরাসরি মনোনয়ন দিয়ে চমক দেখায় আওয়ামী লীগ। তাঁর ব্যাপক পরিচিতি কাজে লাগাতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় এবং অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মমতাজ সংসদ সদস্য হয়ে যান। একাদশ সংসদ নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা আশা করছেন, তাঁকেই আবার মনোনয়ন দেওয়া হবে। সেভাবেই তিনি প্রচার চালাচ্ছেন।

তবে মনোনয়ন নিয়ে মমতাজের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছেন শফিউল আরেফিন টুটুল। মনোনয়ন পাবেন এমন আশা নিয়ে গত নির্বাচনের পর থেকেই তিনি মাঠে আছেন। নিয়মিত জনসংযোগ করছেন।

টুটুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ৯ বছরে সারা দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। মানিকগঞ্জের অন্য দুুুুটি আসনে তার প্রতিফলন হলেও এই আসনে তার ছোঁয়া লাগেনি। তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকার পাশে এই অঞ্চলটিকে উন্নতির শিখরে নেওয়ার জন্যই তিনি মনোনয়ন চাইবেন। মনোনয়ন পেলে তিনি বিজয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত করেন।

এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লড়াইয়ে আরেক বলিষ্ঠ প্রতিযোগী হলেন জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য ও জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সালাম চৌধুরী। দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ সদালাপী সালাম চৌধুরী ব্যক্তি ভাবমূর্তির কারণে নেতাকর্মীদের আপনজন হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। গত জেলা পরিষদ নির্বাচনে অনেক বাঘা বাঘা ব্যক্তিকে টপকে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন তাঁর এই গুণের কারণেই। জেলা পরিষদ সদস্য হিসেবে এবং ব্যক্তিগতভাবে দরিদ্রদের পাশে দাঁড়িয়ে ইতিমধ্যে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি করেছন। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার উন্নয়ন রোডম্যাপে শরিক হতে দলের প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যক্তিগতভাবেও কাজ করে যাচ্ছি।’ মনোনয়ন পেলে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার হাটিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ধনাঢ্য ব্যবসায়ী গোলাম মনির হোসেন। কয়েক বছর ধরে এলাকায় বিভিন্নভাবে আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছেছেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা শামসুদ্দীন আহম্মেদ, সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. আলী জিলকদ আহমেদ।

তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে সক্রিয়ভাবে মাঠে আছেন মমতাজ, টুটুল ও সালাম চৌধুরী।

বিএনপি : বর্তমানে জেলা বিএনপির সভাপতি হলেন আফরোজা খানম রিতা ও সাধারণ সম্পাদক হলেন মাঈনুল ইসলাম শান্ত। কিন্তু তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে, যার প্রভাব পড়েছে এই আসনটিতেও। এই আসনের উপজেলা দুটিতেই এখন রিতা ও শান্তর নামে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভক্ত। দুজনের সমর্থনে সিঙ্গাইর উপজেলায় রয়েছে বিএনপির দুটি পৃথক কমিটি। তবে ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো পক্ষেরই কমিটি নেই। রিতা সমর্থিত সিঙ্গাইর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মতিউর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবিদুর রহমান রোমান।

রোমান নিজেদের কমিটিকে বৈধ উল্লেখ করে বলেন, বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এক ব্যক্তি দুই পদে থাকতে পারেন না। তাই জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হয়ে মাঈনুল ইসলাম শান্ত উপজেলা কমিটির সভাপতি হতে পারেন না। তিনি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মাঈনুল ইসলাম শান্তর বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে বলেন, তাঁর সঙ্গে কর্মীদের কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন না। তাঁর বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতারও অভিযোগ আনেন রোমান।

এসব অভিযোগের বিষয়ে মাঈনুল ইসলাম শান্তর বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মাঈনুল ইসলাম শান্তর কথা। তাঁর বাবা প্রয়াত শামসুল ইসলাম খান এ আসনে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার সরকারে শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। তাঁর সময় এলাকার রাস্তাঘাটের উন্নয়নের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এই জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে এবং তাঁর প্রতি সম্মান দেখিয়ে ছেলে মাঈনুল ইসলাম শান্তকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে।

তবে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী সিঙ্গাইর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবিদুর রহমান রোমান বলেন, শান্তকে মনোনয়ন দিলে এই আসনে বিএনপির ভরাডুবি নিশ্চিত। নিজেকে এই আসনের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী দাবি করে তিনি বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে এলাকার উন্নয়ন ও জনসম্পৃক্ততার কারণে তিনি আসনটি পুনরুদ্ধার করতে পারবেন। রোমান বলেন, ‘ছাত্র অবস্থা থেকে জিয়াউর রহমানের আদর্শে দীক্ষিত হয়ে রাজনীতি করে আসছি। কোনো সময় বিচ্যুত হইনি। দল নিশ্চয় এর মূল্যায়ন করবে।’

এ ছাড়া এ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি আফরোজা খানম রিতা মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।

জাতীয় পার্টি : ২০০৮ সালে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে বিএনপি প্রার্থী আফরোজা খানম রিতাকে পরাজিত করে এই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম আবদুল মান্নান। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনে তাঁকে আর মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এবার তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়ন চাইবেন বলে নিশ্চিত করেছেন। আবদুল মান্নান বলেন, দলের সিদ্ধান্তে গত নির্বাচনে সরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এবার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশে তিনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। মহাজোটগতভাবে নির্বাচন হলেও এই আসনে তাঁর মনোনয়ন নিশ্চিত বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, মহাজোটগতভাবে তাঁকে মনোনয়ন দিলে তাঁর বিজয় নিশ্চিত।

অন্যান্য : ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন গোলাম সারোয়ার মিলন। তিনি একাদশ সংসদ নির্বাচন করবেন বলে নিশ্চিত করেছেন। একসময়ের সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ছাত্রনেতা হিসেবে এলাকায় রয়েছে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা। তবে তিনি বর্তমানে কোনো দলের সঙ্গে জড়িত নন। তিনি বলেন, বড় কোনো দলের টিকিট না পেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন।


মন্তব্য