kalerkantho


পাথরকোয়ারিতে শ্রমিকের মৃত্যু

নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট

সিলেট অফিস   

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট

গত দুই বছরে সিলেটের পাথর কোয়ারিগুলোতে টাস্কফোর্স শতাধিক অভিযান চালায়। ধ্বংস করা হয় অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত অসংখ্য বোমা মেশিন। এসব অভিযানের পরও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন ও শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা। পাথর তুলতে গিয়ে মাটিচাপা পড়ে গত ১৪ মাসে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৮ জন শ্রমিক। এর মধ্যে ২০১৭ সালে মারা গেছেন ৩৪ জন। চলতি বছরের দুই মাসে প্রাণ হারিয়েছেন ২৪ জন শ্রমিক। 

অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ না হওয়া এবং শ্রমিক মৃত্যুর পেছনে অনেক কারণ জড়িত। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা, সমন্বিত উদ্যোগের অভাব, ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড় ও টিলা কেটে পাথর উত্তোলন। পরিবেশবাদীদের মতে, অঢেল অর্থের ছড়াছড়ি, অর্থের কাছে প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের বিক্রি হয়ে যাওয়া, পরিবেশ অধিদপ্তরের দুর্বল কার্যক্রম এবং পাথর কোয়ারিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটগুলোর কারণে এত প্রাণহানির পরও থামানো যাচ্ছে না অবৈধ উপায়ে পাথর উত্তোলন। তাঁদের পরামর্শ, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সরাসরি মনিটরিং, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে উচ্চ আদালত সিলেটের জাফলং, বিছনাকান্দি, ভোলাগঞ্জ, শাহ আরফিন টিলাসহ সব পাথর কোয়ারি থেকে বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এ ছাড়া পরিবেশ ধ্বংস ও শ্রমিকদের প্রাণহানির কথা বিবেচনায় রেখে ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করে জাফলংকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে পাথর উত্তোলনসহ সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। কিন্তু আদালত ও সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। ফলে পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে মাটিচাপা পড়ে প্রায়ই শ্রমিক মারা পড়ছে।

গত রবিবার রাতে জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে পাথর কোয়ারিতে মাটিচাপায় পাঁচ শ্রমিক মারা যান। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে গত বুধবার বিকেলে একই উপজেলার শাহ আরেফিন টিলায় মারা যান আরো তিন শ্রমিক।

গত বছরের ২৩ জানুয়ারি আরেফিন টিলা পাথর কোয়ারিতে মাটিচাপায় পাঁচ শ্রমিক মারা যান। দুর্ঘটনার পর এঁদের লাশ গুম করে ফেলা হয়। পরে পুলিশ ওই লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহেদুল ইসলাম। কমিটি তদন্ত করে ৪৭ জন পাথরখেকোকে চিহ্নিত করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার জন্য পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা হয়।

অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ এবং শ্রমিক মৃত্যু ঠেকাতে তদন্ত প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে চিহ্নিত ৪৭ পাথরখেকোর বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, শাহ আরেফিন টিলায় টাস্কফোর্সের অভিযান জোরদার করা ও একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন, তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, সুবিধাভোগী সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ, উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং কমিটি গঠন এবং অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারী প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিষয়ে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো।

কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনের বেশির ভাগ সুপারিশই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

শুধু শাহ আরেফিন টিলা নয়, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি, গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং, জৈন্তাপুর উপজেলার শ্রীপুর ও কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়ার বিভিন্ন কোয়ারি ও টিলা থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এর সঙ্গে সরকারি দলের নেতাদের সংশ্লিষ্টতা থাকায় পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও তা সহজেই ধামাচাপা দিয়ে দেয় সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সম্পৃক্ততার কারণে পাথরখোকোদের দমন করা যাচ্ছে না। কিছুদিন আগে এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইমরান আহমদের সঙ্গে পাথরখেকো শামীম আহমদের ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সংসদ সদস্যরা যখন পাথরখেকো কিংবা অপরাধীদের সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা করেন তখন সেটি অন্য বার্তা দেয় প্রশাসনকে। প্রশাসন তখন খেলো হয়ে যায়।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আখতার বলেন, ‘যেসব জায়গা থেকে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে তার সব কিন্তু পাথর কোয়ারি না। টিলা সমতল ভূমি থেকেও পাথর তোলা হচ্ছে। তাই কোয়ারি বললে বৈধতা পেয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে।’

এত অভিযানের পরও অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন জানতে চাইলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবুল লাইছ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাথর উত্তোলন বন্ধে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এমনকি শাহ আরেফিন টিলায় প্রবেশের পথ পিলার তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, বিভিন্ন বাড়ির ভেতর দিয়ে রাস্তা তৈরি করে আবার পাথর তোলা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘জনগণের মধ্যে সচেতনতা না বাড়লে এটি বন্ধ করা যাবে না। কারণ উপজেলার বেশির ভাগ মানুষই এর সঙ্গে জড়িত।’


মন্তব্য