kalerkantho

ভাঙল মিলনমেলা

নওশাদ জামিল   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ভাঙল মিলনমেলা

গতকাল শেষ দিনেও অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ছিল উপচে পড়া ভিড়। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভাষাশহীদদের নিবেদিত অমর একুশে গ্রন্থমেলার মাসব্যাপী আয়োজন শেষ হয়ে গেল। একই সঙ্গে শুরু হলো প্রতীক্ষার—আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের। অন্যান্য দিনের মতো গতকাল বুধবারও যেন বর্ণিল রূপ নিয়েছিল মেলাঙ্গন। গ্রন্থমেলার শেষ দিনে বিকেল ৩টায় খুলে দেওয়া হয় মেলার দুই অঙ্গন বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রবেশদ্বার। বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যা নামতেই যেন রাঙা হয়ে ওঠে মেলা। পাঠকে পাঠকে ছেয়ে যায় মেলার দুই প্রান্তর। আর সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বই কেনা মানুষের জনজোয়ারে উত্তাল ছিল মেলাঙ্গন। সব মিলিয়ে বলা যায়, এবারের আয়োজনটি ছিল নান্দনিক। আর এর মধ্য দিয়েই ভাঙল বইকেন্দ্রিক লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের অনন্য মিলনমেলা।

সমাপনী দিনটিতে একটা ‘নেই’ ‘নেই’ অনুভূতিও হয়েছে বইপ্রেমীদের মনে। কী যেন হারিয়ে গেল! আহা, আর দু-দশটা দিন যদি পাওয়া যেত! এই বইটা কেনা হয়নি। ওই স্টলটায় যাওয়া হয়নি। এমন কত আক্ষেপ! প্রত্যাশাও ছিল। ভবিষ্যতে আরো সুন্দর, আরো সফল মেলা আয়োজনের প্রত্যাশায় শেষ হলো এবারের আয়োজন।

শেষ দিনের মেলাঙ্গনে দর্শনার্থীর চেয়ে বইপ্রেমীর সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। শিশু-কিশোর থেকে সব বয়সী পাঠকের ভিড় ছিল প্রতিটি প্রকাশনা সংস্থার স্টলে। বিক্রয়কর্মীরাও তত্পর থেকেছেন পাঠকের হাতে তার পছন্দের বইটি তুলে দিতে। ফলে শেষ দিনে জ্ঞান ও প্রাণের এই সর্বজনীন মেলা হয়ে ওঠে মুখরিত। সময় যত গড়াচ্ছিল, পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল ক্রেতা-পাঠক। শেষ দিন হওয়ায় তাড়াহুড়াটা ছিল লক্ষ করার মতো। পছন্দের বইটি চোখের সামনে পড়লেই হলো, সঙ্গে সঙ্গে কিনে নিয়েছে বইপ্রেমীরা। সে সুবাদে শেষ দিনে বিক্রি হয়েছে প্রচুর বই। 

শেষ দিনে মেলায় এসেছিলেন অনেক লেখক। এসেছিলেন অনেক প্রকাশকও। কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনকে দেখা গেল অনন্যার প্যাভিলিয়নে অটোগ্রাফ দিতে। কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস, জাকির তালুকদার মেতে উঠেছিলেন পাঠকদের সঙ্গে আড্ডা, আলোচনায়। সব মিলিয়ে লেখকরাও দিনটিতে পার করেছেন ব্যস্ত সময়। প্রকাশকরাও ছিলেন ফুরফুরে মেজাজে। পাঞ্জেরী পাবলিকেশনসের অন্যতম পরিচালক কামরুল হাসান শায়ক বলেন, ‘স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ বইমেলা হয়েছে এবার। আমরা পাঠকদের ভালোবাসায় ধন্য, আপ্লুত।’

সমাপনী অনুষ্ঠান : গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮’-এর সদস্যসচিব ড. জালাল আহমেদ। প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিসচিব ইব্রাহীম হোসেন খান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তটি যে সঠিক ছিল তা এবারের মেলায়ও প্রমাণিত হয়েছে। এ বছরের ভুলত্রুটিগুলো হয়তো আগামী মেলায় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।’

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা স্তরে বাংলায় পাঠ্যপুস্তক কম প্রকাশিত হয়। এ ধরনের বই আরো প্রকাশিত হওয়া জরুরি। এবারের গ্রন্থমেলায় শিশু ও অভিভাবকসহ বিপুল দর্শনার্থীর আগমন ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়।’

প্রতিবেদন উপস্থাপন করে ড. জালাল আহমেদ বলেন, ‘২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলা একাডেমি মোট এক কোটি ৫১ লাখ ২৪ হাজার টাকার বই বিক্রি করেছে। এদিন পর্যন্ত স্টল মালিকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং আজকের (গতকাল) সম্ভাব্য বিক্রি যুক্ত করলে বলা যায় যে এবার বইমেলায় মোট ৭০ কোটি ৫০ লাখ টাকার বই বিক্রি হয়েছে।’

বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার বই বিক্রি হয়েছিল, যা ছিল তার আগের বছরের চেয়ে ২৩ কোটি টাকা বেশি। এবারের আয়োজনে বিক্রির পরিমাণ গত বছরের চেয়ে পাঁচ কোটি টাকারও বেশি।

গতকাল মেলায় নতুন বই এসেছে ২৫৫টি। এবারের পুরো মেলায় ২৮ দিনে নতুন বই এসেছে চার হাজার ৫৯১টি, যা গতবারের চেয়ে ৯৪৫টি বেশি। গতবারের মেলায় বই প্রকাশিত হয়েছিল তিন হাজার ৬৪৬টি। এবারের মেলায় প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে ৪৮৮টিকে ‘মানসম্পন্ন’ মনে করছে বাংলা একাডেমি।

এবার নতুন বইয়ের মধ্যে কবিতার বইয়ের সংখ্যা বেশি, এক হাজার ৪৭২টি। এর পরই রয়েছে গল্প ও উপন্যাসের স্থান। গল্পের বই ৭০১টি ও উপন্যাস ৬৪৩টি। মননশীল বইয়ের মধ্যে প্রবন্ধ ২৫৭, গবেষণা ১২২, জীবনীগ্রন্থ ১০৭, রচনাবলি ১৫, নাটক ২৩, ভ্রমণবিষয়ক ৯১, ইতিহাসের ১১০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই প্রকাশিত হয়েছে ৯১টি। এ ছাড়া বিজ্ঞানবিষয়ক ৭৬, রাজনীতি ২২, চিকিত্সা/স্বাস্থ্য ৩৩, রম্য ও ধাঁধা ২১, ধর্মীয় ২৬, অনুবাদ ৪৮, শিশুতোষ ১২৫, ছড়ার বই ১১২, সায়েন্স ফিকশন ও গোয়েন্দাবিষয়ক ৬৫, অভিধানবিষয়ক সাতটি বই এসেছে। অন্যান্য বিষয়ে এসেছে ৪২৪টি বই।

গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার ঘোষণা : একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চারটি গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয় গতকাল। ২০১৭ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিকসংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রথমা প্রকাশনকে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার, ২০১৭ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য অলকানন্দা প্যাটেল রচিত ‘পৃথিবীর পথে হেঁটে’ গ্রন্থের জন্য বেঙ্গল পাবলিকেশনস, সুফি মুস্তাফিজুর রহমান রচিত ‘বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক উত্তরাধিকার’ গ্রন্থের জন্য জার্নিম্যান বুকস, মঈন আহমেদ সম্পাদিত ‘মিনি বিশ্বকোষ পাখি’ গ্রন্থের জন্য সময় প্রকাশনকে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার, ২০১৭ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণমান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য চন্দ্রাবতী একাডেমিকে রোকনুুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার এবং ২০১৮ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কথাপ্রকাশকে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রকাশককে ২৫ হাজার টাকার চেক, সনদ ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।



মন্তব্য