kalerkantho


প্রধান আসামিকে বাঁচাতে তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য!

তিতুমীর কলেজছাত্র পলাশ হত্যাকাণ্ড

আশরাফ উল আলম   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



প্রধান আসামিকে বাঁচাতে তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য!

ফাইল ছবি

তিতুমীর কলেজের ছাত্র হাছিবুর রহমান পলাশ হত্যা মামলার প্রধান আসামিকে বাঁচাতে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন মামলার এক তদন্ত কর্মকর্তা। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এ বিচারাধীন এই মামলায় গত ১৩ জানুয়ারি সাক্ষ্য দেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক স ম কাইয়ুম।

পলাশকে ছুরি মেরে যে হত্যা করেছে তার নামও পলাশ। আসামি পলাশ সম্পর্কে আদালতে ওই তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, আদালতে উপস্থিত পলাশ আসামি পলাশ নয়। একই নামে দুজন থাকায় ভুলক্রমে আসামি পলাশের পরিবর্তে এই পলাশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

তবে স্থানীয় সূত্র জানায়, যে এলাকায় ঘটনা ঘটেছে ওই এলাকায় পলাশ শেখ নামে দুজন নেই। আর মামলার নথিতে দেখা যায়, চার্জশিটে ওই পলাশকেই আসামি করা হয়েছে। এই তদন্ত কর্মকর্তাই আসামি গ্রেপ্তার করে যে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন, তাতে উল্লেখ আছে, এই পলাশই হাছিবুর রহমান পলাশ হত্যার সঙ্গে জড়িত। মামলার নথিতে আরো দেখা যায়, আসামিপক্ষ আদালতে কখনোই দাবি করেনি যে প্রকৃত পলাশকে বাদ দিয়ে তাদের পলাশকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।

আইনজীবীরা জানান, তদন্ত কর্মকর্তা নিজ থেকে জবানবন্দি দিয়ে কোনো আসামি সম্পর্কে বলতে পারেন না যে প্রকৃত আসামিকে বাদ দিয়ে অন্য ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

ঢাকার আদালতে ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ আহমেদ গাজী কালের কণ্ঠকে বলেন, ঘটনা তদন্ত করে সাক্ষীদের জাবনবন্দি নিয়ে এই মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এক মামলায় অনেক সময় একাধিক তদন্ত কর্মকর্তা থাকেন; কিন্তু কোনো তদন্ত কর্মকর্তাই আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় জবানবন্দিতে বলতে পারেন না, চার্জশিটভুক্ত কোনো আসামি হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়। তাকে ভুলক্রমে জড়ানো হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তার এ ধরনের সাক্ষ্য নজিরবিহীন।

আরেক ফৌজদারি আইনজীবী সঞ্জীব চন্দ্র দাস বলেন, স ম কাইয়ুম প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা। তিনি তদন্ত করার সময় আসামি পলাশ শেখকে গ্রেপ্তার করেছিলেন; কিন্তু যখন তিনি তদন্তভার অন্য কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করেন তখন তিনি ভুলের কথা নোট দিয়ে জানাননি কেন? এখন আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় এমন কথা বলার অর্থই হচ্ছে তিনি ওই আসামিকে রক্ষা করতে প্রভাবিত হয়েছেন।

২০১১ সালের ২৫ জুন সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় বাড্ডা থানার সাতারকুল রোডে টালিথা স্কুলের সামনে দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিতুমীর কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হাছিবুর রহমান পলাশ। এ সময় ৮-১০ জন দুর্বৃত্ত তাঁর ওপর হামলা চালায়। চারদিক ঘিরে চায়নিজ কুড়াল ও ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি তাঁর শরীরে আঘাত করে দুর্বৃত্তরা চলে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন হাছিবুরকে হাসপাতালে নেওয়ার দুই দিন পর তিনি মারা যান।

এ ঘটনায় হাছিবুরের বাবা আতাউর রহমান বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্তকালে এলাকার বখাটে মো. বাদশাকে গ্রেপ্তার করলে সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে অন্য আসামিদের নাম জানিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে। ঘটনাটি সিআইডি ও ডিবি দুই দফা তদন্ত করে। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১ জুন চার্জশিট দেওয়া হয়। চার্জশিটে মো. বাদশা, আশরাফুল ইসলাম কাজল, তানভির হোসেন, মো. পলাশ শেখ, মো. রাশেদুল ওরফে রাসেল ও ওয়াসিম ইসলামকে আসামি করা হয়।

এই মামলার আসামি বাদশা ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় ২০১১ সালের ২৬ জুলাই। জবানবন্দিতে সে জানায়, আসামিরা সবাই পলাশকে ঘিরে ধরে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকলে একপর্যায়ে আসামি পলাশ শেখ পাশের দেয়ালের সঙ্গে থাকা সাইনবোর্ডের ভেতর থেকে একটি ছুরি বের করে পলাশকে আঘাত করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয় লোকজন হাছিবুরকে হাসপাতালে ভর্তি করলে দুই দিন পর তিনি মারা যান।

২০১৫ সালের ২৫ আগস্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। ইতিমধ্যে মামলার বাদীসহ ১১ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। সর্বশেষ গত ১৩ জানুয়ারি মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার তৎকালীন এসআই স ম কাইয়ুম সাক্ষ্য দেন। বর্তমানে তিনি ডিবিতে পুলিশ পরিদর্শক পদে কর্মরত।

সাক্ষ্যে যা বলেছেন তদন্ত কর্মকর্তা

পুলিশ পরিদর্শক কাইয়ুম আদালতে বলেছেন, তিনি বাড্ডা থানায় কর্মরত থাকাকালে ঘটনার পরই তদন্তভার গ্রহণ করে বাদশা নামের এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেন। বাদশা আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়। বাদশার স্বীকারোক্তি অনুসারে আসামি তানভির আহমেদ টিটু ও পলাশ শেখকে গ্রেপ্তার করেন।

সাক্ষ্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, আসামি পলাশ শেখ নামে যাকে তিনি গ্রেপ্তার করেছেন তাকে ভুলবশত গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খুনি পলাশ শেখের বাড়ি ও এই পলাশ শেখের বাড়ি একই এলাকায় এবং দুজনের বাবার নামই নয়ন শেখ। এ কারণে গ্রেপ্তারে ভুল হয়েছে। আদালতে উপস্থিত পলাশ শেখ প্রকৃত পলাশ শেখ নয়।

পলাশ শেখ নামে অন্য কেউ নেই

যে পলাশ শেখকে চার্জশিটভুক্ত করা হয়েছে সেই পলাশ শেখের বর্তমান ঠিকানা উত্তর বাড্ডার ভাওয়ালিয়াপাড়া। তার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর সদরের ঝালকাঠি। মামলার বাদী আতাউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উভয় ঠিকানায় খবর নিয়ে জানা গেছে, পলাশ শেখ নামে অন্য কোনো ব্যক্তি নেই। তদন্ত কর্মকর্তাও সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বলেছেন, দুই পলাশ শেখের বাবার নাম নয়ন শেখ। এ রকম দুজন নয়ন শেখও ওই এলাকায় নেই। আমার ছেলের হত্যাকারীকে বাঁচাতে তদন্ত কর্মকর্তা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন। আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’


মন্তব্য