kalerkantho


অভিজিৎ হত্যার ৩ বছর

১১ খুনির ৩ জন গ্রেপ্তার ৪ জনের পরিচয় অজানা

এস এম আজাদ   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



১১ খুনির ৩ জন গ্রেপ্তার ৪ জনের পরিচয় অজানা

বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে হত্যার তিন বছরেও খুনিদের সবার পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা। তদন্তে উঠে আসা ১১ হত্যাকারীর মধ্যে মাত্র তিনজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে একজন। পলাতক বাকি সাতজনের মধ্যে তিনজনের প্রকৃত পরিচয় জানার দাবি করছেন তদন্তকারীরা।

এমন পরিস্থিতিতে আজ সোমবার অভিজিৎ রায় হত্যার তিন বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে বের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা পার হওয়ার সময় তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে জঙ্গিরা। তাঁর সঙ্গে থাকা স্ত্রী ড. রাফিদা আহমেদ বন্যাও হামলায় মারাত্মক আহত হন। অভিজিৎ ও বন্যা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ায় সে দেশের সংস্থা এফবিআই হত্যার তদন্তে সহায়তা করছে। সংস্থাটির প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। ১৩টি আলামত পরীক্ষা করে রিপোর্টও দিয়েছে এফবিআই।  

দুই বছর মামলাটির তদন্তভার ছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে। গত বছর কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কাছে তদন্তভার স্থানান্তর করা হয়। সিটিটিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শিগগিরই অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের প্রস্তুতি নিয়েছেন তাঁরা। ছদ্মনামে পলাতক খুনিদের ‘অজ্ঞাতপরিচয় রেখে’ এবং সবার ভূমিকা উল্লেখ করে চার্জশিট দেওয়া হবে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথম দুই বছরে উগ্রপন্থী ব্লগার ফারাবীসহ সন্দেহভাজন আটজনকে গ্রেপ্তার করেছিল ডিবি, সিআইডি ও র‌্যাব। তবে তদন্তে তাদের কারো সম্পৃক্ততা এখনো মেলেনি।

অভিজিৎ হত্যা মামলার অগ্রগতি নিয়ে গতকাল রবিবার সাংবাদিকদের এক অনানুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডে জিয়াউল (সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত মেজর) সরাসরি সম্পৃক্ত। ঘটনার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। তিনি গ্রেপ্তার না হলেও বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করার মতো তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে। কয়েক মাস আগেও তিনি দেশে ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে সক্রিয় না থাকায় তিনি কোথায় আছেন এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।’ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী জিয়াউলসহ পাঁচজনকে খুঁজছি আমরা। এই পাঁচজনের মধ্যে দুই-তিনজনকে ধরতে পারলে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে।’ অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, ‘তিন বছরের তদন্ত ধীরগতিতে চলছে। আমরা চাই দ্রুত মামলার তদন্ত শেষ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।’

সূত্র জানায়, অভিজিৎ হত্যায় আনসার আল ইসলামের ১১ সদস্য জড়িত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তবে পূর্ণ নাম- ঠিকানা পাওয়া গেছে সাতজনের। অভিজিৎ হত্যার পর ওই বছরেরই ৭ আগস্ট ব্লগার নীলাদ্রি নিলয় এবং ৩১ অক্টোবর প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকেও হত্যা করে জঙ্গিরা। গত বছর মাঈনুল ইসলাম শামীম ওরফে সিফাত, আবদুস সামাদ ওরফে আবদুস সবুর ও খায়রুল ইসলাম নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। দীপন খুনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ওই তিনজন অভিজিৎ হত্যার ব্যাপারেও তথ্য দেয়। এরই মধ্যে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে ডিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন মুকুল রানা ওরফে শরিফুল। তিনি অভিজিৎ খুনে সরাসরি অংশ নেন বলেও জানা যায়। সাকিব (ছদ্মনাম) নামে একজনের ব্যাপারে জানা যায়, তিনি অভিজিৎ, দীপন ও নীলাদ্রি—তিন হত্যাকাণ্ডেই জড়িত ছিলেন। গত ৫ নভেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে সেই সাকিবকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। একটি বেসরকারি বিশ্বিবিদ্যালয়ের এমবিএর ছাত্র আবু সিদ্দিক সোহেলই ছদ্মনামের সাকিব। গত ১৭ নভেম্বর গ্রেপ্তার করা হয় সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের ছাত্র মোজাম্মেল হোসেনকে, যার সাংগঠনিক নাম সায়মন। ২৪ নভেম্বর আরাফাত ওরফে সাজ্জাদ ওরফে শামসকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। এই তিনজন অভিজিৎ খুনের মামলায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তিন আসামির মধ্যে সোহেলের জবানবন্দি থেকে জিয়াসহ ছয় জঙ্গির পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। সোহেলদের বাড়ি লালমনিরহাটের আদিতমারীতে। তিনি বিয়ে করেছেন মোজাম্মেল হোসেনের বোনকে। তিতুমীর কলেজে বিবিএ শেষে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করার পাশাপাশি তুরাগের বাউনিয়ায় থেকে ব্যবসা করতেন সোহেল। মোজাম্মেল ওরফে সায়মনের ল্যাপটপ থেকে তাঁদের টার্গেটে থাকা ব্যক্তিদের তালিকা পাওয়া যায়। গ্রেপ্তার হওয়া অপর জঙ্গি আরাফাত ঢাকা কলেজে পড়তেন, তবে পড়ালেখা শেষ করেননি। তিনি চাপাতি নিয়ে ঘটনাস্থলের পাশে ছিলেন। অন্যরা ব্যর্থ হলে তাঁর আক্রমণ করার নির্দেশ ছিল।

আসামিরা জবানবন্দিতে জানান, অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের সিদ্ধান্ত হয় ২০১৪ সালের মাঝামাঝি। হত্যার জন্য আটজনের দুটি দল গঠন করেছিল আনসার আল ইসলামের জঙ্গিরা। চারজন ছিল অপারেশন দলে, বাকি চারজন ছিল তথ্য সংগ্রাহক দলে। এসব জঙ্গিকে প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা দিয়ে তৈরি করেন জঙ্গি সংগঠনটির সামরিক কমান্ডার সৈয়দ জিয়াউল হক। সহযোগিতায় ছিল আরো দুই জঙ্গি। অভিজিৎ দেশে আসার পরপরই তাঁকে অনুসরণ করতে থাকে জঙ্গিরা। নির্দেশ ছিল তাঁকে বাসায় কিংবা চলার পথে হত্যা করার। কিন্তু এতে ব্যর্থ হওয়ার পর একুশে গ্রন্থমেলায় হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়।

২০১৫ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎ দেশে আসেন। ২২ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি অভিজিতের গতিবিধি বুঝতে বইমেলায় যান সোহেল ও তাঁর সঙ্গীরা। ২৫ ফেব্রুয়ারি হত্যার প্রস্তুতি নিয়ে মেলায় গেলেও অভিজিৎকে খুঁজে পায়নি দুই গ্রুপ। ২৬ ফেব্রুয়ারি ধানমণ্ডির একটি রেস্তোরাঁয় তাঁকে অনুসরণ করলেও সেখানে হত্যার সিদ্ধান্ত না থাকায় সেখানে হামলা হয়নি। আসামিরা জানান, ২৬ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ জিয়া বইমেলার কাছে অবস্থান করে হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।



মন্তব্য