kalerkantho


খুনি গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ

চাঞ্চল্যকর চার ছিনতাই ঘটনা

এস এম আজাদ   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



খুনি গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ

প্রতীকী ছবি

ঢাকার উপকণ্ঠ আশুলিয়ার জনৈক ব্যক্তির টয়োটা এক্সিও (মডেল ২০০৯) গাড়ি চালায় আব্দুল্লাহ (৩১)। গাড়িটি ভাড়ায় চালানো হয়। কাজ শেষে রাতে গাড়িটি চালকের হেফাজতে থাকে। আর তখনই ছিনতাইকারী জাকিরের হাতে গাড়িটি তুলে দেওয়া হয়। ওই সময় জাকিরের সঙ্গে যোগ দেয় শিমুলসহ আরেকজন। রাতে তারা গাড়িটি নিয়ে ঢাকা শহর দাপিয়ে বেড়াত। পথচারী ও যাত্রীদের ব্যাগ টেনে নিত। গত ২৬ জানুয়ারি ভোরে ধানমণ্ডির ৭ নম্বর সড়কের মাথায় এই টানা পার্টির নির্মমতায় প্রাণ হারান হাসপাতালের কর্মী হেলেনা বেগম। ছিনতাইকারীরা হেলেনাকে হত্যা করে তাঁর ব্যাগ কেড়ে নিয়ে পেয়েছিল মাত্র তিন শ টাকা ও একটি মোবাইল ফোন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি আশুলিয়া থেকে গ্রেপ্তারের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে চালক আব্দুল্লাহ ঘটনার এই বর্ণনা দিয়েছে। গাড়িটিও জব্দ করেছে পুলিশ। তবে চাঞ্চল্যকর এ খুনের প্রধান আসামি জাকিরসহ তিন ছিনতাইকারীকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

এই ঘটনার পাঁচ দিনের ব্যবধানে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জে ইব্রাহিম ও উত্তরায় আল আমিন নামের দুই ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। তাঁদেরও শনাক্ত কিংবা গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তদন্তকারীদের অগ্রগতি বলতে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে তিন-চারজন ব্যক্তির উপস্থিতি এবং একটি প্রাইভেট কার সম্পর্কে তথ্য উদ্ঘাটন।

গত বছরের ২৯ নভেম্বর মিরপুর রোডের কলেজগেট থেকে মোহাম্মদপুরে যাওয়ার পথে টানা পার্টির কবলে পড়ে নিহত হন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) চিকিৎসক ফরহাদ আলম। তিন মাস পার হলেও এখনো ওই খুনিদেরও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

হেলেনা হত্যার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ধানমণ্ডি থানার ওসি আব্দুল লতিফ বলেন, ‘টানা পার্টির কবলে পড়ে হেলেনার মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে অগ্রগতি আছে। এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা গেছে। বাকিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ড্রাইভার আব্দুল্লাহ মালিককে মিথ্যা বলে গাড়িটি তার সহযোগী ছিনতাইকারীদের হাতে তুলে দিত। মালিক বিষয়টি জানতেন না। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে আব্দুল্লাহ বলে, ২৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে জাকির ফোন করে তাকে ‘আজ কামে (ছিনতাই) যামু’ বলে জানায়। রাত ৩টার দিকে জাকির আবার ফোন করলে আব্দুল্লাহ গাড়ি নিয়ে বাইপাইল হাইওয়ে যায়। সেখানে জাকির ও শিমুল গাড়িতে ওঠে। জাকির গাড়ি চালায়। পেছনের সিটে বসে শিমুল ও আব্দুল্লাহ। ফকিরাপুল থেকে আরেকজনকে গাড়িতে তোলে জাকির। এরপর গুলিস্তানে এক মহিলার ব্যাগ ধরে শিমুল টান দিলেও পুলিশের কারণে ব্যাগ নিতে ব্যর্থ হয়। গাড়িটি নিউ মার্কেট হয়ে কলাবাগান আসার পথে ধানমণ্ডি ৭ নম্বর সড়কে হেলেনার হাতের ব্যাগ ধরে টান দেয় জাকির। হেলেনা ব্যাগ ছেড়ে না দেওয়ায় গাড়ির সঙ্গে হ্যাঁচড়াতে থাকেন। কিছুক্ষণ টানাহ্যাঁচড়ার পর গাড়ির ডান চাকায় তিনি পিষ্ট হন। গাড়িটি পান্থপথ হয়ে মগবাজার ফ্লাইওভারে উঠলে শিমুল দেখতে পায় ব্যাগে ৩০০ টাকা ও একটি মোবাইল ফোনসেট রয়েছে। পরে ব্যাগটি মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচে ফেলে দেওয়া হয়।

নিহত হেলেনা ছিলেন গ্রিন লাইফ হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তাঁর স্বামী মনিরুল ইসলাম মন্টু জানান, চোখের সামনে স্ত্রীর এমন মৃত্যুর দৃশ্য তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। পুলিশ এখনো খুনিদের ধরতে পারেনি।

২৬ জানুয়ারি ভোরেই আরেক ঘটনায় স্বামীবাগ রেললাইনের কাছে দয়াগঞ্জ এলাকায় ছুরিকাঘাতে নিহত হন খুলনার ব্যবসায়ী ইব্রাহিম। আঘাত নিয়েও তিনি ছুটে গিয়েছিলেন হাসপাতালে; কিন্তু বাঁচতে পারেননি। ইব্রাহিমের পকেটে লক্ষাধিক টাকা ও মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। ঘটনাটি ছিনতাই নয় বলে সন্দেহ করে পুলিশ। তবে ইব্রাহিমের স্বজনরা বলছেন, ছিনতাইকারীচক্রই তাঁকে হত্যা করেছে। অজ্ঞাতপরিচয় খুনিদের আসামি করে গেণ্ডারিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন ইব্রাহিমের ভগ্নিপতি আবদুল হক। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এত দিন হয়ে গেল পুলিশ কিছুই বের করতে পারল না।’

গেণ্ডারিয়া থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা সিসি ক্যামেরার ফুটেজসহ বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে দেখছি। খুনিরা তিন-চারজন ছিল। তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

গত ১ ফেব্রুয়ারি সকালে উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরে প্রাইভেট কার নিয়ে ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে মারা যান বিকাশের বিক্রয়কর্মী আল আমিন। এ সময় লক্ষাধিক টাকাও নিয়ে যায় খুনিরা। উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি আলী হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরনো একটি গাড়ি নিয়ে ছিনতাই করেছিল চক্রটি। কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। আলামতও মিলেছে। আমরা চেষ্টা করছি।’

অন্যদিকে ২৯ নভেম্বর কর্মস্থল থেকে রিকশায় করে মোহাম্মদপুরের বাসায় যাওয়ার পথে শাহজাহান রোডে মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী এনআইসিভিডির চিকিৎসক ফরহাদ আলমের ব্যাগ নিয়ে যায়। এ সময় পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে মারা যান তিনি। এ ঘটনায় চিকিৎসকরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন করেছেন। গত তিন মাসে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে বেশ কজন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তবে ফরহাদের খুনিচক্রটি এখনো শনাক্ত হয়নি। মোহাম্মদপুর থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বলেন, খুনি শনাক্তের চেষ্টা চলছে।



মন্তব্য